বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী

অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও সীমিত সম্পদের বাস্তবতায় চেষ্টা করা হয়েছে অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেট প্রণয়নের

সব শ্রেণী, পেশা, ধর্ম বা বর্ণের সবাই বিএনপি সরকারের প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আওতার ভেতরে আছে বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং সীমিত সম্পদের বাস্তবতায় জনগণের প্রত্যাশা পূরণে অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেট হিসেবে প্রণয়নের চেষ্টা হয়েছে বলে তিনি জানান।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘দীর্ঘ দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসন, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং সীমিত সম্পদের বাস্তবতায় জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা করা হয়েছে। এবারের বাজেটের মূল দর্শন হচ্ছে অর্থনীতিকে গণতান্ত্রিক করা এবং উন্নয়নের মূল ধারার বাইরে থাকা মানুষদের রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার আওতায় নিয়ে আসা।’

রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে গতকাল বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী এ কথা বলেন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের অগ্রাধিকার, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার কৌশল এবং সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সব মানুষের জন্য এ বাজেট জানিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘দেড় দশক ধরে দেয়া বাজেটে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হয়নি। এবারের বাজেট সব শ্রেণী-পেশার মানুষের বাজেট। কোনো শ্রেণী, পেশা, ধর্ম বা গোষ্ঠীকে এর আওতার বাইরে রাখা হয়নি। সবার কথা চিন্তা করেই এ বাজেট দেয়া হয়েছে। এ বাজেটের প্রেক্ষাপট, চিন্তা ও দর্শন আলাদা। বাজেটে সীমিত সম্পদের মধ্যেও সবার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী বরাদ্দ, বিভিন্ন কর্মসূচি এবং বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ রাখা হয়েছে। নৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে দেশ পরিচালনার চেষ্টা চলছে। অর্থের যেন অপচয় না হয় সেসব ভেবেই প্রকল্প নেয়া হচ্ছে।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এবারের বাজেটের প্রেক্ষাপট অন্যান্য সময়ের তুলনায় ভিন্ন। দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট রিজিম ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পার করে বাজেট পেয়েছে। আওয়ামী আমলে দেশের প্রতিষ্ঠান ভেঙে দেয়া হয়েছে, অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়া হয়েছে। তাই সম্পদের সীমাবদ্ধতার মধ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেট করা কঠিন ছিল। মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী, আমরা সবার সঙ্গে কথা বলে প্রত্যাশা প্রতিফলনের চেষ্টা করেছি। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনের পর জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। সেই প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্য নিয়েই সরকার বাজেট প্রণয়ন করেছে। স্বাভাবিকভাবে জাতীয় বাজেট প্রস্তুতের জন্য প্রায় ছয় মাস সময় পাওয়া যায়। তবে মাত্র দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে বাজেট প্রস্তুত করেছে সরকার। এ সময়ের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মতামত গ্রহণ এবং তাদের চাহিদা ও প্রত্যাশাকে বাজেটে প্রতিফলনের চেষ্টা করা হয়েছে।’

বাজেটে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের চেষ্টা করা হয়েছে উল্লেখ করে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘অতীতে অর্থনীতি ছিল কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক। পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক সেই অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে এবারের বাজেটে অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে। যারা এতদিন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে ছিল, তাদের মূলধারায় আনার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। নিয়মভিত্তিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে বিশ্ব ক্রমেই সুরক্ষাবাদী ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে। পাশাপাশি যুদ্ধ ও সংঘাত এখন নতুন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতাসহ বিভিন্ন কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে, এর প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়ছে। পাশাপাশি পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক সংকট এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে সরকারের চ্যালেঞ্জ আরো বেড়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি খাতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে।’

অর্থমন্ত্রী জানান, ভবিষ্যতে সরকারি ব্যয় ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হবে। এগুলো হলো অর্থের যথাযথ ব্যবহার (ভ্যালু ফর মানি), বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাবর্তন (রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট), কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত বিবেচনা। সরকারের প্রতিটি প্রকল্প ও ব্যয় এ চারটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে। অপচয়ভিত্তিক অর্থনীতি নয়, বরং নীতি-নৈতিকতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করাই সরকারের লক্ষ্য।

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘কমার কথা; কারণ, অভাব থাকলে দুর্নীতির আশ্রয় নেয়ার একটা প্রবণতা থাকে। ১১ বছর ধরে নতুন বেতন কাঠামো হয়নি। অথচ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। এগুলোকে তো “অ্যাড্রেস” করতে হবে। আশা করা হচ্ছে, বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমার কথা।’

বাজেটে কর্মসংস্থানের বিষয়ে আমির খসরু বলেন, ‘বাজেটে পরিষ্কারভাবে বলা আছে চাকরির কথা। আমরা আশা করি বাজেটে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারব। বিনিয়োগ আনতে জোর দিচ্ছি কর্মসংস্থানের জন্য। দক্ষতা উন্নয়নের জন্য আমরা জোর দিচ্ছি। দক্ষ একজন শ্রমিকের চাকরি দেশে-বিদেশে হওয়া খুবই সহজ। এজন্য আমরা দক্ষতা উন্নয়নে নানা প্রকল্প হাতে নিচ্ছি।’

মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি গত তিন মাসের ব্যাপার না, এটি গত বেশ কয়েক বছর ধরেই ক্রমান্বয়ে বাড়ছে এবং গত তিন মাস ধরে তা ৯ শতাংশের ওপরে চলছে। এর পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক বাজারের অস্থিতিশীলতার প্রভাব। এছাড়া ব্যাংক খাতে লুটপাট ও মানি লন্ডারিংয়ের কারণে ব্যাংকগুলোতে বিরাট মূলধন ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে “‍কস্ট অব ফান্ড” অনেক বেড়ে গেছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রতিফলন ঘটছে মূল্যস্ফীতির ওপর। বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার কারণে আমদানীকৃত সব পণ্যের দামই দেশের বাজারে বেড়ে যাচ্ছে। বহির্বিশ্বের কারণে যে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, সেখানে আমাদের কিছু করার থাকে না। তবে আমাদের চেষ্টা করতে হবে ডোমেস্টিক্যালি কীভাবে ব্যবসার খরচ কমিয়ে আনা যায়।’

এছাড়া ব্যবসায় খরচ কমিয়ে সরকার ডি-রেগুলেশনসহ নানামুখী সংস্কার পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী।

মূল অর্থনীতির পাশাপাশি সরকার ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশের যে বিপুলসংখ্যক পর্যটক আছেন, তাদের চাহিদা পূরণ করতে পারলেও আমাদের অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখা সম্ভব। আমরা বিনোদন খাতকে ক্রিয়েটিভ ইকোনমির অন্তর্ভুক্ত করেছি, যা পর্যটনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে। এ লক্ষ্যে ঢাকার বাইরে প্রায় ১৬০ একর জায়গাজুড়ে একটি ক্রিয়েটিভ সেন্টার নির্মাণ করা হচ্ছে। সেখানে থিয়েটার, স্ট্যান্ড-আপ কমেডি, ডিজাইনার শপ, ফাইন আর্ট গ্যালারি, শিল্পীদের প্রদর্শনীসহ নানা ধরনের বিনোদনের ব্যবস্থা থাকবে। অনেক দেশে সংস্কৃতিকে সফলভাবে মনিটাইজ করতে পেরেছে। শিল্পীদের আয় হতে হবে, উদ্যোক্তাদের আয় হতে হবে, দর্শকরাও বিনোদন পাবেন—এভাবেই একটি টেকসই সাংস্কৃতিক অর্থনীতি গড়ে ওঠে। বাংলাদেশে যে সম্ভাবনা আছে তা কাজে লাগাতে আমরা ক্রিয়েটিভ ইকোনমিতে বিনিয়োগ শুরু করেছি। প্রাথমিকভাবে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে আগে কখনো এমন উদ্যোগ নেয়া হয়নি, এমনকি এভাবে কেউ চিন্তাও করেনি।’

তিনি বলেন, ‘বিদেশে দেখা যায়, একটি গ্রামের একটি বিশেষ পণ্যকে কেন্দ্র করেই পর্যটকের ভিড় জমে যায়—“‍ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান প্রডাক্ট” ধারণার মাধ্যমে। আমরা বরিশালে এমন একটি গ্রাম এরই মধ্যে চিহ্নিত করেছি এবং সেখানে কাজ শুরু করতে যাচ্ছি। পর্যটকরা সেখানে গিয়ে স্থানীয় উৎপাদন, হস্তশিল্প, তাঁত, কার্পেট তৈরি, ঐতিহ্যবাহী শিল্পকর্ম—সবকিছু ঘুরে দেখবেন। ক্রিয়েটিভ ইকোনমি পর্যটনের একটি বড় অংশ হিসেবে কাজ করবে। আমরা এতদিন এ সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপ দিতে পারিনি।’

সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দের কথা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যে ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট প্রকল্প চালু করেছি, সেখানে প্রায় ৩৭ হাজার পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ প্রকল্পে কোনো বিএনপি নেতাকর্মীকে সংযুক্ত করা হয়নি। সরকারি কর্মকর্তারা নির্ধারিত মানদণ্ডের ভিত্তিতে তালিকা তৈরি করেছেন এবং সেই তালিকা অনুযায়ী সুবিধা দেয়া হয়েছে। সেখানে সব রাজনৈতিক দলের মানুষই রয়েছেন। পরে আমরা একটি মূল্যায়নও করেছি। সেখানে মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ ত্রুটি পাওয়া গেছে, যা আমরা এরই মধ্যে সংশোধনের কাজ করছি। আগামী বছর আমরা ৪১ লাখ নারীর হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেব। আমাদের আশা, যারা প্রকৃত অর্থে যোগ্য, তারাই এ সুবিধা পাবেন। আমরা নিরপেক্ষভাবে সবার জন্য কাজ করতে চাই। আমরা বলি, সবার আগে বাংলাদেশ, আবার সবার জন্য বাংলাদেশ। এ জায়গাতেই আমাদের পৌঁছাতে হবে। আর কতদিন দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সুবিধা দেয়া হবে? যোগ্যতার ভিত্তিতেই মূল্যায়ন হওয়া উচিত। সরকারের ভুলত্রুটি হতে পারে। কিন্তু আমি কখনই ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেব না, যা মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে বা বৈষম্য তৈরি করে। এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’

জ্বালানি ও খাদ্য আমদানিতে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘স্পট মার্কেট থেকে কেনার কারণে খরচের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ২-৩ ঘণ্টার নোটিসে বেশি দামে কিনতে হয়। অতীতে এ দীর্ঘমেয়াদি অ্যারেঞ্জমেন্টগুলো করা হয়নি। খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য আমাদের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা দরকার। ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবেলায় আমাদের রিজার্ভ বা নিয়ন্ত্রণে কমপক্ষে তিন মাসের জ্বালানি ও খাদ্য মজুদ রাখার মতো বাফার স্টক গড়ে তুলতে হবে। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরসহ দেশের পোর্টগুলোতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি ও বাড়তি খরচ কমাতে পারলে সাপ্লাই চেইন শক্তিশালী হবে এবং দেশের অভ্যন্তরে মূল্যস্ফীতি কমে আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক প্রোগ্রামিং ও বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকার আগের প্রচলিত ধারা থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। কারণ বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষাপট দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনা, বিনিয়োগের ধরণ এবং বিনিয়োগ মূল্যায়নের মানদণ্ডও বদলে যাচ্ছে। এ কারণে দেশের সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার (পাবলিক ফাইন্যান্স) বিদ্যমান কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, ‘স্থানীয় ব্যাংক থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ সংকুচিত করে। অর্থনীতির ভাষায় যাকে “‍ক্রাউডিং আউট” বলা হয়। স্থানীয় ব্যাংকগুলোর মূল গ্রাহক হওয়া উচিত বেসরকারি খাত, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সরকারের ঋণ গ্রহণের কারণে সেই ভারসাম্য কিছুটা বিঘ্নিত হয়েছে।’

মন্ত্রী জানান, চলতি বাজেটে স্থানীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়েছে। এর মাধ্যমে একটি নতুন প্রবণতা বা ধারা তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের লক্ষ্য হলো এমন একটি আর্থিক কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে বেসরকারি খাত অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আরো বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে এবং ব্যাংক খাতেও সরকারি ও বেসরকারি ঋণের মধ্যে একটি স্বাস্থ্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে।’

সরকার বিনিয়োগ বাড়াতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে জানিয়ে অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ‘সরকার ধীরে ধীরে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প অর্থায়নের উৎস জোরদার করার পথে এগোচ্ছে। সরকার অর্থনীতিতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। অতীতে যেখানে সরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ৮ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে ছিল, সেখানে তা বাড়িয়ে ১৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নেয়া হয়েছে।’ তার মতে, সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে রাজস্ব আয়ও বাড়াবে।

ব্যাংক ঋণ প্রসঙ্গে সচিব জানান, চলতি অর্থবছরে সরকারের ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। নতুন বাজেটে তা কমিয়ে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘সরকারের সামনে এখন বিকল্প অর্থায়নের বেশকিছু সুযোগ তৈরি হয়েছে।’

জমির মৌজা রেটে রিয়েল ভ্যালু নিয়ে আসবে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘মৌজা রেট রিভিউ করে সত্যিকার ভ্যালুতে নিয়ে আসব। তাহলে কালো টাকা সাদা হবে না। ধানের জমির এক মূল্য, বাড়ির জমির একটা মূল্য। কিন্তু জমি বেচাকেনার ক্ষেত্রে প্রকৃত দামের থেকে অনেক কম দাম দেখিয়ে নিবন্ধন করা হয়।’

এ পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান বলেছেন, ‘বাজেটে কালো টাকা সাদা করার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। বরং ভূমি ও ফ্ল্যাট কেনাবেচার ক্ষেত্রে প্রকৃত লেনদেনমূল্য প্রকাশে করদাতাদের উৎসাহিত করতে একটি সীমিত সুযোগ রাখা হয়েছে, যা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে।’

সভায় বৈশ্বিক যুদ্ধ ও জ্বালানি সরবরাহ সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি তৈরি হয়নি বলে মন্তব্য করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে আমেরিকার মতো দেশে ফ্লোরিডা ড্রাই হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশে ড্রাই হয় নাই। বাংলাদেশে তেল সবসময় স্টেবল ছিল, এখনো আছে। দেশে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে পুনরুজ্জীবিত করা, স্থল ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার এবং ২০৩০ সালের মধ্যে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার।’

সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী শাখাওয়াত হোসেন বকুল, মৎস্য ও কৃষিমন্ত্রী আমিনুর রশিদ, শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গণি, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি প্রমুখ।

আরও