অপরাধ ও দুর্ঘটনার অনুষঙ্গ হয়ে উঠছে মোটরসাইকেল

ঢাকার বনশ্রীতে নিজ বাসার সামনে ছিনতাইয়ের কবলে পড়েন স্বর্ণ ব্যবসায়ী মো. আনোয়ার। তিনটি মোটরসাইকেল নিয়ে আসা ছিনতাইকারীদের একটি দল গুলি ও ছুরিকাঘাত করে তার সঙ্গে থাকা স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেয়।

ঢাকার বনশ্রীতে নিজ বাসার সামনে ছিনতাইয়ের কবলে পড়েন স্বর্ণ ব্যবসায়ী মো. আনোয়ার। তিনটি মোটরসাইকেল নিয়ে আসা ছিনতাইকারীদের একটি দল গুলি ও ছুরিকাঘাত করে তার সঙ্গে থাকা স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেয়। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত ছিনতাইয়ের এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে চাঞ্চল্য তৈরি হয়।

এক যুগলকে প্রকাশ্যে রামদা হাতে আঘাত করে চলেছে দুই ব্যক্তি, এমন আরেকটি ভিডিও সম্প্রতি যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি উত্তরায় সংঘটিত ওই ঘটনার সূত্রপাত একদল কিশোরের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো নিয়ে। বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর প্রতিবাদ করে ওই যুগল হামলার শিকার হন।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ধানমন্ডিতে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন তাহসিনা ফেরদৌস রিনিয়া নামের এক নারী। সকাল সাড়ে ৬টার দিকে স্বামীসহ একটি রিকশায় চড়ে স্কুলে যাচ্ছিলেন তিনি। রিকশাটি ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের জেনেটিক প্লাজার সামনে এলে মোটরসাইকেলে আসা দুজন ছিনতাইকারী তার ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক কালে যেসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, এর বেশির ভাগ সংঘটনের সময়ে অপরাধীদের মোটরসাইকেল ব্যবহার করতে দেখা গেছে। কিশোর গ্যাং এবং ছোট-বড় অনেক অপরাধীর অপরাধ কার্যক্রমের অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে দুই চাকার বাহনটি।

শুধু বিভিন্ন অপরাধ সংঘটন নয়, সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের ক্ষেত্রেও শীর্ষে রয়েছে বাহনটি। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ৭৬১টি। এতে নিহত হয়েছেন ২ হাজার ৬০৯ জন এবং আহত ১ হাজার ৮৩২ জন। নিহতদের মধ্যে ১ হাজার ৯৬৩ জন ১৪ থেকে ৪৫ বছর বয়সী।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ২৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ ঘটেছে জাতীয় মহাসড়কে। এছাড়া মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ৩৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে, ১৭ দশমিক ৪২ গ্রামীণ সড়কে ও ১৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ঘটেছে শহরের সড়কে। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেড়েছে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। আর বাহনটির দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বেড়েছে ৪ দশমিক ৯০ শতাংশ।

মোটরসাইকেল ব্যবহার করে ঢাকা মহানগর কিংবা সারা দেশে কী পরিমাণ অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, পুলিশের কাছ থেকে সে রকম কোনো তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে সংস্থাটির সদস্যরা বলছেন, অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল ব্যবহারের ঘটনা প্রায়ই দেখা যায়। এর কারণ হলো অপরাধ করার পর দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতেই অপরাধীরা এ ধরনের বাহন ব্যবহার করে।

যানজটপূর্ণ সড়ক বা সংকীর্ণ গলি দিয়ে এঁকেবেঁকে দ্রুত পালানোর সুযোগ থাকে বলেই অপরাধ সংঘটনের সময়ে মোটরসাইকেল ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে বলে মনে করছেন সড়ক পরিবহন বিশেষজ্ঞরাও। এছাড়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও এখানে ভূমিকা রয়েছে বলে অভিমত তাদের।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের রাজনীতিতেই তো মোটরসাইকেলে মাস্তানির বিশাল একটা ভূমিকা আছে। নেতা যখন শোডাউন করতে চায়, তখন মোটরসাইকেল দিয়েই করে। সে হিসেবে কোনো কোনো তরুণ মনে করতে পারে, আমি যদি পেশিশক্তিবান হতে চাই, আমার মোটরসাইকেল দরকার। এটি গাড়ির তুলনায় ভালো টুল হিসেবে কাজ করে। মোটরসাইকেল ব্যবহার করে এভাবে পেশিশক্তি প্রদর্শন থেকেই একটা সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। সে হিসেবে মোটরসাইকেলের অপব্যবহারটাও সবাই জানে।’

তিনি বলেন, ‘ছিনতাইয়ের প্রবণতাটা বাড়ে পালানোর সুযোগ কতটুকু আছে, তার ওপর ভিত্তি করে। মোটরসাইকেল এ সুযোগটা করে দেয় আমাদের দেশে। হাইজ্যাক বা কোথাও প্যানিক তৈরি করায় বাহনটির বিরাট ভূমিকা আছে।’

সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশে কিশোর তরুণদের মধ্যে মোটরসাইকেল ব্যবহার করে অপরাধ করার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। দেশের কিশোর-তরুণদের কাছে কী পরিমাণ মোটরসাইকেল রয়েছে, সরকারিভাবে তার কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে ঢাকার জন্য প্রণীত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা হালনাগাদ ও সংশোধনের জন্য প্রণীত একটি গবেষণা থেকে এ বিষয়ে কিছু ধারণা পাওয়া যায়। ওই গবেষণায় ঢাকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে মোটরসাইকেল ব্যবহারের প্রবণতা তুলে ধরা হয়। এতে দেখা গেছে, ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীদের ১০ দশমিক ৬ শতাংশ মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন। অন্যদিকে হাইস্কুল পর্যায়ে যাতায়াতে মোটরসাইকেল ব্যবহার করে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ শিক্ষার্থী। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মোটরসাইকেল নিয়ে বিভিন্ন সময় অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়েন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

যদিও অপরাধ বিজ্ঞানীরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, পেশাদার অপরাধীরা সাধারণত অপরাধ সংঘটনের সময় নিবন্ধনবিহীন মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন, যেন তাদের সহজে শনাক্ত করা না যায়। এ সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবিএম নাজমুস সাকিব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ক্রিমিনোলজির ভাষায়, অপরাধী কোনো অপরাধ করার আগে সবকিছুর পরিমাপ করে। এ নীতিকে ধারণ করে তারা অপরাধ করার আগে ধরা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বিবেচনা করে। অপরাধের সুবিধা নিতে গেলে সম্ভাব্য প্রতিবন্ধকতা তারা পরিমাপ করে। কর্ম শেষ করে নিজেকে নিরাপদ করার চিন্তাও করে। আমাদের দেশে, বিশেষ করে ঢাকায় এত বেশি ট্রাফিক থাকে যে চার চাকা ব্যবহার করে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ কম। সেজন্য অপরাধকারীরা মোটরসাইকেল ব্যবহার করে। অপরাধ করে পালানোর জন্য প্রধান সড়কে যেতে হয় না তাদের। শহরের অলিগলি দিয়েই সহজে পার পেয়ে যাওয়া যায়। আবার হাইওয়েতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে মোটরসাইকেল ব্যবহার হয় না। সেখানে চার চাকাই বেশি ব্যবহৃত হয়। অপরাধের জন্য জনপ্রিয় বাহন হয়ে উঠেছে মোটরসাইকেল।’

তিনি বলেন, ‘এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ করার জন্য সরকারের তরফ থেকে প্রায় সময়ই বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। হেলমেট পরিধান করা, মোটরসাইকেলে দুজনের বেশি আরোহণ না করা কিংবা কাগজপত্র ঠিক রাখা—এসব জায়গায় সরকার অনেক চেষ্টা করেছে। কিন্তু তার পরও আমাদের দেশে এমন অনেক মোটরসাইকেল রয়েছে, যেগুলোর রেজিস্ট্রেশনও নেই। আমাদের ঢাকা শহরে অপরাধ রোধ করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো পরিবেশগত ডিজাইন দিয়েই অপরাধ রোধ করা। অর্থাৎ পরিবেশটাই এমনভাবে তৈরি করা যে অপরাধকারী অপরাধ করার আগে ভাববে, আমার তো ধরা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে।’

ঢাকা মহানগর এলাকায় এখন প্রায় ১২ লাখ নিবন্ধিত মোটরসাইকেল রয়েছে। সারা দেশে সংখ্যাটি প্রায় ৪৬ লাখ। দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মোটরসাইকেল নিবন্ধন নেয়ার হার কমছে বলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যে উঠে এসেছে। ২০২৩ সালে বিআরটিএ থেকে ৩ লাখ ১০ হাজারের বেশি মোটরসাইকেল নিবন্ধিত হয়, যা ২০১৬ সালের পর থেকে সর্বনিম্ন। আর ২০২৪ সালের প্রথম ১১ মাসে (জানুয়ারি-নভেম্বর) নিবন্ধন হয়েছে ২ লাখ ৪১ হাজার ৭৬৮টি মোটরসাইকেলের।

মোটরসাইকেল ব্যবহার করে দেশে বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কার্যক্রম সংঘটিত হলেও সেগুলো প্রতিরোধে পুলিশের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করে না বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান।

এ প্রসঙ্গে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অপরাধীদের মধ্যে অপরাধ সংঘটনের পর মোটরসাইকেল ব্যবহার করে পালিয়ে যাওয়ার একটা প্রবণতা রয়েছে। তবে অপরাধ মানেই যে সেটি মোটরসাইকেল ব্যবহার করে হচ্ছে, বিষয়টি এমন না। অপরাধ সংঘটন বা পালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অপরাধীরা আরো বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে। ঢাকায় তো কয়েক লাখ বাইকার রয়েছেন, সবাই তো আর অপরাধী নন। সামগ্রিকভাবে আমি বলব, অপরাধের সঙ্গে আসলে মোটরসাইকেলের তেমন একটা সম্পর্ক নেই। যারা অপরাধী, তারা যেকোনো ধরনের যানবাহন ব্যবহার করেই অপরাধ ঘটাতে পারেন। মোটরসাইকেল ব্যবহার করে অপরাধের ঘটনা আমরা প্রায়ই দেখি। দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অপরাধীরা সাধারণত এটা ব্যবহার করে। পুলিশ সবসময় সব ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে তৎপর রয়েছে, কাজ করে যাচ্ছে।’

আরও