শিল্পের উৎপাদন এখন ২০২৪ জুলাইয়ের স্তরে নেমে এসেছে

গত বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী অস্থির পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা নেমে এসেছিল। এতে শিল্পোৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।

গত বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী অস্থির পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা নেমে এসেছিল। এতে শিল্পোৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। তবে এর পরের প্রান্তিকেই বৃহৎ শিল্পোৎপাদন কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়, যা অব্যাহত ছিল চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকেও। কিন্তু এরপর দ্বিতীয় প্রান্তিক থেকে বৃহৎ শিল্পোৎপাদন আবারো নিম্নমুখী। এমনকি এ বছরের জুনে বৃহৎ শিল্পোৎপাদন সূচক গত বছরের জুলাইয়ের চেয়েও কমে গেছে। শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস সংকট, যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ ইস্যুর মতো বিষয়গুলো শিল্পোৎপাদন হ্রাসে প্রভাব ফেলেছে। অন্যদিকে, অর্থনীতিবিদদের মতে মূল্যস্ফীতির চাপে ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি শিল্পোৎপাদন বৃদ্ধির জন্য অনুকূল নয়।

দেশের বৃহৎ, মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পের উৎপাদন পরিস্থিতি নিয়ে মাসভিত্তিক তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। সংস্থাটির সর্বশেষ প্রকাশিত শিল্পোৎপাদন সূচকে ৫২৬টি বৃহৎ শিল্পের উৎপাদনের তথ্য বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। এতে দেখা যায়, চলতি বছর জুনের শেষে দেশের বৃহৎ শিল্পের উৎপাদন সূচক দাঁড়িয়েছে ২০২ দশমিক ৩৯ পয়েন্টে। গত বছরের জুলাইয়ে এ সূচক ছিল ২০৩ দশমিক ৩৩ পয়েন্ট। গত এক বছরে বৃহৎ শিল্পের উৎপাদন সূচকে কখনো ঊর্ধ্বমুখিতা আবার কখনো নিম্নমুখিতা দেখা গেছে। গত বছরের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে সূচকটি নিম্নমুখী ছিল। তবে এর পর বৃহৎ শিল্পের উৎপাদন বাড়তে শুরু করে এবং এ বছরের জানুয়ারিতে সূচক দাঁড়ায় ২৫৫ দশমিক ৬১ পয়েন্টে। এর পরের দুই মাসে সূচক কিছুটা হ্রাস পেয়ে মার্চ শেষে হয় ২৩৮ দশমিক ৯৭ পয়েন্ট। যদিও তা গত বছরের চেয়ে ওপরের দিকেই ছিল। কিন্তু এপ্রিলে সূচক আরো কমে ১৮২ দশমিক ১২ পয়েন্টে নেমে আসে, যা গত এক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোটেও সন্তোষজনক নয়। আছে রাজনৈতিক অস্থিরতাও। বিশেষ করে সামনের বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরো বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। তারা বলছেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণ প্রক্রিয়া কোনো কারণে প্রলম্বিত হলে তা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য মোটেও অনুকূল হবে না। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে উৎপাদন বিঘ্নিত হওয়ার বেশকিছু ঘটনা গত এক বছরে দেখা গেছে। তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও এ শুল্ক ও যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে। স্থানীয় ও বৈশ্বিক এসব ইস্যু বাংলাদেশের শিল্পোৎপাদনে প্রভাব ফেলেছে।

শিল্পোৎপাদন পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি এবং বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ট্যারিফ ইস্যু নিয়ে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে তা পশ্চিমা অর্থনীতির ওপরই বেশি প্রভাব ফেলেছে। তাছাড়া ইউরোপের দেশগুলো রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের কারণে তাদের উন্নয়ন বাজেট কাটছাঁট করে সামরিক খাতে বেশি অর্থ ব্যয় করছে। এর ফলে ইউরোপের দেশগুলোর অর্থনীতিতে অভ্যন্তরীণ লেনদেন কমে গেছে। এ দুটি কারণে আমাদের অন্যতম বাজার ইউরোপে কার্যাদেশ কমে গেছে। আশা করছি আগামী অক্টোবর থেকে উৎপাদন আবার বাড়বে।

চাহিদা অনুসারে পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ না পাওয়ার বিষয়ে দেশের শিল্পোদ্যোক্তাদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বর্তমানেও গ্যাস সংকটের কারণে অনেক শিল্প-কারখানায় সক্ষমতার চেয়ে কম উৎপাদন হচ্ছে। এ পরিস্থিতিও সার্বিকভাবে বৃহৎ শিল্পোৎপাদন সূচক কমার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।

মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান তানভিরুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিল্পোৎপাদন কমে যাওয়ার কারণ হচ্ছে এরই মধ্যে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে আছে। আবার অনেকে সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম উৎপাদন করছে। পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় অনেক কারখানা ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। তাছাড়া বাজারের সমস্যা, কার্যাদেশ না পাওয়ার মতো বিষয়ও থাকতে পারে। কিন্তু গ্যাসের কারণে যে অনেক শিল্পের উৎপাদন কমে গেছে এতে সন্দেহ নেই।’

বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি গত জুন শেষে ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যা এ যাবৎকালের মধ্যে সর্বনিম্ন। তবে জুলাইয়ে এ ঋণ প্রবৃদ্ধি সামান্য বেড়ে ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ হয়েছে। সুদহার বাড়ার কারণে বাধ্য না হলে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে আগ্রহী হচ্ছেন না উদ্যোক্তারা। নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার আগে নতুন করে বিনিয়োগেও আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না তাদের। ফলে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও উৎপাদন বাড়ার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রেই সংকোচন হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও রফতানি আয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত শিল্প খাতের মৌলিক তিনটি উপকরণের (মূলধনি যন্ত্রপাতি, মধ্যবর্তী পণ্য ও কাঁচামাল) আমদানি এলসি খোলার প্রবণতা ছিল নিম্নমুখী। এর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলার পরিমাণ ছিল ১৭৫ কোটি ডলার। যেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৩৪ কোটি ডলারের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলা হয়েছিল। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে শিল্প স্থাপনের প্রধান এ উপকরণ আমদানি কমেছে ২৫ দশমিক ৪১ শতাংশ। এ সময়ে শিল্পের মধ্যবর্তী পণ্য আমদানির এলসি খোলা কমেছে ৬ দশমিক ২৬ শতাংশ। এছাড়া শিল্পের কাঁচামাল আমদানির এলসিও দশমিক ১৫ শতাংশ কমেছে।

অর্থনীতিবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিল্পোৎপাদন অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। মূল্যস্ফীতির কারণে দরিদ্র্য ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আয়ের বড় অংশই মৌলিক চাহিদার পেছনে ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানও সেভাবে হচ্ছে না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বাজারে চাহিদা কমেছে। এছাড়া শিল্পোৎপাদনের জন্য রাজনৈতিক, অথনৈতিক ও সামাজিকভাবে যে ধরনের স্থিতিশীল পরিবেশ দরকার সেটি এখন দেশে নেই। সব ক্ষেত্রেই একটি অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। ফলে শিল্পোৎপাদন বাড়ার জন্য অনুকূল পরিবেশ বর্তমানে বিরাজ করছে না।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক। চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি রয়েছে প্রশাসনিক জটিলতাও। এমন পরিস্থিতিতে বড় বিনিয়োগের ঝুঁকি নিচ্ছেন না স্থানীয় উদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, সবকিছুর কোনো টেকসই সমাধান হবে এমন উচ্চাশা না থাকলেও বিনিয়োগের জন্য তারা নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী নির্বাচন হতে এখনো প্রায় ছয় মাস বাকি। এ সময়ের মধ্যে দেশে বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটার কোনো আশা দেখছেন না তারা। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের দাবির প্রতিফলন পাওয়া যাচ্ছে শিল্প খাতে মেয়াদি ঋণ বিতরণ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানেও। গত অর্থবছরের (২০২৪-২৫) জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে শিল্পে মেয়াদি ঋণ বিতরণ ছিল গত সাত প্রান্তিকের মধ্যে সর্বনিম্ন।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত বছরের জুলাই-আগস্টে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে স্থবিরতা এসেছিল সেটি একটা দিক। কিন্তু তার পর থেকে এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি অস্থিতিশীলই আছে। অস্থিরতা কখনো কিছুটা বাড়ে, তো কখনো কিছু কমে—এ রকম একটি অবস্থা। এ অবস্থার প্রভাব হয়তো শিল্পোৎপাদনের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে। তাছাড়া পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকারও প্রভাব পড়তে পারে উৎপাদনে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বাস্তব কারণে অনেক শিল্প-কারখানা খেলাপি হয়ে যাওয়ার কারণে তারা উৎপাদন বাড়াতে নতুন করে বিনিয়োগ করেনি। পাইপলাইনে থাকা আগের কিছু মূলধনি যন্ত্রপাতি ও বিনিয়োগের কারণে হয়তো মাঝে কিছুটা উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু সার্বিকভাবে উৎপাদন বাড়ার কোনো কারণ আমি দেখি না।’

আরও