মেট্রোর নিচে ফুটপাত দখল করে ব্যবসা

মিরপুর-১০ স্টেশন এলাকা থেকেই বছরে চাঁদা আদায় কোটি টাকার বেশি

ঢাকার মেট্রোরেল স্টেশন এলাকাগুলোয় ফুটপাত দখল করে চলছে রমরমা ব্যবসা। বিভিন্ন মেট্রো স্টেশনের সিঁড়ির মুখেও বসেছে দোকান।

দিন হিসেবে কিংবা মাসিক ‘ভাড়া’ দিয়ে দোকানিরা ফুটপাতে দোকান চালান। এ টাকার বিনিময়ে তাদের ‘শেল্টার’ দেন রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রশাসনের লোকজন। কেবল মিরপুর-১০ মেট্রো স্টেশনের নিচের ফুটপাতে গড়ে ওঠা ‘অস্থায়ী মার্কেট’ থেকেই বছরে কোটি টাকার বেশি চাঁদা ওঠে।

অন্যদিকে দখলকারীদের কারণে এসব সড়ক দিয়ে চলাচলকারী পথচারীদের প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। ফুটপাতে হাঁটার জায়গা না পেয়ে ব্যস্ত সড়ক দিয়ে চলে অনেক পথচারী। এতে সড়কে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে এবং পাশাপাশি পথচারীদের চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মিরপুর-১০ মেট্রো স্টেশনের নিচে সড়কের দুই পাশে দুই শতাধিক দোকান রয়েছে। এসব দোকানের জন্য গড়ে ২০০ টাকা করে ‘ভাড়া’স্বরূপ চাঁদা দিতে হয়। সে হিসেবে প্রতিদিন মিরপুর-১০ মেট্রো স্টেশনের নিচের ফুটপাত থেকেই ওঠে অন্তত ৪০ হাজার টাকা, মাসে যা ১২ লাখ টাকার বেশি। আর বছর হিসাবে চাঁদার পরিমাণ দেড় কোটির কাছাকাছি। এসব টাকা যারা তোলেন তারা দোকানিদের কাছে লাইনম্যান নামে পরিচিত। রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা এসব লাইনম্যান নিয়োগ দেন বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

রোববার সরজমিনে দেখা যায়, মিরপুর-১০ মেট্রো স্টেশনের নিচের সড়কের দুই পাশের ফুটপাতে মুখোমুখি করে দোকান বসানো। অর্থাৎ রাস্তার দুই পাশ মিলিয়ে চারটি সারিতে দোকান বসানো হয়েছে। মুখোমুখি দুই দোকানের মাঝখানের ফাঁকা অংশটি ক্রেতার দাঁড়ানো ও পথচারীদের চলাচলের পথ। এসব দোকানের বেশির ভাগই কাপড় ও জুতার। সড়কের পূর্ব পাশ অর্থাৎ গোলচত্বর থেকে মিরপুর-১১ যাওয়ার পথের ডান পাশের ফুটপাতে (মেট্রো স্টেশনের নিচে) ৯০টির বেশি পোশাকের দোকান রয়েছে; যেখানে নারী-পুরুষ, শিশুদের রেডিমেড পোশাক বিক্রি হয়। এছাড়া কিছু ভাজাপোড়া খাবার ও চা-সিগারেটের দোকানও রয়েছে। তবে পশ্চিম পাশ অর্থাৎ ফায়ার সার্ভিসের সামনের ফুটপাতে ভাজাপোড়াসহ নানা রকম স্ট্রিট ফুড ও বইয়ের দোকান বেশি।

বেশ কয়েকজন দোকানি জানান, তাদের প্রতিদিন ২০০ টাকা করে দিতে হয়। ভালো জায়গা হলে টাকার পরিমাণ বাড়ে। তবে কিছু দোকানি দাবি করেন, গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আর টাকা দিতে হচ্ছে না। যদিও অন্য দোকানিরা জানান, সরকার পরিবর্তন হলেও চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। এসব চাঁদার টাকা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি ও প্রশাসনের মাঝে ভাগবাটোয়ারা হয়। ফলে ফুটপাত দখল করে এসব দোকান গড়ে উঠলেও কেউ কোনো ব্যবস্থা নেয় না। দোকানিরা জানান, ফুটপাতে দোকান বসাতে লাইনম্যানদের অনুমতি লাগে। তারাই দোকান বসানোর জায়গা ও সব ধরনের নিরাপত্তা দেন।

সম্প্রতি সরজমিনে দেখা যায়, মিরপুর-১১, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ ও বাংলাদেশ সচিবালয় মেট্রো স্টেশনের নিচের ফুটপাত দখল করে দোকান বসানো হয়েছে। তবে মিরপুর-১০-এর পর বেশি দোকান রয়েছে বাংলাদেশ সচিবালয় মেট্রো স্টেশন নিচের ফুটপাতে। এখানকার বেশির ভাগ দোকানই খাবার ও চা-সিগারেটের। ফুটপাতের ওপর চেয়ার-টেবিল পেতে নোটারি ও অনুবাদের কাজও চলে।

শেওড়াপাড়া মেট্রো স্টেশনের নিচের এক পাশের ফুটপাতে দুই-তিনটি দোকান রয়েছে। তবে আরেক পাশে অনেকগুলো ফলের দোকান। আগারগাঁও ও বিজয় সরণি মেট্রো স্টেশন ঘিরে তেমন ফুটপাত দখল হয়নি। কারওয়ান বাজার মেট্রো স্টেশনের নিচে জাহাঙ্গীর টাওয়ার ও তিতাস গ্যাস ভবনের সামনের ফুটপাতে অস্থায়ী দোকানদারদের কারণে হাঁটার সময় ভোগান্তিতে পড়ে পথচারীরা।

মিরপুর-১০ মেট্রো স্টেশনের নিচের ফুটপাতের এক খাবার দোকানি নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বলেন, ‘এখানে দোকান করতে গেলে আগে নিজেকেই জায়গা খুঁজতে হয়। ফাঁকা জায়গা পাওয়া গেলে পাশের দোকানির সঙ্গে আলাপ করে সেই জায়গা দখলে নিতে হয়। পরে পাশের দোকানিদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারাই সমঝোতা করিয়ে দেয়। এছাড়া দোকান দেয়ার পর লাইনম্যানরাও এসে টাকা নিয়ে ব্যবসার ব্যবস্থা করে দেয়। টাকা না দিলে দোকান বসতে পারে না। আর বসলেও তারা উঠিয়ে দেবে। আগে আওয়ামী লীগের নেতাদের লোকজন টাকা নিত। তারা এককালীন বড় ধরনের জামানতও নিয়েছে। টাকা নিয়ে তারা শেল্টার দিত। সরকার পরিবর্তনের পর তারা পালিয়ে গেছে। এখন টাকা নেয়ার মানুষও পরিবর্তন হয়েছে।’

আরেক দোকানি বলেন, ‘এখানে আর জায়গা ফাঁকা নেই। অনেকেই দোকান দেয়ার জন্য জায়গা খুঁজছে।’

বাংলাদেশ সচিবালয় মেট্রো স্টেশন এলাকার এক দোকানি বলেন, ‘এখানে অনেক বছর থেকেই ব্যবসা করছি। কাউকে টাকা দিতে হয় না।’ তবে আরেক দোকানি টাকা দেয়ার কথা স্বীকার করেন। তারা মাস চুক্তিতে টাকা দেন। তবে কাকে এবং কত টাকা দেন সে বিষয়ে তিনি মুখ খোলেননি।

পথচারীদের নিরাপদ ও সহজ চলাচল নিশ্চিতে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) ‘পথচারী নিরাপত্তা খসড়া প্রবিধানমালা-২০২১’ প্রণয়ন করেছিল। যদিও সেটি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। সরকারি এ সংস্থার প্রবিধানমালায় বলা হয়, ফুটপাতের আকার ও নির্মাণশৈলী এমন হতে হবে, যেন পথচারীদের স্বাচ্ছন্দ্য চলাচল নিশ্চিত হয়। ফুটপাতকে ভবন-সম্মুখ বা বিল্ডিং ফ্রন্টেড জোন, পথচারী জোন ও রোড ফার্নিচার জোন—তিন ভাগে ভাগ করা যাবে। ফুটপাত নির্মাণের বিষয়ে বলা হয়, এমনভাবে নির্মাণ করতে হবে যাতে পথচারীরা সহজে, নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে কর্মক্ষেত্র, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজসহ অন্য প্রধান প্রধান গন্তব্যে পৌঁছতে পারে। পথচারীরা ফুটপাত ব্যবহারে যাতে নিরুৎসাহিত না হয় সেই লক্ষ্যে ফুটপাত হতে হবে নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রশস্ত ও সমতল। বিদ্যমান অবকাঠামো ও ল্যান্ডস্কেপিংয়ের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করে ফুটপাতে হাঁটার পরিবেশ আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিনন্দন রাখতে হবে। সহজে নিরাপদে ও স্বল্প সময়ে রাস্তা পারাপারের সুযোগ সৃষ্টি, নিরাপত্তা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে। ফুটপাতে স্পষ্ট ও পর্যাপ্ত সাইন-সিগন্যাল, মার্কিংসহ নিরবচ্ছিন্ন ও সমন্বিত হাঁটার স্থান রাখতে হবে। রাতে পথচারীদের চলাচল নিরাপদ, নির্বিঘ্ন ও স্বস্তিদায়ক করতে ফুটপাতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করতে হবে।

একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে মিরপুর এলাকায় থেকে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন কামরুল হাসান। মেট্রো স্টেশনের নিচের ফুটপাত দখল করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় ভোগান্তির বিষয়ে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মেট্রোরেলের নিচে অস্থায়ী দোকানগুলো যেমন মেট্রোর সৌন্দর্য নষ্ট করছে তেমনি যাত্রীদের যাতায়াতের ক্ষেত্রে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি করছে। এসব দোকানের কারণে হাঁটার পথে অহেতুক জট তৈরি হয়। কারো জরুরি চলাচলের পথে বাধা তৈরি করে। কারো দ্রুত মেট্রোরেলে ওঠার প্রয়োজন হলে এসব জট পার হয়ে যাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়ে। দোকানগুলোকে কেন্দ্র করে এক ধরনের চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট তৈরি হয়। সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে বলে আশা করি। ফুটপাত দখলমুক্ত করার পর যেন আবার দখল না হয় সে বিষয়েও নজর দিতে হবে।’

মমিনুল ইসলাম নামের এক পথচারী বলেন, ‘ফুটপাতগুলো দিয়ে হাঁটা যায় না। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কিছুটা হাঁটা যায়। বিকাল থেকে সন্ধ্যার পর পর্যন্ত দোকান বেশি খোলা থাকে। ফলে মিরপুর-১০ নম্বর মেট্রো স্টেশনের নিচের ফুটপাত দিয়ে হাঁটার উপায় থাকে না। পথচারী-দোকানি ও ক্রেতাদের সমাগমে লোকারণ্য থাকে ফুটপাত। দ্রুত চলাচল করা যায় না। আবার ভিড়ের মধ্যে অনেক সময় পকেটমারের খপ্পরেও পড়তে হয়।’

মেট্রো স্টেশনের জায়গা দখল করে অবৈধ স্থাপনা করার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আহমেদ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মেট্রো স্টেশনের ফুটপাতের কিছু অংশ ডিএমটিসিএলের, বাকিটা সিটি করপোরেশনের। তারা কী করবেন সেটি আমি জানি না। তবে ডিএমটিসিএলের জায়গা দখল করে কোনো দোকান বসানোর সুযোগ নেই। বসানো হলে খুব দ্রুতই ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে তাদের তুলে দেব। আর মিরপুর-১০ মেট্রো স্টেশন ঘিরে এত দোকান বসেছে এটি আমার জানা ছিল না। মেট্রোর যাত্রীদের চলাচলে যাতে কোনো সমস্যা না হয় সেজন্য পুলিশকে ফোন করে ব্যবস্থা নিতে বলছি।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করার সুযোগ নেই। এতে চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট তৈরি হয়। পাশাপাশি পথচারী চলাচলে বাধা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়। ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার পরামর্শ দেন তারা।

বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মেট্রো স্টেশনগুলোর সিঁড়ির সামনে রিকশা ও বিভিন্ন ধরনের ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকানিরা দাঁড়িয়ে থাকে। এতে চলাচলকারীদের ভোগান্তি তৈরি হয়। এমনটি হওয়া উচিত না। ব্যস্ত জায়গাগুলো সবসময় ফাঁকা রাখতে হয়। এটিই নিয়ম। আর ফুটপাতে অবৈধ স্থাপনা থাকলে মানুষের চলাচলের পথে সমস্যা তৈরি হয়। এগুলো উচ্ছেদ করা উচিত। তবেই পথচারীরা নিরাপদে ফুটপাতে চলাচল করতে পারবে।’

এ ব্যাপারে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, ‘ফুটপাত দখলমুক্ত করতে আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। উচ্ছেদ করলে তারা আবার বসে। এখানে এক ধরনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক খেলা চলে। সেজন্য স্থায়ীভাবে ফুটপাত দখলমুক্ত করা যাচ্ছে না। আমরা কিছু পাইলট প্রকল্প হাতে নিচ্ছি। সেখানে কিছু হকারকে বসার অনুমতি দেয়া হবে। ফলে অবৈধ দখল কমে আসবে।’

আরও