কোরবানির হাটে অবিক্রীত

ঢাকাফেরত গরুর রোগ ও ঋণের ভারে সংকটে ঝিনাইদহের খামারিরা

ঈদের আগে খামারজুড়ে ছিল ব্যস্ততা, চোখে ছিল স্বপ্ন। বছরের পর বছর কষ্ট করে লালন-পালন করা গরু বিক্রি করে ঋণ শোধ করবেন, সংসারের অভাব দূর করবেন—এমন প্রত্যাশা নিয়েই ঝিনাইদহের শত শত খামারি ছুটেছিলেন রাজধানীর পশুর হাটে।

কিন্তু ঈদ শেষ হওয়ার পর সেই স্বপ্নের জায়গা দখল করেছে হতাশা, লোকসান আর অনিশ্চয়তা। কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে অবিক্রীত গরু নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছে অনেককে। আর ফিরেই পড়েছেন নতুন বিপদে। ঢাকা থেকে ফেরত আনা অনেক গরুর মধ্যে খুরা রোগ, মুখে ঘা, জ্বর, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। ফলে একদিকে আর্থিক ক্ষতি, অন্যদিকে রোগাক্রান্ত পশুর চিকিৎসা ও খাদ্য ব্যয় নিয়ে সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন জেলার প্রান্তিক খামারিরা।

জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ঝিনাইদহে কোরবানির জন্য মোট ২ লাখ ৫২ হাজার ৩৯৭টি পশু প্রস্তুত করা হয়েছিল। এর মধ্যে জেলার চাহিদা ছিল ১ লাখ ৯৫ হাজার ৪২০টি। ফলে উদ্বৃত্ত পশুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৬ হাজার ৯৭৭। এসব পশুর বড় একটি অংশ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাটে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু প্রত্যাশিত বিক্রি না হওয়ায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পশু আবার খামারে ফিরে এসেছে।

জেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঈদের পর খামারগুলোয় উদ্বেগের পরিবেশ বিরাজ করছে। অবিক্রীত গরুর সংখ্যা বেশি হওয়ায় খামারিদের প্রতিদিন অতিরিক্ত খাদ্য ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় অনেকেই আতঙ্কিত।

কয়েকজন খামারি জানান, ঢাকা থেকে ফেরার পর গরুর মুখে ঘা, জ্বর, খাবারে অনীহা ও খুরে ক্ষতের মতো উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করেছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আনা হাজার হাজার পশুর সঙ্গে একই হাটে অবস্থান করার কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়েছে। দীর্ঘ সময় ট্রাকে যাতায়াত, প্রচণ্ড গরম ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাবেও পশুগুলো অসুস্থ হয়ে পড়েছে।

এদিকে গোখাদ্যের বাজারও খামারিদের জন্য নতুন মাথাব্যথা হয়ে উঠেছে। ভুসি, খৈল, খড় ও ঘাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় অবিক্রীত গরুগুলো খামারে রেখে পালন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন অতিরিক্ত খাদ্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেক খামারি নতুন করে ঋণ করার কথাও ভাবছেন।

ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বাদপুকুরিয়া গ্রামের নারী উদ্যোক্তা আম্বিয়া খাতুন লাকী এবার কোরবানির ঈদ সামনে রেখে ৩৪টি গরু প্রস্তুত করেছিলেন। খামার সম্প্রসারণের জন্য ব্যাংক ঋণ, এনজিওর ঋণ ও ব্যক্তিগত সঞ্চয় মিলিয়ে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন তিনি। ঈদের কয়েকদিন আগে গরুগুলো নিয়ে যান ঢাকার একটি বড় পশুর হাটে। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখেন, বাজারের চিত্র তার প্রত্যাশার সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি বলেন, ‘খরচের থেকে ৪ লাখ টাকা লোকসানে ২২টি গরু বিক্রি করেছি। বাকি ১২টি গরু ফিরিয়ে আনতে হয়েছে। এখন এগুলোর কয়েকটির মুখে ঘা ও খুরে সমস্যা দেখা দিয়েছে। রাতে দুশ্চিন্তায় ঘুমাতে পারি না। একদিকে লোকসান, অন্যদিকে রোগ-কীভাবে সামাল দেব বুঝতে পারছি না। আমার মতো অনেক নারী খামারি আছেন, যারা সংসারের হাল ধরতে খামার করেছেন। কিন্তু এবার ঈদের পর আমরা সবাই দুশ্চিন্তায় আছি।’

মহেশপুর উপজেলার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছি। ভেবেছিলাম ঈদের পর টাকা শোধ করে দেব। এখন সেই টাকাই শোধ করতে পারছি না। গরু বিক্রি হয়নি, আবার অসুস্থ হয়ে পড়ছে। কিস্তির টাকা কীভাবে দেব সেটাই বুঝতে পারছি না।’

ঝিনাইদহ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এএসএম আতিকুজ্জামান বলেন, ‘ঈদের হাটে দীর্ঘ সময় অবস্থান ও দূরপাল্লার পরিবহনের কারণে পশুগুলো শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় খুরা রোগ, নিউমোনিয়া ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে একই স্থানে বিভিন্ন এলাকার পশু একত্র হওয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। আক্রান্ত পশুকে দ্রুত আলাদা রাখতে হবে ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে মাঠ পর্যায়ে খামারিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও চিকিৎসা সহায়তা দেয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’

আরও