কিন্তু রাজধানীর সঙ্গে এ অঞ্চলের প্রধান সংযোগপথ ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দীর্ঘদিনের দুরবস্থা এবং চার লেনে উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতির কারণে সেই সম্ভাবনার বড় অংশ অধরাই থেকে যাচ্ছে। শিল্প-কারখানার পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, পর্যটন খাতে কমছে করপোরেট গ্রাহক, চা পরিবহনে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘসূত্রতা। উদ্যোক্তারা বলছেন, একটি মহাসড়কের সীমাবদ্ধতা এখন পুরো অঞ্চলের শিল্প, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সরজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের উন্নয়নকাজ চলছে ধীরগতিতে। এতে সড়কটির অনেক অংশ এখন খানাখন্দে ভরা। বৃষ্টি হলে গর্তে পানি জমে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল বিশ্বরোড, নরসিংদীসহ বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই পণ্যবাহী ট্রাক বিকল হয়ে পড়ে বা গর্তে আটকে যায়। তখন কয়েক কিলোমিটারজুড়ে যানজট তৈরি হয়। ভারি বৃষ্টির কারণে সর্বশেষ গত বুধবার মহাসড়কটিতে ২০ কিলোমিটারের বেশি এলাকাজুড়ে তীব্র যানজট দেখা দেয়। সড়কটির বেহাল দশার কারণে ৪-৫ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগছে ৮-১০ ঘণ্টা। এতে যাত্রী দুর্ভোগের পাশাপাশি শিল্প-কারখানার কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে।
বিগত দুই দশকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ঘিরে হবিগঞ্জের মাধবপুর থেকে হবিগঞ্জ সদর পর্যন্ত প্রায় ৫২ কিলোমিটার শিল্প করিডোরে কয়েকটি শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠীর বড় উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের তুলনামূলক সহজপ্রাপ্যতা এবং রাজধানীর সঙ্গে সড়কপথে স্বল্প দূরত্বের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে এ এলাকায় প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, স্কয়ার গ্রুপসহ একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করেছে। বিশেষ করে হবিগঞ্জের অলিপুর শিল্পাঞ্চলে এসব প্রতিষ্ঠানের একাধিক কারখানা থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। তবে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দীর্ঘস্থায়ী দুরবস্থা ও চার লেন প্রকল্পের ধীরগতির কারণে এ শিল্প করিডোরের সরবরাহ ব্যবস্থা ক্রমেই ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সড়কটি আধুনিকায়নের কাজ দ্রুত শেষ না হলে এ অঞ্চলে নতুন শিল্প বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং বিদ্যমান শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা আরো কঠিন হয়ে পড়বে।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে দীর্ঘস্থায়ী যানজটের কারণে বাজারে সময়মতো পণ্য পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন প্রাণ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইলিয়াছ মৃধা। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বেকারির মতো কিছু পণ্য ভোরের মধ্যেই বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করতে হয়। কিন্তু রাতে গাড়ি ছাড়লেও যানজটের কারণে অনেক ক্ষেত্রে বিকাল বা সন্ধ্যার আগে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এতে নির্ধারিত দিনে পণ্য বিক্রি করা যায় না এবং প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।’
পণ্য পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে গেছে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের কারণে সিলেটগামী ট্রাকের ভাড়া অন্যান্য রুটের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। এতে পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে এবং উৎপাদন ব্যয়ের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।’
সিলেট অঞ্চলের অন্যতম বড় শিল্প চা খাতও মহাসড়কের দুরবস্থার ভুক্তভোগী। শ্রীমঙ্গলে নিলাম কেন্দ্র চালু হলেও উৎপাদিত চা নির্ধারিত সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর কিংবা দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পৌঁছানো যাচ্ছে না। উদ্যোক্তাদের দাবি, পরিবহন বিলম্বের কারণে বন্দর ও গুদামে পণ্যের জট তৈরি হচ্ছে, বাড়ছে ব্যয়।
শিল্প খাতের পাশাপাশি সিলেট অঞ্চলের সম্ভাবনাময় পর্যটনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক পর্যটক আগ্রহ থাকলেও দীর্ঘ ও অনিশ্চিত সড়কযাত্রার কারণে সিলেট ভ্রমণ এড়িয়ে যাচ্ছেন।
হবিগঞ্জের দ্য প্যালেস লাক্সারি রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফুর রহমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সড়ক যোগাযোগের সংকটের প্রভাব এখন শুধু মহাসড়কে সীমাবদ্ধ নেই; এর চাপ গিয়ে পড়ছে রেলওয়ে, পর্যটন ও চা শিল্পেও। সড়কের দুরবস্থার কারণে অনেক যাত্রী ট্রেনে ঝুঁকছেন। ফলে ট্রেনের ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন করতে হচ্ছে, কমে যাচ্ছে সেবার মান। আবার করপোরেট গ্রাহকদের বড় অংশ সিলেটের পরিবর্তে গাজীপুর বা নরসিংদীর মতো কাছাকাছি পর্যটন গন্তব্য বেছে নিচ্ছেন। এতে সিলেটের রিসোর্ট ও হোটেলগুলোর আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘মহাসড়কের দুরবস্থার কারণে ভালো মানের পরিবহন কোম্পানিগুলোও নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছে। অন্যদিকে বিমান ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থাও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। একই সংকটে চা শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যে চালান চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে সাতদিন লাগার কথা, তা এখন ১৩-১৪ দিন সময় নিচ্ছে। এতে ব্যাকলগ তৈরি হচ্ছে এবং উদ্যোক্তাদের অতিরিক্ত অর্থনৈতিক ক্ষতি গুনতে হচ্ছে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিলেটের শিল্পোন্নয়ন দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাশার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। ১৯৫০-এর দশকে এ অঞ্চলে গ্যাস ক্ষেত্র, সার কারখানা, সিমেন্ট কারখানা ও বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও স্বাধীনতার পর শিল্পায়নের গতি আশানুরূপ বাড়েনি। এজন্য দুর্বল যোগাযোগ অবকাঠামোকে দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা।
এ প্রসঙ্গে সিলেট অঞ্চলের শিল্পোদ্যোক্তা এবং ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে ঢাকা-সিলেট অঞ্চলে, বিশেষ করে ঢাকা থেকে হবিগঞ্জ পর্যন্ত অসংখ্য কলকারখানা গড়ে উঠলেও পণ্য পরিবহনে উদ্যোক্তাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। যে পথ ৩ ঘণ্টায় পাড়ি দেয়ার কথা, সেখানে ট্রাফিক জ্যাম ও ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে ৫-৬ ঘণ্টাও লেগে যাচ্ছে। সড়ক যোগাযোগের এ দুরবস্থার কারণে সিলেটের পর্যটন খাত যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি শ্রীমঙ্গলে চা নিলাম কেন্দ্র (অকশন সেন্টার) করার পরও চট্টগ্রাম বন্দর বা দেশের অন্য প্রান্তে চা সময়মতো পৌঁছানো যাচ্ছে না। ফলে বাগানগুলোও লোকসানের মুখে পড়ছে।’
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রধান অর্থনৈতিক করিডোর। সিলেট বিভাগের চার জেলা ছাড়াও কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলের পণ্য পরিবহনের বড় অংশ এ মহাসড়কের ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে সম্ভাব্য আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণেও করিডোরটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে। ফলে সড়কটির উন্নয়ন বিলম্বিত হওয়ায় শুধু স্থানীয় ব্যবসাই নয়, বরং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সংযোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ প্রসঙ্গে সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি খন্দকার সিপার আহমদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দীর্ঘদিনের দুরবস্থা সিলেট অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল থাকায় পর্যটন খাত প্রত্যাশিতভাবে বিকশিত হতে পারছে না। একই সঙ্গে রাজধানীতে যাতায়াতে প্রবাসী ও সাধারণ যাত্রীরা দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।’
উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে সিলেটের ব্যবসা, শিল্পায়ন ও পর্যটনে নেতিবাচক প্রভাব পড়লেও ধীরগতিতে চলছে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুমোদিত প্রায় ১৬ হাজার ৯১৯ কোটি টাকার ‘সাসেক ঢাকা-সিলেট করিডোর সড়ক উন্নয়ন’ প্রকল্পের কাজ চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। যদিও প্রকল্প কার্যালয়ের তথ্য বলছে, মহাসড়কটির নির্মাণকাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২১ দশমিক ৫ শতাংশ।
ঢাকা-সিলেট করিডোর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল ঢাকা ও দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মধ্যে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনকে দ্রুত, নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করা। এজন্য মহাসড়কের দুই পাশে সার্ভিস লেন নির্মাণ, স্থানীয় ও ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক চলাচলের ব্যবস্থা, পথচারীবান্ধব অবকাঠামো এবং দুর্ঘটনা কমাতে আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেয়া হয়। পাশাপাশি সাসেক, বিমসটেক ও সার্ক করিডোরের সঙ্গে সংযোগ জোরদারের মাধ্যমে আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়ানোর লক্ষ্যও রয়েছে। তবে বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে এসব প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল এখনো অধরাই রয়ে গেছে।
বিলম্বের কারণ হিসেবে ভূমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তর, নকশা পরিবর্তন এবং দুর্বল মাটির কারণে অতিরিক্ত ভূপ্রযুক্তিগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা। সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২১০ কিলোমিটার সড়কের জন্য সাতটি জেলায় প্রায় ৮২৯ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হচ্ছে। চার থেকে পাঁচ বছর পার হলেও এখনো ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ জমি প্রকল্পের হাতে আসেনি। সরকার ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবর্তন, মামলা, অভিযোগ এবং প্রশাসনিক জটিলতায় ভূমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়েছে। এছাড়া কাঁচামালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সময় কয়েক মাস প্রকল্পের কাজও ধীর হয়ে পড়েছিল। এসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাজ দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যে অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।’
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উদ্যোগে ‘সাসেক ঢাকা-সিলেট করিডোর সড়ক উন্নয়ন’ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সওজ অধিদপ্তর। ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি শুরু হওয়া প্রকল্পটি চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ২১ শতাংশ বলে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষায় উঠে এসেছে।
ঢাকা (কাঁচপুর) থেকে সিলেট পর্যন্ত ২০৯ দশমিক ৩২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এ মহাসড়কটি নির্মাণে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৬ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৩ হাজার ৬৭৩ কোটি ৮৯ লাখ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণ সহায়তা ১৩ হাজার ২৪৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। প্রকল্পটির মাধ্যমে দুই লেনের মহাসড়কটিকে চার লেনে উন্নীত করা হচ্ছে। পাশাপাশি ধীরগতির যানবাহনের জন্য উভয় পাশে নির্মাণ করা হবে ৫ দশমিক ৫ মিটার প্রশস্ত পৃথক সার্ভিস লেন। এছাড়া প্রকল্পের আওতায় ৬৬টি সেতু, ৩০৫টি কালভার্ট, সাতটি ফ্লাইওভার বা ওভারপাস, ছয়টি রেলওয়ে ওভারব্রিজ, ৩৭টি ইউটার্ন, আটটি রাউন্ড অ্যাবাউট এবং ২৬টি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।