পাইকারি বাজারে কমতে শুরু করেছে পাম অয়েলের দাম

আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের প্রভাবে দেশে পাম অয়েলের দাম সম্প্রতি রেকর্ড পরিমাণে বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে সয়াবিন তেলের বাজারেও।

আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের প্রভাবে দেশে পাম অয়েলের দাম সম্প্রতি রেকর্ড পরিমাণে বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে সয়াবিন তেলের বাজারেও। এ অবস্থায় দফায় দফায় মিল মালিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে চলে বাজার তদারকি। এসব পদক্ষেপের প্রভাবে কমতে শুরু করেছে পাম অয়েলের দাম। তবে বিশেষ শুল্ক সুবিধা সত্ত্বেও দাম কমেনি সয়াবিন তেলের।

দেশের প্রধান পাইকারি বাজারগুলোয় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত দেশে পাম অয়েলের মণপ্রতি দাম ছিল প্রায় ৪ হাজার ৮০০ টাকা। বিগত তিন মাসে পাম অয়েলের মিল পর্যায়ে পাইকারি দাম উঠে যায় রেকর্ড ৬ হাজার ৫০০ টাকায়। তবে দুই দফায় শুল্ক কমানোর ঘোষণার পর এক সপ্তাহের ব্যবধানে পাম অয়েলের দাম মণপ্রতি অন্তত ২৫০ টাকা কমেছে। অন্যদিকে বর্তমানে মণপ্রতি সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার ৮০০ টাকায়।

দেশের অন্যতম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী মো. মঈনউদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘খোলা ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণ করলেও সেটি অধিকাংশ সময়ই মানা হয় না। দাম নির্ধারণ হয় বাজারের চাহিদার ভিত্তিতে। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় শুল্ক কমানোর ঘোষণা দেয়ার পর পাম অয়েলের দাম মণপ্রতি ২০০-২৫০ টাকা কমেছে। কিন্তু যে হারে সরকার শুল্ক কমিয়েছে, সে হারে দাম কমেনি। বরং বিশ্ববাজারে কয়েক দিন বুকিং দর কমে যাওয়ায় দাম নিম্নমুখী হয়েছে।’ বিশ্ববাজারে বুকিং ঊর্ধ্বমুখী হলে বাজার ফের বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

ভোজ্যতেলের দাম কমাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) গত মাসে সয়াবিন ও পাম অয়েল উৎপাদন এবং ব্যবসায়ী পর্যায়ে প্রযোজ্য মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ১৫ শতাংশ মওকুফ করে। আরেক আদেশে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত সয়াবিন কিংবা পাম অয়েল আমদানির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ভ্যাট ১৫ থেকে কমিয়ে করা হয় ৫ শতাংশ। ভোজ্যতেলের দাম কমানোর পৃথক দুটি আদেশের পরও পাইকারি বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়ে যায় লিটারপ্রতি অন্তত ১০-১৫ টাকা। দুই দফায় শুল্ক কমানোর পরও বাজারে দাম না কমায় লোকসান এড়াতে খোলাবাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেন মিল মালিকরা।

এদিকে ভোজ্যতেলের সরবরাহ বৃদ্ধি ও বাজারে দামের ঊর্ধ্বমুখিতা ঠেকাতে ১৪ নভেম্বর ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন বাণিজ্য উপদেষ্টা। বৈঠকে ভোজ্যতেল আমদানিতে বিদ্যমান মূসক হার ১০ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সরকারি এ ঘোষণার পর বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেল সরবরাহ বাড়াতে রাজি হয় কোম্পানিগুলো। তবে মূসক কমানোর পরও পণ্যটির দাম ও সরবরাহ স্থিতিশীলতায় ফেরা নিয়ে সন্দিহান খোদ আমদানিকারক মিল মালিকরাও।

মিল মালিকরা বলছেন, বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে অন্তত ৩৫ শতাংশ। সরকার কয়েক দফায় ১৫-২০ শতাংশ দাম কমিয়েছে। দেশে ভোগ্যপণ্যের বাজারে অস্থিতিশীলতা প্রতিরোধে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ভোজ্যতেল বিশেষত সয়াবিন তেলের দাম বাড়াতে চায় না। এ কারণে লোকসান হলেও দীর্ঘদিন বোতলজাত সয়াবিন তেল সরবরাহ দিয়ে এসেছেন আমদানিকারকরা। এখন যে পরিমাণ শুল্ক কমানো হয়েছে তাতে সাময়িকভাবে সরবরাহ দেয়া সম্ভব হলেও বিশ্ববাজারে বুকিং দর আরো বেড়ে গেলে সরবরাহ ফের বন্ধ করে দেয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।

সিটি গ্রুপের পরিচালক (করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স) বিশ্বজিৎ সাহা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম নানা কারণে বেড়ে গেছে। এতে সরকার কিংবা মিল মালিকদের কিছু করার নেই। এর পরও দেশের মানুষের স্বার্থে ব্যবসায়ীরা কয়েক মাস ধরে ভোজ্যতেল সরবরাহ দিয়ে আসছেন।’

ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা ও সংকটের বিষয়টি উঠে এসেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনেও। সর্বশেষ ৭ নভেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্য পর্যালোচনা ও পূর্বাভাস সেলের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৭ নভেম্বর বিশ্ববাজারে পরিশোধিত পাম অয়েলের বুকিং দর ছিল টনপ্রতি ১ হাজার ১৯৫ ডলার। এক সপ্তাহে আগে ছিল ১ হাজার ৭০ ডলার। অর্থাৎ সপ্তাহের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ১২৫ ডলার। অন্যদিকে ৭ নভেম্বর অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের বুকিং দর ছিল টনপ্রতি ১ হাজার ১৫১ ডলার ৭০ সেন্ট। এক সপ্তাহ আগে ছিল ১ হাজার ৮৩ ডলার ৩৬ সেন্ট। এক সপ্তাহে দাম বেড়েছে ৬৮ ডলার ৩৪ সেন্ট। বিশ্ববাজারের প্রভাব দেশের বাজারেও পড়েছে বলে মনে করছে সরকারি সংস্থাটি।

যদিও দামের অস্থিতিশীলতার জন্য বিশ্ববাজারে বুকিং দর বৃদ্ধির পাশাপাশি আমদানি কমে যাওয়াকেও দায়ী করেছেন আমদানিকারকরা। তাদের দাবি, ডলারের উচ্চ মূল্য ও আমদানিসংক্রান্ত বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে একই পরিমাণ অর্থে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় কম ভোজ্যতেল আমদানি হচ্ছে। তাছাড়া ৫ আগস্টের পর পূর্ববর্তী সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বেশ কয়েকটি মিল মালিক প্রতিষ্ঠানের আমদানি কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে।

মিল মালিকদের এসব বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যেও। চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে দেশে ভোজ্যতেল আমদানি হয় ৪৯ কোটি ২০ লাখ ডলার সমমূল্যের। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৫০ কোটি ২৩ লাখ ডলার।

আরও