অ্যাটর্নি জেনারেল

আবরার ফাহাদের মৃত্যু থাই পাহাড়ের মত ভারী

২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর দিবাগত রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের নির্যাতনে নিহত হন আবরার ফাহাদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন তিনি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদের মৃত্যু আমাদের জাতীয় জীবনে থাই পাহাড়ের মত ভারী হয়ে আছে বলে মন্তব্য করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। আবরার হত্যা মামলায় ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ৫ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রেখে রোববার (১৬ মার্চ) হাইকোর্টের দেয়া রায়ের পর সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।

এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এ ধরনের রায়ের মধ্য দিয়ে একটি রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় ডিসিপ্লিন আনার জন্য ও ন্যায় বিচার নিশ্চিতে বিচার বিভাগের প্রতি যে ধারণা, সে ধারণা প্রতিষ্ঠিত হলো।

তিনি আরো বলেন, আজকের রায়ের মধ্য দিয়ে সমাজে এই বার্তা গেল যে, আপনি যত শক্তিশালীই হন না কেন, আপনার পিছে যত শক্তিই থাকুক না কেন, সত্য একদিন প্রতিষ্ঠিত হবে এবং ন্যায় বিচার হবেই।

বুয়েট ছাত্র আবরারের মৃত্যু প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, মাও সে তুং-এর মতো বলতে হয়, কোন কোন মৃত্যু থাই পাহাড়ের মত ভারী। কোন কোন মৃত্যু পাখির পালকের মতো হালকা। আবরার ফাহাদের মৃত্যু আমাদের জাতীয় জীবনে থাই পাহাড়ের মত ভারী হয়ে আছে। তার মৃত্যু গোটা জাতির মূল্যবোধের শেকড়ে নাড়া দিয়েছে।

এদিকে হাইকোর্টের রায়ের পর আবরার ফাহাদের বাবা মো. বরকত উল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, আজকের রায়ে আমরা আপাতত সন্তুষ্ট। আজ হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছেন, আমরা চাই রায়টা যেন দ্রুত কার্যকর হয়। নিম্ন আদালতে থেকে শুরু করে আজকের রায় পর্যন্ত আমরা সন্তুষ্ট। তবে আমার মতো আর কোনো বাবার বুক যেন এভাবে খালি না হয়। যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে র‌্যাগিং আছে, আমরা সেগুলোর পরিবর্তন চাই। ছাত্ররা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভালোভাবে বসবাস করবে, এটা চাই। এ ধরনের ঘটনা যেন আর না ঘটে। আর আবরারকে এ বছরের স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য মনোনীত করায় সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। এই স্বীকৃতির জন্য আমরা গর্বিত।

আবরার ফাহাদ ১৯৯৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ার কুমারখালীর রাধানগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা বরকত উল্লাহ পেশায় ব্যাংকার। আর মা রোকেয়া খাতুন একজন গৃহিণী। কুষ্টিয়া মিশন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আবরার আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু করেন এবং পরে কুষ্টিয়া জেলা স্কুলে ভর্তি হন। সেখান থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি পাস করে ঢাকার নটরডেম কলেজে ভর্তির সুযোগ পান ও কৃতিত্বের সঙ্গে এইচএসসি পাস করেন।

আবরার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান। তার মায়ের ইচ্ছা ছিল ছেলে চিকিৎসাবিদ্যায় পড়ুক। তবুও আবরার ইঞ্জিনিয়ারিং বেছে নেন এবং বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগে ভর্তি হন। তিনি বুয়েট এনার্জি ক্লাবসহ বেশ কয়েকটি ক্লাবের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন।

২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর দিবাগত রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের নির্যাতনে নিহত হন আবরার ফাহাদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন তিনি। এ হত্যাকাণ্ডে সারাদেশের ছাত্র সমাজ ফুঁসে ওঠে এবং বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ ব্যাপক প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠন এ নির্মমতার বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া জানায়।

২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর আবরার হত্যা মামলায় ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন ঢাকার আদালত। এরপর ২০২২ সালের ৬ জানুয়ারি আবরার হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। অন্যদিকে, আসামিরা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। একপর্যায়ে গত বছর ৭ অক্টোবর অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান, এই মামলায় দ্রুত পেপারবুক তৈরি করে হাইকোর্টে আপিল শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হবে। সেই ধারাবাহিকতায় হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি শুরু হয়। শুনানি শেষে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রায়ের জন্য বিষয়টি অপেক্ষমান রাখেন হাইকোর্ট। আজ সেই রায় হলো।

সূত্র: বাসস

আরও