বিদ্যুৎ খাতে সংকট এড়াতে তিন স্তরের ট্যারিফ কাঠামোর প্রয়োজন

—ড. এম রিজওয়ান খান

সাবেক চেয়ারম্যান, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ

সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় যেভাবে কমছে, তাতে না চাইলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ, দ্রুত বিস্তার লাভ করবে। হয়তো ট্যাক্স দিলে এর গতি কিছুটা কমবে, না দিলে আরো দ্রুত বাড়বে। কিন্তু এটিকে থামানো যাবে না।

সৌরবিদ্যুতের অংশ যত বাড়বে, ততই নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ সামনে আসবে। প্রথমত, এটি পুরোপুরি আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। দ্বিতীয়ত, রাতের বেলায় বিদ্যুৎ কোথা থেকে আসবে? তখন সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব নয়। ফলে বিদ্যমান গ্যাসভিত্তিক ও অন্যান্য বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভূমিকা কী হবে—এ প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

গত বছরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াট। অথচ দেশের মোট উৎপাদন সক্ষমতা এখন ৩০ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি। একটি উন্নয়নশীল দেশে কিছু অতিরিক্ত সক্ষমতা থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু প্রায় ১৮০ শতাংশ সক্ষমতা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। এটি মূলত পরিকল্পনাহীন সক্ষমতা বৃদ্ধি নির্দেশ করে। এখন যদি সৌরবিদ্যুৎ আরো বাড়ে, তাহলে এ অতিরিক্ত সক্ষমতা কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে সেটিও ভাবতে হবে।

বর্তমানে শিল্প-কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করলে এবং ইডকলের মতো প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ পাওয়া গেলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ হয় প্রায় সাড়ে ৫ থেকে ৬ টাকা। বাসাবাড়িতে ছোট আকারের রুফটপ সোলার করলে খরচ হয় ৭-৮ টাকা। কিন্তু বড় আকারের জমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রতি ইউনিট উৎপাদন ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১০ টাকা। তাহলে সরকার কোন ধরনের সৌরবিদ্যুৎকে উৎসাহ দেবে? আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নেট মিটারিং। যদি আমরা দ্রুত সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে চাই, তাহলে নেট মিটারিংকে আরো সহজ করতে হবে।

বর্তমানে বলা হয়, নেট মিটারিংয়ের জন্য অনুমতি নিতে হবে। অনেকে বলেন, নিয়ম এখন অনেক সহজ হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে যারা এ সেবা নিতে যান, তারা জানেন এখনো অনেক জটিলতা রয়েছে। নেট মিটারিং হওয়া উচিত ডিফল্ট ব্যবস্থা। একজন গ্রাহকের দুটি মিটার থাকবে। একটি দিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন, অন্যটি দিয়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করবেন। নিজের বাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বসাতে চাইলে তার আলাদা অনুমতির প্রয়োজন হবে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা এখনো সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারিনি।

আমাদের দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ভবিষ্যতের জন্য ব্যাটারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মেঘলা দিন বা রাতের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। আবার রূপপুর চালু হলে স্পিনিং রিজার্ভের প্রয়োজনও আরো বাড়বে। এ দুই সমস্যার সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হলো ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম।

বর্তমানে ব্যাটারি স্টোরেজ স্থাপনে প্রতি ইউনিটে প্রায় ৯ টাকা ব্যয় হয়। এর সঙ্গে গ্রিড থেকে চার্জ দেয়ার খরচ যোগ করলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রতি ইউনিট প্রায় সাড়ে ২১ টাকা। অথচ বর্তমানে পিক আওয়ারে বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৭ টাকা ৪০ পয়সা। তাহলে কেউ কেন ব্যাটারি ব্যবহার করবে? এ কারণেই ট্যারিফ স্ট্রাকচার পুনর্বিন্যাস জরুরি।

আমার মতে, বাংলাদেশের বিদ্যুতের ট্যারিফ তিন স্তরের হওয়া উচিত। প্রথমত, পিক আওয়ার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা। দ্বিতীয়ত, অফ-পিক। সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা। তৃতীয়ত, সুপার অফ-পিক। রাত ১০টা থেকে সকাল ৭টা।

ধরুন পিক আওয়ারে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ২২ টাকা করা হলো, কিন্তু দিনের অন্য সময়ে প্রতি ইউনিটে ৫০ পয়সা কমিয়ে দেয়া হলো। এতে গড় ট্যারিফ প্রায় একই থাকবে।

ফলে যারা এখন ডিজেল জেনারেটর ব্যবহার করেন, তারা ব্যাটারি ব্যবহারে আগ্রহী হবেন। রাতের সুপার অফ-পিক সময়ে তারা কম দামে ব্যাটারি চার্জ করবেন এবং সন্ধ্যার পিক আওয়ারে সেই বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন। ফলে দুটি বড় সুবিধা পাওয়া যাবে। প্রথমত, রাতের অফ-পিক সময়ে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়বে এবং সার্বিক লোড কার্ভ অনেক বেশি সমতল হবে। এছাড়া সন্ধ্যার পিক সময়ে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। এতে সরকারও লাভবান হবে। কারণ পিক আওয়ারে ২৩-২৫ টাকা ব্যয়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজন কমে যাবে।

ভবিষ্যতে যখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজেদের ব্যাটারি স্টোরেজ গড়ে তুলবে, তখন বিপিডিবি চাইলে তাদের সঙ্গে চুক্তি করে জরুরি মুহূর্তে কয়েক মিনিটের জন্য অতিরিক্ত বিদ্যুৎ কিনতে পারবে। এতে সরকারকে বিপুল বিনিয়োগ করে নতুন স্টোরেজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে না; সেই বিনিয়োগ করবে বেসরকারি খাত।

আরও