খালেদা জিয়ার প্রতীকী উপস্থিতিও আমাদের শক্তির উৎস হতে পারে

নিবন্ধটি চলতি বছরের ২ ডিসেম্বর বণিক বার্তায় প্রকাশিত হয়েছিল

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ২০০১-০৬ সময়ে যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন দুবার সরাসরি ওনার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ করার এবং কথাবার্তা বলার সুযোগ হয়েছে। সে দুটি অভিজ্ঞতার আলোকে বলি। একটি অভিজ্ঞতা ছিল ২০০২ সালের জানুয়ারিতে কাঠমান্ডুতে সার্ক সামিটের সময়। তখন আমি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডিরেক্টর জেনারেল। আমাকে সাময়িকভাবে কাঠমান্ডু মিশনের প্রধান করে পাঠানো হয়েছিল সার্ক সামিট আয়োজনের জন্য। তখন তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সেই সার্ক সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন। আমি তখন কাছে থেকে ওনার সঙ্গে কথা বলা এবং বিভিন্ন বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলাপের সুযোগ পেয়েছিলাম। যদিও তখনো আমার সম্পর্কে ওনার কাছে নেতিবাচক ধারণা উপস্থাপন করা ছিল। কিন্তু তার পরও একজন কর্মকর্তা হিসেবে যখনই আমি ওনার সঙ্গে কথা বলেছি, তিনি শিষ্টাচার বজায় রেখে, শালীনতা বজায় রেখে, একজন কর্মকর্তাকে যতটুকু সম্মান দেয়ার প্রয়োজন, তিনি সেটা দিয়েছেন। এটা একজন প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের নেতৃত্বের কাছ থেকে প্রত্যাশিত। আমি জানতাম যে আমার সম্পর্কে ওনার ধারণা মিশ্র; কিন্তু তিনি কখনই সেটা আমার কাছে প্রকাশ করেননি। আমাকে সম্মান দিয়েই কথা বলেছেন।

সার্ক সম্মেলন থেকে প্লেনে যখন ফিরে আসছিলেন, আমার সঙ্গে পররাষ্ট্র সচিবও ছিলেন। তিনি আমার সম্পর্কে দুই-একটি ভালো কথা বলেছিলেন। তখন তিনিও হাসিমুখে বলেছিলেন, ‘ভালো কাজ করেছেন।’ এরপর ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন বলে আমি ওনাকে বিদায় জানালাম, উনিও আমাকে বিদায় জানালেন। তিনি আমাকে সম্মানজনকভাবে বিদায় জানিয়েছিলেন, এটা আমার কাছে ইতিবাচক মনে হয়েছিল। আমি মনে করি, ওনার যে ধীরস্থির ও শিষ্টাচারপূর্ণ আচরণ, ওই পর্যায়ের মানুষের কাছ থেকে সেটাই প্রত্যাশিত।

আমাকে যখন ২০০৩ সালে নেপালে দায়িত্ব দেয়া হয়, তখনো জানতাম যে আমার সম্পর্কে ওনার মিশ্র ধারণা। রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে নিয়ম অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে যাই। ওনার অফিসে গিয়ে বসার আগে তিনি যে শব্দগুলো ব্যবহার করেছিলেন, তাতেই বুঝতে পারলাম যে ওনার সেই মিশ্র ধারণা বদলায়নি। আমি তখন কিছু সরাসরি প্রশ্ন করলাম। বললাম, আমি তো আপনার প্রতিনিধিত্ব করার জন্য যাচ্ছি সেখানে। আমাকে আপনার নির্দেশনা দিতে হবে যে আমি কী করব? কয়েকটি কথা বলার পরে তিনি হেসে বললেন, ‘আপনি এটা বললেন কেন?’ আমি বললাম, বলছি এ কারণে যে আমি যদি কিছু না করি তাহলে আপনি কিছু শুনবেন না। আর যদি ১০টা কাজ করি, তাহলে আটটা ঠিক হবে, দুইটা ভুল হবে। সে দুইটা ভুল নিয়ে যদি কেউ এসে আপনাকে বলে ‘উনি ভুল করেছেন’, তাহলে আপনি আমার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রয়োজনে আমাকে ডেকে বলবেন। কিন্তু আমাকে একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে যেন কেউ অসম্মান না করে, এ গ্যারান্টি আমাকে আপনার দিতে হবে। তিনি হেসে বললেন, ‘না, আপনি যান। আপনাকে কেউ বিরক্ত করবে না, আপনি কাজ করবেন।’ আমি তখন একটি স্বস্তি নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসি।

আমার কাছে তাকে অনেক বেশি সংযত মনে হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে আমার মতো পর্যায়ের কারো প্রশ্ন করার সুযোগ খুব একটা থাকে না। তিনি সেই প্রশ্নকে নেতিবাচকভাবে না নিয়ে হেসে বলেছিলেন, ‘আপনি যা কাজ করবেন, এটাই আপনার কাছ থেকে আমরা চাই।’ এতে আমি আশ্বস্ত হয়েছিলাম।

ওনার সংযত আচরণ, পক্ষ-বিপক্ষের মধ্যেও একজন কর্মকর্তাকে সম্মান দিয়ে কথা বলা, আমি মনে করি এটা নেতৃত্বের একটি বড় গুণ, যা তার মধ্যে ছিল। সে কারণেই বর্তমান প্রেক্ষাপটে আজ বাংলাদেশের সব শ্রেণী, পেশা ও মতের মানুষ ওনার জন্য দোয়া করছে। একজন রাজনৈতিক নেতার জন্য এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে? তিনি সেটা অর্জন করেছেন নিজের যোগ্যতা, মেধা ও ব্যক্তিগত গুণাবলির মাধ্যমে।

অনেক প্রতিকূলতা, অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে তিনি গেছেন; রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান হিসেবে বহু দায়িত্ব পালন করেছেন। মানুষের ভালোবাসা কখনো শুধু পদ দিয়ে আসে না, এটা আসে ব্যক্তিগত গুণ ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে। একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে কয়েকবার কাছাকাছি গিয়ে আলাপের যে সুযোগ পেয়েছি, সেখানে দেখেছি তিনি সবসময় সম্মান দিয়ে কথা বলেছেন, শিষ্টাচার বজায় রেখেছেন, যুক্তিগ্রাহ্য কথা গ্রহণ করেছেন। একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে এ ধরনের স্বস্তি পাওয়া সত্যিই ইতিবাচক অভিজ্ঞতা।

ছোট্ট হলেও এটি আমার একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা, একটি কঠিন সময়ের অভিজ্ঞতা। কিন্তু সেই কঠিন সময়েও ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় ওনার কাছ থেকে কোনো নেতিবাচকতা পাইনি। এটি আমার জন্য সুখকর অভিজ্ঞতা ছিল।

আমি ওনার সুস্থতার জন্য দোয়া করছি, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি। পাশাপাশি জাতির এ সংকটলগ্নে ওনার মতো একজন নেতৃত্বের প্রতীকী উপস্থিতিও আমাদের জন্য শক্তির উৎস হতে পারে বলেই মনে করি। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং আমরা যে ক্রান্তিকাল পার করছি, সে সময় তিনি যেন আমাদের সঙ্গে থেকে দেশের উত্তরণের পথচলায় অবদান রাখতে পারেন। এটাই আমার প্রত্যাশা।

এম হুমায়ুন কবির: বাংলাদেশী কূটনীতিক, বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) সভাপতি এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত

আরও