উন্মুক্ত জলাশয়ে মৎস্যঘের, হুমকির মুখে দেশীয় মাছ ও জলজ প্রাণী

নড়াইলে ৫ হাজারের বেশি ঘেরের একটিরও নেই ছাড়পত্র

কৃষক ও পরিবেশসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিলের ভেতরে ও আশপাশে অপরিকল্পিতভাবে মাটি কেটে বাঁধ নির্মাণ ও গভীর ঘের তৈরি করায় বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

নড়াইলে প্রাকৃতিক জলাধার ও উন্মুক্ত বিলে অপরিকল্পিতভাবে খনন এবং বাঁধ দিয়ে গড়ে উঠছে মৎস্যঘের। জেলায় মোট ৫ হাজার ৩৯১টি মৎস্যঘের রয়েছে। এগুলোর একটিরও নেই পরিবেশ অধিদপ্তর কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষের বৈধ ছাড়পত্র। এতে সরকার বছরে কয়েক কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। অন্যদিকে ঘের খননের ফলে উন্মুক্ত জলাশয়ে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ায় বিলে বিদ্যমান জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ায় এরই মধ্যে আশঙ্কাজনক হারে কমেছে দেশীয় মাছ, শামুক, ঝিনুক, ব্যাঙ, কাঁকড়া ও জলচর পাখিসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতায় অনাবাদি হয়ে পড়ছে বহু বিঘা কৃষিজমি। এতে বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ।

কৃষক ও পরিবেশসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিলের ভেতরে ও আশপাশে অপরিকল্পিতভাবে মাটি কেটে বাঁধ নির্মাণ ও গভীর ঘের তৈরি করায় বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। কোথাও কোথাও ঘেরের বাঁধের কারণে পানি আটকে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে আগে যেখানে বছরে তিন ধরনের ফসল উৎপাদন হতো, সেখানে এখন কৃষকের পক্ষে নিয়মিত চাষাবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বিল অঞ্চলের মানুষ।

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ছোট-বড় যেকোনো ঘের খননের আগে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেয়ার বিধান রয়েছে। সাধারণত পাঁচ একরের নিচে কোনো জমিতে ঘের খনন করতে হলে শুধু পরিবেশের ছাড়পত্র নিতে হবে। পাঁচ একরের ওপরে কোনো জমিতে ঘের খনন করতে হলে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে আগে অবস্থানগত ছাড়পত্র নিয়ে পরে পরিবেশের ছাড়পত্র নিতে হবে।

অভিযোগ রয়েছে, জেলার কোনো ঘের মালিক পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেয়ার তোয়াক্কা করছেন না। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর নড়াইলের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল মালেক মিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ধান, পাটসহ অন্যান্য চাষাবাদের থেকে মাছ চাষ লাভজনক হওয়ায় কৃষকেরা যেখানে সেখানে ঘের খনন করছেন। ঘের খননের ক্ষেত্রে পরিবেশের ছাড়পত্র নেয়ার ব্যাপারে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। ছাড়পত্র পেতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে ৩ হাজার থেকে ১৫ লাখ টাকার সরকারি ফি জমা দেয়ার বিধান রয়েছে। বর্তমানে জেলায় একটি ঘেরেও ছাড়পত্র নেই।’

জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, জেলার তিন উপজেলায় মোট ৫৭টি বিল রয়েছে। মৎস্যচাষীর সংখ্যা ৮ হাজার ৪০৩। এ জনপদে মোট ঘের আছে ৫ হাজার ৩৯১টি। জানা গেছে, ছাড়পত্র নিয়ে ঘের মালিকরা সরকারি ফি নিয়মিত জমা দিলে এ খাত থেকে সরকার বছরে রাজস্ব পেত অন্তত ৫ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন নড়াইলের সভাপতি শাহ আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রাকৃতিক বিল ও জলাভূমি শুধু মাছের আধার নয়, এসব জলাশয় একটি এলাকার পানি ধারণ, নিষ্কাশন ও ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে বিলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে নানা ধরনের জলজ উদ্ভিদ, দেশীয় মাছ, শামুক, ঝিনুক, ব্যাঙ, কাঁকড়া, জলচর পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর আবাসস্থল। কিন্তু এসব উন্মুক্ত জলাশয়ের বিভিন্ন অংশ মাটি কেটে ঘেরে পরিণত করায় জলাভূমির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য বদলে যাচ্ছে।’

কৃষকদের ভাষ্য, আগে বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর একই জমিতে একাধিক মৌসুমি ফসল আবাদ করা যেত। কুমড়ির বিল, চাঁচুড়ীর বিল, পাটেশ্বরী বিল ও ইছামতির বিলসহ ১৮-২০টি বিলের কয়েক হাজার একর জমি বছরে চার-আট মাস জলাবদ্ধ থাকছে। এসব জমি বছরের বেশির ভাগ সময় অনাবাদি হয়ে আছে। তবে কৃষি অফিসের তথ্যানুযায়ী, জেলায় জলাবদ্ধ জমির পরিমাণ ৩০০ একর।

কুমড়ি বিলের কৃষক মো. কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আগে আমার জমিতে বছরে তিনটি ফসল হতো। বিলের বিভিন্ন এলাকায় ঘের খননের ফলে জমিতে পানি থাকে সারা বছর। এখন কোনো জমিতে একটি ফসল ফলাতে পারছি, আবার কোনোটিতে ফসল পাচ্ছি না।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নড়াইলের উপপরিচালক কৃষিবিদ মুহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, ‘কৃষিজমিতে ঘের খনন করতে হলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে শ্রেণী পরিবর্তন করে ও পরিবেশের ছাড়পত্র নিয়ে খনন করতে হবে। আইন না মানলে ভবিষ্যতে কৃষকেরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’

নড়াইল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘পরিবেশ রক্ষা করে মৎস্য চাষ করতে হবে। মৎস্য চাষ করতে গিয়ে বিলগুলোর যেন ঐতিহ্য হারিয়ে না যায়, সে বিষয়ে সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে। ফসলি জমিতে ঘের না করার জন্য মৎস্যচাষীদের নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।’

আরও