দুধপুকুরিয়া-ধোপাছড়ি অভয়ারণ্য

স্থানীয়দের জন্য তৈরি সড়ক ধরে বেড়েছে গাছ পাচার

স্থানীয় বাসিন্দাদের যোগাযোগ নিশ্চিত করতে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার দুধপুকুরিয়া-ধোপাছড়ি অভয়ারণ্যের ভেতর দিয়ে একটি সড়ক নির্মাণ করেছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের যোগাযোগ নিশ্চিত করতে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার দুধপুকুরিয়া-ধোপাছড়ি অভয়ারণ্যের ভেতর দিয়ে একটি সড়ক নির্মাণ করেছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ। এখন সে পথ ধরেই অভয়ারণ্যের মূল্যবান গাছ অবাধে পাচার করছে বনদস্যুরা। এলাকার প্রভাবশালী ও পাহাড়ের বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন এর সঙ্গে জড়িত। ফলে রাতের আঁধারে বন উজাড় করলেও জীবনের ভয়ে মুখ খুলছে না স্থানীয়দের কেউ। বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, গহিন এ অভয়ারণ্যের ভেতর বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের আস্তানা। তাদের ভয়েই মূলত কেউ মুখ খোলে না। লোকবল সংকটের কারণে নিয়মিত টহল ও অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও জানান তারা। 

দুধপুকুরিয়া, পূর্ব ও পশ্চিম খুরুশিয়া, পশ্চিম ধোপাছড়ি ও জঙ্গল ধোপাছড়ি মৌজার ৪ হাজার ৭১৬ একর এলাকাজুড়ে রাঙ্গুনিয়া-চন্দনাইশ উপজেলার মাঝামাঝি এ অভয়ারণ্যের অবস্থান। যেখানে রয়েছে প্রাকৃতিক ছড়া, বিভিন্ন প্রজাতির পশু-পাখি, আদিবাসী পল্লী, বুনো অর্কিড, শতবর্ষী বিভিন্ন প্রজাতির গাছ, নিবিড় বাঁশ বন, পাহাড়ি বন এবং ঘন বেত বাগান। দুধপুকুরিয়া-ধোপাছড়ি বনাঞ্চলকে ২০১০ সালে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করে সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সহযোগিতায় বন্যপ্রাণীদের এ আবাসকে আরো নিবিড় করতে নেয়া হয় ‘ইন্টিগ্রেটেড প্রটেক্টেড এরিয়া কো-ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট।’ এর ফলে ১৯২৭ সালের (সংশোধিত) বন আইন অনুসারে, বন অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া সংরক্ষিত এ বনাঞ্চলের ভেতর কোনো উন্নয়নমূলক কার্যক্রম নিষিদ্ধ। কিন্তু বন বিভাগের আপত্তি সত্ত্বেও দুর্লভ প্রজাতির বৃক্ষ ও বন্যপ্রাণীর এ অবাধ বিচরণ ক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে সড়ক নির্মাণকাজ শুরু করে সওজ। 

জানা যায়, চট্টগ্রামের পটিয়া, হাইদগাঁও, রাঙ্গুনিয়া হয়ে বান্দরবান পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার নতুন একটি সড়ক নির্মাণের প্রস্তাবনা দিয়েছিল সওজ। নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ৩৩৬ কোটি টাকা। তবে বন বিভাগের তীব্র আপত্তির মুখে প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদন না পেলেও তার আগেই ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ করে ফেলে সওজ। তবে কিছু অংশে ইট বসানো হলেও কার্পেটিং করতে পারেনি। এ পথ ধরেই এখন অভয়ারণ্যের গাছ কেটে পাচারের হার বেড়ে গেছে।  

স্থানীয়রা জানান, ধোপাছড়ি ও দুধপুকুরিয়া বনাঞ্চলের গাছ বনদস্যু বা পাচারকারীরা রাতের আঁধারে কেটে নিয়ে যায়। গহিন এলাকার যেখানে বসতি নেই সেখান থেকেই মূলত কেটে ট্রাক বা মিনি ট্রাকে করে এসব দুর্লভ গাছ পাচার করা হচ্ছে। স্থানীয়দের জন্য নির্মিত সড়কটিই এখন পাচারকারীদের বড় রুট হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া কেটে নিয়ে যাওয়ার পর গাছের গোড়ায় আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়, যাতে গাছ কাটা হয়েছে সেটা বোঝা না যায়। কিছুদিন আগেও গাছ কাটার সময় বন বিভাগের লোকরা চলে আসায় সেগুলো ফেলেই বনদুস্যরা পালিয়ে যায়। ফলে কাউকে গ্রেফতার সম্ভব হয়নি। তবে স্থানীয় প্রভাবশালী এবং পাহাড়ে পালিয়ে থাকা কিছু সংগঠনের লোকজন এসব গাছ কাটছে। এমনকি তাদের কর্মকাণ্ডে চুপ থাকার জন্য রাতের বেলায় স্থানীয়দের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি দিচ্ছে। 

ধোপাছড়ি ইউনিয়নের গোলার পাহাড়ের পাশের এলাকায় গত ৩১ জানুয়ারি একটি সেগুন গাছ কাটার সময় স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে বনরক্ষিরা অভিযান চালায়। কিন্তু টের পেয়ে বনদস্যুরা আগেই পালিয়ে যায়। ফলে কাটা সেগুন গাছটি উদ্ধার করেই সন্তুষ্ট থাকতে হয় অভিযানিক দলটিকে। দক্ষিণ বন বিভাগের নিরাপত্তারক্ষীরা প্রায়ই অভিযান চালিয়ে সেগুনসহ অন্যান্য গাছ পাচারের সময় উদ্ধার করেন। কাউকে ধরতে না পারায় বাধ্য হয়ে অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে মামলা করে বন বিভাগ।

দোহাজারী রেঞ্জের বন বিভাগের কর্মকর্তা সিকদার আতিকুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বেশ কিছুদিন ধরে পাহাড়ি এলাকার মূল্যবান গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে বনদস্যুরা। এরই মধ্যে অনেক গাছই কেটে ফেলা হয়েছে। আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচলনা করছি। কিছু উদ্ধার করতেও সমর্থ হচ্ছি। কিন্তু যারা এর সঙ্গে জড়িত তারা রাতের আঁধারে গাছগুলো কেটে নিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে অবহিত করা হয়েছে। তাছাড়া আমরা আমাদের টহল বাড়িয়েছি।’ 

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, নতুন সড়কটি নির্মাণ করা হয়েছে একবারেই ধোপাছড়ি ও দুধপুকুরিয়া অভয়ারণ্যের ভেতর দিয়ে। এটি নির্মাণ করতে গিয়ে বনাঞ্চলের অনেক পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে। বন বিভাগ এতে বাধা দেয়ায় সওজ কাজটি সম্পন্ন করতে পারেনি। তবে সওজ অনুমতি না নিয়েই অনেকখানি সড়ক আগেই তৈরি করে ফেলে। যে পথ ধরে যে কেউ সহজেই বনের ভেতর প্রবেশের অধিকার পেয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া সেগুন গাছ বেশি থাকায় বনদস্যু বা পাচারকারীদের নজর এ বনের দিকেই বলে জানান তারা।

ধোপাছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল আলীম বলেন, ‘আমার এলাকাটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত। গত কিছু দিন ধরেই পাহাড়ি এলাকায় গাছ কাটার খবর পাচ্ছি। বিষয়টি বন বিভাগকে জানানো হয়েছে। তাছাড়া আমি নিজেও স্থানীয়দের বিষয়টি অবহিত করেছি। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রশাসন এবং পুলিশের সঙ্গেও কথা হয়েছে।’ 

চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক অরুণ বরণ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কাঠ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে বন বিভাগ কঠোর অবস্থানে আছে। আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করে বনদস্যুদের তথ্য সংগ্রহ করে ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। তবে শান্তিবাহিনী নামের একটি সংগঠন এ গাছ কাটার সঙ্গে জড়িত। এমনকি তারা স্থানীদের হুমকিও দিচ্ছে যাতে তাদের বিষয়ে বন বিভাগকে কিছু না বলে। আমরা প্রশাসন এবং পুলিশকে বিষয়টি জানিয়েছি। বেশকিছু মামলাও হয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছি।’

আরও