লক্ষ্মীপুরের
মজুচৌধুরীর হাট থেকে রহমতখালী চ্যানেলে মেঘনা নদীর নাব্য সংকট দূর করতে ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ২০২০ সালে ঢাকা-লক্ষ্মীপুর নৌপথের লক্ষ্মীপুর প্রান্তে ড্রেজিং শুরু করে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ
(বিআইডব্লিউটিএ)। নৌপথের সাড়ে
পাঁচ কিলোমিটারে ৩১ লাখ ঘনমিটার
বালি ড্রেজিংয়ে ব্যয় ধরা হয় ৪৯ কোটি
৮৮ লাখ টাকা। তবে চার বছর ধরে নৌপথে বারবার ড্রেজিং করা হলেও নাব্য ফেরেনি। তবে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ বলছে, এরই মধ্যে প্রায় ৩৩ লাখ ঘনমিটার
ড্রেজিং করা হয়েছে। এখন মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং চলছে।
নৌ-রুটে চলাচলকারীদের অভিযোগ, ড্রেজিংয়ের কিছুক্ষণের মধ্যেই জোয়ারে পলি জমে আবারো আগের অবস্থানে ফিরে যায়। ড্রেজিংয়ের সুফল হচ্ছে না জেনেও কয়েক বছর ধরে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। এই সুযোগে স্থানীয় কিছু ব্যক্তি খননকৃত মাটি নিয়ে বাণিজ্য করছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ফেরি ও লঞ্চঘাটটি মজুচৌধুরীর হাট থেকে আড়াই কিলোমিটার পশ্চিমে মূল মেঘনা নদীর মুখে স্থানান্তর করলে দূর হবে রহমতখালী চ্যানেলের প্রতিবন্ধকতা। এতে বছরের পর বছর অর্থ ব্যয় করে ড্রেজিংয়ের প্রয়োজন পড়বে না।
ড্রেজিং কাজে নিয়োজিত বিআইডব্লিউটিএর উপসহকারী প্রকৌশলী হযরত হাসনাত নিপুণ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বোরাক, চিত্রা, শিবসা ও গোমতী নামে চারটি অত্যাধুনিক ড্রেজারের মাধ্যমে প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ড্রেজিং করা হচ্ছে। এর মধ্যে গোমতী ড্রেজারে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে। মূলত নদীর পানিতে পলির পরিমাণ বেশি। নদীর এক বালতি জোয়ারের পানিতে এক মগ পরিমাণ পলি জমে। এক-একটি স্থানে পাঁচ-ছয়বার ড্রেজিং করেও নাব্য ফেরানো সম্ভব হচ্ছে না। তবুও লঞ্চ ও ফেরি চলাচলের পথ পলিমুক্ত রাখতে প্রতিনিয়তই ড্রেজিং করা হচ্ছে। বর্তমানে মজুচৌধুরীর হাট লঞ্চঘাট এলাকায় ড্রেজিং চলছে।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সারা বছরই লক্ষ্মীপুরের মজুচৌধুরীর হাট নৌ-রুট দিয়ে ভোলা-বরিশাল, পটুয়াখালীসহ দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ যাতায়াত করে। ফেরি, লঞ্চ ও সি-ট্রাক দিয়ে মেঘনা নদী পাড়ি দেয় মালবাহী পরিবহন ও যাত্রীরা। শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানির গভীরতা কম থাকায় প্রায় তিন কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের রহমত খালী চ্যানেল নাব্য সংকটে ভোগে। গভীরতা বাড়াতে ড্রেজিং প্রকল্প চলমান থাকলেও তা কাজে আসছে না। এতে এ চ্যালেনটিতে ভারী নৌ-যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।
বিআইডব্লিওটিএর তথ্যমতে, মজুচৌধুরীর হাট ঘাট এলাকার সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার নদীর নাব্য সংকট দূর করতে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে ড্রেজিং শুরু করে বিআইডব্লিউটিএ। প্রথমে ঢাকা-লক্ষ্মীপুর নৌপথের লক্ষ্মীপুর প্রান্তে ড্রেজিং শুরু করা হয়। মেঘনা নদী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্য উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ৩১ লাখ ঘনমিটার বালি ড্রেজিংয়ে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৯ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এরই মধ্যে প্রায় ৩৩ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিং করা হয়েছে। এখন মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং চলছে।
এ ব্যাপারে প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মিজানুর রহমান ভূঁইয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জেলা ড্রেজড ম্যাটেরিয়াল ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে খননকৃত মাটি প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। প্রকল্পের নিয়ম অনুয়ায়ী মাটি মসজিদ, মাদ্রাসাসহ নিচু জমিতে দেয়া হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে প্রতিস্থাপিত মাটি সরানো সম্ভব হয়নি। নদীর গতিপ্রকৃতি অনুসারে অত্যধিক পলি পতনের কারণে একই স্থানে প্রতি বছর ড্রেজিং করা হচ্ছে। এজন্য খননকৃত মাটি প্রতিস্থাপনের ভূমি পাওয়া যাচ্ছে না। বর্তমানে বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজার দিয়ে সংরক্ষণ ড্রেজিং চলছে। এরই মধ্যে প্রায় ৯ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিং করা হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘মেঘনা নদীর জোয়ারে পলি জমলেও উল্টো দিক থেকে পানির চাপ বাড়ছে না। কারণ ঘাট এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্লুইসগেট দুটি বন্ধ থাকে। এ কারণে ভাটার সময় পানি নেমে গেলেও পলিগুলো জমে যাওয়ায় নাব্য ফিরছে না। তবে ফেরি ও লঞ্চঘাট স্থানান্তরের বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে স্থান নির্বাচনের জন্য আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা কাজ করছে।’
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, রহমতখালী চ্যানেলে নাব্য না থাকায় লঞ্চসহ বড় নৌযান সহজে চলাচল করতে পারছে না। প্রায় সময় নদীতে পানির গভীরতা কমে গেলে নৌযান আটকে যায়। এজন্য অনেক যাত্রী স্পিডবোট বা সি-ট্রাকে করে নদী পাড়ি দেয়। ফেরিঘাট আরো পশ্চিমে মেঘনা নদীর কাছাকাছি স্থানান্তর প্রয়োজন। তাতে নৌ-যানগুলোকে রহমতখালী চ্যানেল পাড়ি দিতে হবে না।
মজুচৌধুরীর হাটের সি-ট্রাকের কর্মকর্তা (চাটার) বশিরুল ইসলাম বলেন, ‘রহমতখালী চ্যানেলে পানি থাকে না। ভাটার সময় বসে থাকতে হয়। এই সুযোগ কাজে লাগায় স্পিডবোট এবং ট্রলার পরিচালকরা। তারা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে যাত্রী পারাপার করে। ঘাটটি মেঘনা নদীর কাছাকাছি স্থানান্তর করলে সহজে যাত্রী পরিবহন করা যাবে।’
এমভি পারিজাত লঞ্চের মাস্টার মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ভাটার সময় লঞ্চ বন্ধ রাখতে হয়। মাঝেমধ্যে ভাটা পড়লে রহমতখালী চ্যানেলের মাঝখানে লঞ্চ আটকে যায়। তখন জোয়ারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এতে সময় ব্যয় হচ্ছে। রহমতখালী চ্যানেলের গভীরতা না বাড়লে লঞ্চ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এজন্য ঘাটটি স্থানান্তর কার প্রয়োজন।’