মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে আতঙ্ক, ফ্লাইট বাতিল

বহির্গমন ছাড়পত্র পেয়েও বিদেশে যেতে পারছেন না অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশী

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জীবনে।

ভিসা হয়েছে, বহির্গমন ছাড়পত্র নেয়া, টিকিট কাটা, সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন—তবু দেশ ছাড়তে পারছেন না অনেক কর্মী। ফ্লাইট বাতিল আর যুদ্ধের আতঙ্কে থমকে গেছে তাদের বিদেশযাত্রা। এর মধ্যে অনেকের ভিসার মেয়াদও ফুরিয়ে আসছে, নির্ধারিত সময়ে কাজে যোগ দিতে না পারলে চাকরি থাকবে কিনা—সেই অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংকটময় মুহূর্তে কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে প্রবাসী কর্মীদের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানে সরকারকে জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে। যারা বিদেশে যেতে ইচ্ছুক তাদের জন্য বিশেষ ফ্লাইট বা বিশেষ ব্যবস্থাপনায় কাজে যুক্ত করানো যেতে পারে। তারা যেন বিদেশে গিয়ে ঠিকভাবে কাজ ও বেতন পান সে বিষয়েও সরকারের কূটনৈতিক যোগাযোগ চালিয়ে যেতে হবে।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার দিন থেকে গতকাল পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে গমনেচ্ছু ৫০ হাজারের বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী বিএমইটির বহির্গমন ছাড়পত্র নিয়েছেন। এর মধ্যে সৌদি আরবে যেতে বহির্গমন ছাড়পত্র নিয়েছেন ২৭ হাজার ৮৭০ জন, কাতার ৪ হাজার ৩৬১, কুয়েত ১ হাজার ৭২৫, জর্ডান ১ হাজার ৩৮, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১ হাজার ১০, সিঙ্গাপুর ৭ হাজার ১৫, ইরাক ৬৬৩ এবং মালদ্বীপে ১ হাজার ৯৭৮ জন।

বাংলাদেশ থেকে বৈধভাবে বিদেশে চাকরিতে যেতে বাধ্যতামূলক অনুমোদন নিতে হয় বিএমইটির। অর্থাৎ বিদেশ যাওয়ার জন্য সব প্রক্রিয়ার শেষ ধাপ হলো বিএমইটির বহির্গমন ছাড়পত্র। এ ছাড়পত্র পেলে একজন কর্মী যেকোনো সময় দেশ ছেড়ে বিদেশে যেতে পারেন। এটি ছাড়া বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পার হওয়া যায় না। সাধারণত ভিসাপ্রাপ্তির পর তিন মাস সময় পান একজন কর্মী। এ তিন মাসের মধ্যে গন্তব্যের দেশটিতে কাজে গিয়ে আকামা নেন তারা। আকামা না থাকলে বা মেয়াদ শেষ হলে প্রবাসীরা অবৈধ হিসেবে গণ্য হন।

জানা গেছে, বিদেশে যেতে বহির্গমন ছাড়পত্র নেয়া অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশীই যুদ্ধাবস্থায় ফ্লাইট জটিলতা ও আতঙ্কের কারণে কাজে যোগ দিতে পারেননি। সংযুক্ত আরব আমিরাতে গমনেচ্ছু মোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘৬ লাখ টাকা খরচ করে ভিসা নিয়েছি। আমি আদৌ যেতে পারব কিনা, আমি যে মালিকের কাছে কাজ পেয়েছি সে অন্য কাউকে এর মধ্যে নিয়োগ দেবে কিনা বা আমি গেলে তখন কাজ পাব কিনা কিছুই জানি না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি। তবে সবচেয়ে ভালো হয় যারা এ পরিস্থিতিতে কাজে যেতে চায় তাদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় কাজে যাওয়ার ব্যবস্থা করা। কারণ আমরা কেউই বুঝতে পারছি না যে পরিস্থিতি আসলে কোন দিকে যাচ্ছে। কবে যুদ্ধ থামবে আর স্বাভাবিকভাবে সবকিছু চলবে।’

যদিও ছুটিতে দেশে আসা ও নতুন করে বিদেশে যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে বা শেষ হওয়ার পথে—এমন কর্মীদের ভিসার মেয়াদ এক মাস বাড়িয়েছে কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। তবে যেসব কর্মী নতুন বিদেশে যাওয়ার জন্য অপেক্ষায় রয়েছেন তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। নির্ধারিত সময়ে কাজে যুক্ত হতে না পারলে তার নির্দিষ্ট কাজ থাকবে কিনা বা তার পরিবর্তে অন্য কাউকে নেয়া হয় কিনা—এমন শঙ্কায় দিন পার করছেন অনেকে। কেউ কেউ ঋণ নিয়ে, আত্মীয়-স্বজনদের থেকে টাকা ধার করে বিদেশ যাওয়ার অর্থ জোগান দিয়েছেন। একদিকে আর্থিক বোঝা, অন্যদিকে কাজ হারানোর শঙ্কা—উভয় সংকটে পড়েছেন বিদেশে গমনেচ্ছুরা।

যুদ্ধের ভয়াবহতায় পরিবারের আতঙ্ক, আর্থিক চাপ ও কাজ হারানোর শঙ্কার কথা জানান সৌদি আরবে কনস্ট্রাকশন কাজে গমনেচ্ছু নরসিংদীর রাসেল হোসেন। তিনি বলেন, ‘আত্মীয়-স্বজন অনেকের কাছ থেকে একরকম বাড়িতে গিয়ে ঘুরে ঘুরে বিদায় নিয়েছি। বিদেশে যাব সব প্রক্রিয়া শেষ করে টিকিট কেটে বেকার বসে আছি। ফেসবুকে পরিবার আত্মীয়-স্বজন যুদ্ধের ভিডিও দেখে আতঙ্কগ্রস্ত। তারা এ পরিস্থিতিতে যেতে দিতে চায় না। আমিও প্রথমবার বিদেশ যাব তাই মনে চাপা আতঙ্কে আছি। আবার অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ে যে কাজে যেতে পারছি না তার জন্যও আতঙ্কে আছি। গিয়ে কাজ পাব কিনা বা কবে নাগাদ যেতে পারব, কখন পরিবেশ স্বাভাবিক হবে কিছুই বুঝতে পারছি না। অনেকের থেকে টাকা ধার করেছি বিদেশ যেতে। এখন ভবিষ্যৎটাই অনিশ্চিত হয়ে গেছে।’

ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের পর সৃষ্ট যুদ্ধাবস্থার কারণে ফ্লাইট জটিলতায় অনেকেই যেতে পারেননি নির্ধারিত গন্তব্যে। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গত ৩৫ দিনে প্রায় ৯ শতাধিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এছাড়াও চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৩৫ দিনে মধ্যপ্রাচ্যগামী ২৪৫টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। মূলত কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার, ইরান, ইরাক ও জর্ডানের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় এ অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। দুবাই, দোহা, আবুধাবি, কুয়েতসহ গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট হাবগুলোতে ব্যাপক ফ্লাইট বাতিল ও সময়সূচি পরিবর্তনের ঘটনা ঘটছে।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্লাটফর্ম) শরিফুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রবাসী কর্মীরা ৫-৬ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশ যান। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতিতে যারা স্বেচ্ছায় কাজে যেতে আগ্রহী তাদের জন্য সরকার বিশেষ ব্যবস্থা করতে পারে। এ পরিস্থিতির মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক প্রবাসীর কাজ নেই। তারা অনেকেই দৈনিক চুক্তিতে কাজ করেন। এ সংকটময় মুহূর্তে তারা যেন টিকে থাকতে পারে সরকারকে সেদিকেও নজর দেয়া দরকার। যুদ্ধ পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে আমাদের কারোরই ধারণা নেই। তাই যুদ্ধ পরিস্থিতি শেষে যদি কর্মীদের ফিরে আসতে হয় তাহলে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। যুদ্ধের কারণে দেশগুলোর অনেক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত, তাই সেখানে যুদ্ধ-পরবর্তী কাজের চাহিদাও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারকে এ বিষয়েও নজর দিতে হবে। নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে। প্রবাসে গমনেচ্ছুদের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।’

আরও