সন্ত্রাসী তৎপরতা ও অপরাধ বেড়েছে খুলনায়, ৯ মাসে ৬৮ হত্যাকাণ্ড

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে খুলনা নগরে হত্যাকাণ্ড উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ৩৫ খুনের ঘটনার মধ্যে ৩১টির রহস্য উদ্‌ঘাটন করা সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে হুমকি-ধমকি ও চুরি-ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা নিয়ে নগরের থানাগুলোয় অভিযোগের সংখ্যা ঠেকেছে হাজারে।

দক্ষিণাঞ্চলের জেলা খুলনায় বেড়েছে সন্ত্রাসী তৎপরতা ও নানা অপরাধ। প্রায়ই ঘটছে হত্যাকাণ্ড, গুলি ও প্রাণহানির ঘটনা। পুলিশের তথ্যমতে, খুলনা জেলায় গত নয় মাসে ৬৮ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যার মধ্যে নগরীতেই ৩৫টি। এসবের বেশির ভাগই গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা। এছাড়া কিশোর গ্যাং, উঠতি সন্ত্রাসী সংগঠন ও বিভিন্ন অপরাধী চক্র প্রকাশ্যে হামলা, ছিনতাই, অপহরণ ও চাঁদাবাজি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ায় সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন।

স্থানীয়রা জানান, সন্ধ্যা নামলেই ভর করে আতঙ্ক। প্রতি রাতেই কোথাও না কোথাও গোলাগুলি, অস্ত্রের মহড়া, প্রতিপক্ষের ওপর হামলা বা সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। আবার কখনো খবর আসে অজ্ঞাতপরিচয়ের মরদেহ উদ্ধারের। মাদক চোরাচালান, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, নতুন গজিয়ে ওঠা মহল্লাভিত্তিক সন্ত্রাসী সংগঠনের তৎপরতা, আর নীরব চাঁদাবাজি তো আছেই। ঘটছে চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনাও। এতে জনমনে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে।

পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, খুলনা নগর ও এর আশপাশে অন্তত ১০টি শীর্ষ অপরাধী চক্র সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর নেতৃত্বাধীন গ্রুপ, পলাশ গ্রুপ, হুমা বাহিনী, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান গ্রুপ, শাকিল গ্রুপ ও নাসিম গ্রুপ রয়েছে বলে পুলিশের সূত্র জানিয়েছে। আধিপত্য বিস্তার করতে বা প্রতিশোধ নিতে তাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে খুলনা নগরে হত্যাকাণ্ড উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ৩৫ খুনের ঘটনার মধ্যে ৩১টির রহস্য উদ্‌ঘাটন করা সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে হুমকি-ধমকি ও চুরি-ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা নিয়ে নগরের থানাগুলোয় অভিযোগের সংখ্যা ঠেকেছে হাজারে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার মাত্র ১৫ ঘণ্টার ব্যবধানে খুলনা নগরে দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সকালে নগরের পূর্ব বানিয়াখামার এলাকায় তাওহিদুল ইসলাম (৩২) নামে এক যুবককে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। আর সন্ধ্যার পর নগরের জিন্নাহপাড়া এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন খুশি (২৫) নামের এক গৃহবধূ। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, পৃথক দুটি হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাদক ব্যবসা-সংক্রান্ত বিরোধ থাকতে পারে।

খুশি ও তার স্বামী সুমন সরদার ওরফে ব্লেড বাবু দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে জানান খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার (খুলনা জোন) মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ওই দম্পতির বিরুদ্ধে মাদকসংশ্লিষ্ট মামলাও রয়েছে। প্রাথমিকভাবে মাদকসংশ্লিষ্ট বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।’

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সদর থানার ওসি মো. লোকমান হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নিহত তাওহিদুল কারাগারে আটক খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসী পলাশ গ্রুপের অন্যতম সক্রিয় সদস্য ছিল। প্রতিপক্ষ গ্রুপের গুলিতে তার মৃত্যু হয়েছে বলে পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে। হত্যাকারীদের শনাক্ত করা হয়েছে।’

গত ১৭ অক্টোবর রাত ২টার দিকে নগরের পশ্চিম টুটপাড়া আমতলা মোড় এলাকায় শেখ জুম্মান রহমান বিশাল (২৭) নামের এক যুবককে গুলি করে তার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। তার বাম ঊরুতে গুলি লাগে। ৭ অক্টোবর দুপুরে খুলনা সদর সাব-রেজিস্ট্রার তন্ময় কুমার মণ্ডলকে তার কার্যালয় থেকে তিন যুবক জোর করে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে যায়। আধা ঘণ্টা পর তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। এ ঘটনার পর মুখ খুলছেন না সাব-রেজিস্ট্রার তন্ময়। থানায় কোনো অভিযোগও করেননি। তন্ময় বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে চাই না। পুলিশ তদন্ত করুক।’

গত ৯ অক্টোবর রূপসা থানার এক পুলিশ সদস্য শাহ আলম সম্প্রতি ডিউটি থেকে ফেরার সময় ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে গুরুতর জখম হন। ছিনতাইকারীরা তাকে চাপাতি দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে। এ ঘটনার পর খুলনার পুলিশ সুপার পুলিশ সদস্যদের রাতে একা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নোটিস জারি করেছে।

এছাড়া গত ১৫ আগস্ট রূপসা উপজেলার আইচগাতি ইউনিয়নের দুর্জনীমহল গ্রামে রাত ৯টার দিকে সন্ত্রাসী আশিক গ্রুপের সদস্য আক্তার ঢালীর ছেলে জয় ঢালীকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যার অভিযোগ ওঠে গ্রেনেড বাবুর লোকের বিরুদ্ধে। পুলিশ জানায়, গ্রেনেড বাবু গ্রুপের লোকজন তাকে হত্যা করে। এ ঘটনায় নিহতের মা নাসিমা বেগম মামলা করেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই মামলা তুলে নেয়ার জন্য চাপ দেয় গ্রেনেড বাবু। মামলা না তোলায় ছেলে হত্যার ৫০ দিন পর জয় ঢালীর বাবা আক্তার ঢালীকে হত্যা করা হয়।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, নগরীতে গত জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খুনের মামলা হয়েছে ২৮টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সেপ্টেম্বরে ছয়টি ও আগস্টে পাঁচটি। দস্যুতার ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৪টি। অপহরণের মামলা হয়েছে ১০টি এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৯২টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে মে মাসে ১৮টি এবং জুলাইয়ে ১৬টি।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) খুলনার জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা বলেন, ‘খুলনায় মানুষ শান্তিতে নেই। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কারণে সবার মধ্যে এক ধরনের ভয় ও শঙ্কা কাজ করছে। মানুষের কথার আগে গুলি চলছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম) এম শাকিলুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সন্ত্রাসী তৎপরতা হঠাৎই বেড়েছে, বিষয়টি এমন নয়। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় থেকেই এটির অবনতি হয়েছে। তবে মানুষ কম সচেতন হওয়ায় সন্ত্রাসীদের অবস্থান অথবা তাদের কর্মতৎপরতা নিয়ে তথ্য দেন না।’

স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-৬-এর (এসআরবি) কমান্ডার নিস্তার আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘খুলনায় অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। সীমান্ত এলাকা দিয়ে পার হচ্ছে এসব অস্ত্র। আমরা এসব সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার ও নেটওয়ার্ক ভাঙতে অভিযান অব্যাহত রেখেছি।’

খুলনার রূপসা, বটিয়াঘাটা, দিঘলিয়া ও তেরখাদা উপজেলাকে ডেঞ্জার জোন হিসেবে উল্লেখ করে খুলনার পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, ‘গত নয় মাসে রূপসায় ১১টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তেরখাদায় দুটি, দিঘলিয়ায় চারটি ও বটিয়াঘাটায় তিনটি। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, অপরাধ দমন, অবৈধ অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য উদ্ধার এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।’

আরও