সুরমার পারে বর্জ্যের স্তূপ ধ্বংসের মুখে জীববৈচিত্র্য

সিলেটের প্রধান নদী সুরমার পারজুড়ে প্লাস্টিক আর পলিথিন বর্জ্যের স্তূপ। প্রতিনিয়ত সেগুলো গিয়ে মিশছে নদীর পানিতে।

সিলেটের প্রধান নদী সুরমার পারজুড়ে প্লাস্টিক আর পলিথিন বর্জ্যের স্তূপ। প্রতিনিয়ত সেগুলো গিয়ে মিশছে নদীর পানিতে। এতে বিনষ্ট হচ্ছে আশপাশের পরিবেশ, ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। বহমান নদীর এমন পরিণতির জন্য তীরবর্তী ব্যবসায়ীদের দায়ী করছেন অনেকে। আবার সংকট কাটাতে কোনো পদক্ষেপ না নেয়ার অভিযোগ পরিবেশ অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে।  

সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ভার্থখলা, তোপখানা, শেখঘাট, কাজিরবাজার, ঘাসিটুলা, দক্ষিণ সুরমা নদীতীরের অবস্থা বেহাল। বিশেষ করে নদীতীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কারণেই বেশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে নদী। সিলেটের সবচেয়ে প্রাচীন পাইকারি বাজার কালীঘাট। নদীর পাড় ধরে হেঁটে গেলে কালীঘাটের সারিবদ্ধ দোকানঘরের পেছনেও একই চিত্র চোখে পড়ে। 

তোপখানা এলাকার বাসিন্দা রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘নদীর পাড় ঘেঁষে থাকা কিছু দোকান অবৈধ। নদীর জায়গা দখল করে তারা ব্যবসা করছে। শুধু ব্যবসা নয়, অপচনশীল আবর্জনাও তারা প্রতিদিন নদীতে ফেলছে। এসব বিষয় যেন দেখার কেউ নেই। এতে ধ্বংস হচ্ছে নদীর তীর ও পানি।’

ক্বিনব্রিজের পাশে ভার্থখলা সড়কের সামছুদ্দিন মার্কেটের পেছনে নদীর একেবারে পাড়ে দুটি ‘ভাঙ্গাড়ি’র দোকান। এর চারপাশে স্তূপ হয়ে আছে নানা রকমের বর্জ্য। ভাগাড়ের মতো পরিবেশ। ছড়িয়ে রয়েছে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, পুরনো টিন, কাগজের কার্টনসহ নানা ধরনের প্লাস্টিক সামগ্রী। নদীর তীর হওয়ায় একটু বাতাসেই সেসব পানিতে গড়িয়ে পড়ছে।

শামছুদ্দিন ও তোফাজ্জল নামে দুই ব্যক্তি বেশ কয়েক বছর ধরে সুরমা নদীর পাড়ে এ ভাঙ্গাড়ির ব্যবসা করে আসছেন। শামছুদ্দিন বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, এই ব্যবসা করে খাই। আবর্জনা বেশি জমে গেলে আগুনে পুড়িয়ে ফেলি। তবে সব আবর্জনা আমাদের নয়। আশপাশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আবর্জনাও নদীপাড়ে ফেলা হয়।’ 

শুধু ভার্থখলা নয়, নদীর উভয় পাড় ঘেঁষে থাকা অধিকাংশ মুদি দোকান, স্টেশনারি দোকান, ওয়ার্কশপ, মিল-কারখানাগুলো প্রতিদিনের ময়লা-আবর্জনা ফেলার জায়গা হিসেবে নদীর পাড় ব্যবহার করছে বছরের পর বছর। কলেজ শিক্ষক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘একসময় সৌন্দর্যের ষোলকলায় পূর্ণ ছিল সুরমা নদী। সেই সুরমার সৌন্দর্যে যেন জং ধরতে শুরু করেছে। কিছু মানুষ ময়লা-আবর্জনা ফেলার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করছে এ নদীকে। এমনিতে ছড়া নালা দিয়ে নদীতে নামছে ময়লা-আবর্জনা, এর সঙ্গে কেউ কেউ সরাসরি ফেলছেন প্লাস্টিক বর্জ্য।’

ভার্থখলা সামসুদ্দিন মার্কেটের সাধারণ সম্পাদক ছোয়াব আলীর দাবি তার মার্কেটের লোকজন নদীতে কোনো বর্জ্য ফেলে না। তার পরও তিনি খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা নেবেন।  

পরিবেশবাদী সংগঠন ভূমিসন্তানের সংগঠক শুয়াইব হাসান বলেন, ‘ক্বিনব্রিজের দুই পাশের তীর পলিথিন, প্লাস্টিক বর্জ্যে সাদা হয়ে গেছে। তীরবর্তী ব্যবসায়ীরা একটু সচেতন হলে এমন বেহাল দশা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম কীম বলেন, ‘উদ্ভিদ ও প্রাণীর জন্য পানিতে যে পরিমাণ অক্সিজেন থাকা প্রয়োজন, সেই পরিমাণে নেই। প্রতিনিয়ত পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলে নদীর অবস্থা বেহাল করা হচ্ছে।’  

জনবল সংকটের কথা তুলে ধরে পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক এমরান হোসেন জানান, জনবল না থাকায় চাইলেও অনেক কিছু করা যায় না। তবে বিষয়টি যখন তার নজরে এসেছে তিনি দেখবেন।

স্থানীয়রা জানান, প্রতিনিয়ত তাদের নদীর পানি ব্যবহার করতে হয়। সেই নদীর তীরে যদি ময়লা-আবর্জনা ফেলা হয়, তখন পানি দূষিত হয়। পঁচা দুর্গন্ধ বের হয়। এতে রোগ-জীবাণুও সৃষ্টি হয়। সেই পানি তখন কেউ ব্যবহার করতে পারে না। আবার যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে মশা-মাছির জন্ম হয়। দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে পরিবেশ নষ্ট হয় এবং রোগেরও সৃষ্টি হয়। তাই নদীতীরের ময়লা-আবর্জনা অপসারণ জরুরি প্রয়োজন। নদীতে ময়লা পানি বা আবর্জনা ফেলার আগে পরিবেশ নিয়ে ভাবতে হবে সবাইকে। সুন্দর পরিবেশ সুরক্ষা সবারই দায়িত্ব।

আরও