ডেঙ্গুতে হারানো স্বজন

অবুঝ সন্তানদের চোখ খুঁজছে বাবাকে

গত ১৭ আগস্ট ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাত্র ৩২ বছর বয়সে মারা যান রুবেল।

দেড় বছরের ছোট্ট শিশু রাহাকে খুব আদর করতেন তার বাবা রফিকুল ইসলাম রুবেল। স্কুল থেকে বাসায় ফিরে সবার আগে মেয়েকে আদর করতেন তিনি। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর থেকে শিশুটি যেন সারাক্ষণ কাকে খুঁজে বেড়ায়। মেয়ের এমন আচরণের কথা বলতে গিয়ে গলা ধরে আসে মা হোসনেয়ারা আক্তার নিপার।

গত ১৭ আগস্ট ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাত্র ৩২ বছর বয়সে মারা যান রুবেল। তিনি মুন্সিগঞ্জের বিনোদপুর রামকুমার উচ্চ বিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন ইংরেজি শিক্ষক ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলায়। তিনি ফাঁসিয়াতলা গ্রামের সেলিম মোল্লার ছেলে।

রুবেলের মতো মুন্সিগঞ্জে ডেঙ্গুতে প্রাণ হারানো আরো অনেকের পরিবারে প্রিয়জন হারানোর দুঃসহ স্মৃতি তাড়া করে ফিরছে স্বজনদের।

সরজমিনে সদর উপজেলার পঞ্চসার ইউনিয়নের বিনোদপুরের ‘বড় বাড়ি’ এলাকায় দেখা যায়, সদ্যপ্রয়াত শিক্ষক রফিকুল ইসলাম রুবেলকে মুঠোফোনে থাকা ছবির মধ্যে খুঁজে বেড়ায় তার দুই অবুঝ সন্তান। বাবাকে হারিয়ে শূন্য হয়ে পড়েছে তাদের পৃথিবী।

রুবেলের স্ত্রী হোসনেয়ারা আক্তার নিপা জানান, রুবেলের মৃত্যুর পর থেকে রাহা ও রাফি যেন সারাক্ষণ এদিক-সেদিক তাকিয়ে বাবাকে খোঁজে। কখনো কখনো মুঠোফোনে বাবার ছবি দেখে কিছু বলতে চায় তারা। হয়তো অবুঝ দুই শিশুর চোখ এখনো খুঁজে ফেরে তাদের হারিয়ে যাওয়া বাবাকে।

সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে স্বামীর ছবি দেখছেন রুবেলের স্ত্রী ছবি : নিজস্ব আলোকচিত্রী

নিপা জানান, তিনি একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ২০১১ সালে পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে হয়। রুবেলের স্বপ্ন ছিল, বড় ছেলে রাফি লেখাপড়া শেষ করে চিকিৎসক হবে। কিন্তু কয়েক দিনের ডেঙ্গুর ভয়াবহতা তাদের সাজানো সংসারের স্বপ্নগুলোকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে।

তিনি বলেন, ‘দুই অবুঝ সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে কাটছে আমাদের দিনগুলো। রুবেল জীবিত থাকাকালে বসতবাড়ি নির্মাণের জন্য ঋণ নিয়েছিলেন। এখন সেই ঋণ পরিশোধ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে পরিবারকে।’

একই বাড়িতে গত আগস্টে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান অবসরপ্রাপ্ত বিডিআর সদস্য মোহাম্মদ শাহজালাল (৫৫)। তার ছেলে শাহাবুদ্দিন বলেন, ‘পরিবারের ১৮ জন সদস্য একসঙ্গে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। এর মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আমার বাবা শাহজালাল। পরিবারের অভিভাবককে হারানোর শূন্যতা আমাদের ভীষণভাবে কাঁদাচ্ছে।’

মানবিক দিক বিবেচনায় জেলায় ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের তালিকা প্রস্তুত করে তাদের পরিবারের খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন ডা. সাজেদা বেগম। তিনি আরো বলেন, ‘‌সম্প্রতি একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি দল জেলায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি—এমন ছয়টি হটস্পট এলাকা থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে। তিনদিন ধরে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে পানির নমুনা, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের রক্তের নমুনাসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব নমুনা গবেষণাগারে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

আরও