তাই আসন্ন আমন মৌসুমের আগে বেসরকারিভাবে দুই লাখ টন ইউরিয়া আমদানি করতে চায় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। এজন্য দুই দফা দরপত্র আহ্বান করা হয়। তবে এতে সরবরাহকারীদের কাছ থেকে তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। এখন তৃতীয় দফায় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি দরপত্রে যাওয়ার চিন্তা করছে বলে দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
বিসিআইসি সূত্রে জানা গেছে, প্রথম দফায় আন্তর্জাতিক দরপত্রে কোনো সাড়াই পাওয়া যায়নি। এরপর দ্বিতীয়বার দরপত্র আহ্বান করা হয়। কিন্তু সেখানেও সরবরাহকারীদের কাছ থেকে কেবল ৫০ হাজার টন ইউরিয়া সরবরাহের জন্য দরপত্র পাওয়া গেছে, যা চাহিদার মাত্র ২৫ শতাংশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় সার সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এতে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সময়মতো সরবরাহ করতে না পারলে ইমেজ সংকটে পড়তে হতে পারে। মূলত সে কারণেই দরপত্রে সাড়া দিচ্ছেন না সরবরাহকারীরা।
বিসিআইসির ক্রয় বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. সাইফুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দরপত্র পেয়েছি। তারা ২৫ হাজার করে ৫০ হাজার টন ইউরিয়া সার সরবরাহ করতে চায়। দরপত্রগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।’
দেশে ইউরিয়া সারের বার্ষিক চাহিদা ২৬ লাখ টনের মতো। চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) এ পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ১৩ লাখ ১৪ হাজার ৩৮৮ টন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, গত রোববার পর্যন্ত দেশে ইউরিয়া সারের মজুদ ছিল ৩ লাখ ৪৩ হাজার টন, যেখানে ৪ লাখ টন মজুদকে নিরাপদ ধরা হয়। অর্থাৎ দেশে বর্তমানে ইউরিয়া সার ন্যূনতম নিরাপদ মজুদসীমার নিচে রয়েছে।
আগামী আমন মৌসুমকে সামনে রেখে মজুদ বাড়াতে দুই লাখ টন ইউরিয়া আমদানির জন্য উন্মুক্ত দরপত্রের আহ্বান করে বিসিআইসি। সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের সঙ্গে জিটুজি (সরকার থেকে সরকার) ভিত্তিতে আরো তিন লাখ টন ইউরিয়া আনার বিষয়েও কথাবার্তা হচ্ছে। তবে তা আসা নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার ওপর।
দুই লাখ টন ইউরিয়া আমদানির বিষয়ে বিসিআইসির পরিচালক (বাণিজ্যিক, উৎপাদন ও গবেষণা) মো. মনিরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রথম দফার দরপত্রে কোনো প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়নি। দ্বিতীয় দফায় যারা অংশ নিয়েছে সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। প্রয়োজনে আবার দরপত্র আহ্বান করা হবে।’
এদিকে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের পর থেকে দেশে শুরু হয়েছে গ্যাস সংকট। সে কারণে ৪ মার্চ থেকে বিসিআইসির পাঁচটি ইউরিয়া কারখানার মধ্যে চারটি এবং বহুজাতিক কোম্পানি কাফকোর উৎপাদন বন্ধ করে দেয়া হয়। এর জেরে দেশের একমাত্র ডিএপি সার কারখানাটিও অ্যামোনিয়া সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে নরসিংদীর ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানাটিই (দৈনিক ২ হাজার ৮০০ টন উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন) কেবল চালু রয়েছে।
একসময় চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ ইউরিয়া দেশেই উৎপাদিত হতো। ধীরে ধীরে উৎপাদন কমে আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে। বর্তমানে চাহিদার এক-তৃতীয়াংশেরও কম ইউরিয়া উৎপাদিত হয় বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। সার উৎপাদন ও আমদানির কাজটি করে থাকে বিসিআইসি।
বাংলাদেশ মূলত সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও চীন থেকে ইউরিয়া সার আমদানি করে। এর পাশাপাশি কাতার থেকেও আমদানি করে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে সার আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বিকল্প উৎস খোঁজা হচ্ছে। ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ব্রুনাইয়ের সঙ্গে এরই মধ্যে আলোচনা হয়েছে। এছাড়া রাশিয়া ও বাহরাইনের সঙ্গেও প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে ইউরিয়া সারের চাহিদা রয়েছে ২৬ লাখ ২২ হাজার টন। জুলাইয়ে শুরু হতে যাওয়া আমন ধানের মৌসুমে ইউরিয়ার চাহিদা রয়েছে ৬ লাখ ৬৫ হাজার টন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বাধা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আমদানির আশায় না থেকে যেকোনো উপায়ে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াতে হবে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বৈশ্বিক বাজারে সারের দাম বেড়ে গেছে। এতে বেড়েছে খরচ। ফলে বেসরকারি সরবরাহকারীরা এখন দরপত্রে উৎসাহী কম হবে—এটাই স্বাভাবিক। বিসিআইসি যে আমদানি করে, এটা তো তাদের করার কথা না। তাদের প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল উৎপাদন করার জন্য। আগে ১৯ লাখ টন পর্যন্ত ইউরিয়া উৎপাদন করেছে, যেটি চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ। এখন সেটি উল্টো হয়ে গেছে, বছরে ৮-১০ লাখ টন উৎপাদন করে। আর চাহিদার ৮০ শতাংশের মতো করা হয় আমদানি।’
সারের সংকট কাটাতে হলে নিজস্ব উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই উল্লেখ করে এ কৃষি অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘বাইরে থেকে গ্যাস কিনে এনে কারখানাগুলো চালু রেখে সার উৎপাদন করলে আমদানির চেয়েও এক-তৃতীয়াংশ অর্থ সাশ্রয় হবে। তাই অর্থ সাশ্রয় ও সারের সংকট কাটাতে উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই।’