আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোয় বাংলাদেশের দক্ষ ও পারদর্শী ‘নেগেশিয়েটর’ বা প্রতিনিধি প্রয়োজন বলে দাবি করেছেন ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান ও অনন্ত গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরীফ জহীর। তিনি বলেন, সামনে কপ-৩১ সম্মেলন। এ ধরনের আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোয় আমাদের শক্ত দরকষাকষি করা উচিত। সেখানে দরকষাকষিতে দক্ষ ও পারদর্শী প্রতিনিধি প্রয়োজন, যেন ধনী ও উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে আমরা আমাদের প্রাপ্য ক্ষতিপূরণের অংশটুকু আদায় করতে পারি।
তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলো প্রতি বছর প্রায় ৮-৯ বিলিয়ন ডলার হিসেবে ২০৫০ সালের মধ্যে মোট ২৩০ বিলিয়ন ডলার প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ হয়তো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, অথচ বৈশ্বিক দূষণ বা কার্বন নিঃসরণে আমাদের অবদান অত্যন্ত নগণ্য। তাই আন্তর্জাতিক প্লাটফর্মে আমাদের শক্ত অবস্থান নিতে হবে।
রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে বণিক বার্তা আয়োজিত ‘গ্রিন ডায়ালগ: জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস’ শীর্ষক আয়োজনের প্যানেল আলোচনায় আজ তিনি এসব কথা বলেন।
শরীফ জহীর বলেন, আমরা তরুণ জনগোষ্ঠীর একটি দেশ। এ ‘জনমিতিক লভ্যাংশ’ যদি আমরা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে না পারি, তবে তা দেশের জন্য এক বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। তাই আমরা যখন নীতি নির্ধারণ করি, পরিবেশবান্ধব চিন্তা করি বা টেকসই উন্নয়নের কথা বলি—তখন আমাদের এমন একটি ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে যেন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি জলবায়ু ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়েও আমরা সচেতন থাকি।
তিনি বলেন, কারখানাগুলোয় সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার একটি বড় আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। গত ১০ বছরে সোলার প্যানেলের দাম ৭০ শতাংশের বেশি কমেছে। হিসাব করে দেখেছি, আমার কারখানার ছাদের সোলার প্যানেল থেকে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ পড়ে ৬ সেন্টেরও কম, যা জাতীয় গ্রিডের খরচের প্রায় অর্ধেক। এটি ব্যবসার দিক থেকেও অত্যন্ত লাভজনক একটি মডেল। জাতীয় বাজেটে আমরা কর ছাড়ের যে উদ্যোগ দেখেছি, সরকারের পক্ষ থেকে তেমন সহায়তা আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংক ও সবুজ রূপান্তর তহবিলের (জিটিএফ) মতো উৎস থেকে দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়ন পেলে সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ অত্যন্ত সহজ ও ফলপ্রসূ হয়ে উঠবে।
আবাসন তৈরিতে পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনার আহ্বান জানিয়ে শরীফ জহীর বলেন, আমরা সাধারণত একটি ৫ বা ১০ কাঠার প্লটকে সোজা কংক্রিটের জঙ্গলে রূপান্তর করতে দেখি। এমনকি গুলশান বা বারিধারার মতো এলাকাগুলোয়ও বর্জ্য শোধনাগার ছাড়াই ভবন তৈরি করা হয়েছে এবং সুয়ারেজ বর্জ্য সরাসরি বারিধারা লেকে গিয়ে পড়ছে। সিটি করপোরেশন থেকেও আমরা এখনো এমন কোনো পদক্ষেপ দেখিনি যা ড্রেনে ইটিপি বসিয়ে এ দূষিত পানি পড়া বন্ধ করবে। আমরা বিলিয়ন ডলারের মেগা প্রজেক্ট বানাচ্ছি, অথচ জীবনের মৌলিক প্রয়োজনগুলো ঠিক করতে পারছি না। আমাদের বাতাসের একিউআই মান যখন ৪০০ ছাড়িয়ে যায়, আমরা কি আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হই? আমরা যারা এই দেশে বিনিয়োগ করছি, আমাদের এই দেশেই থাকতে হবে। আমরা যদি এমন একটি দেশ বা ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে না পারি, যেখানে আমাদের সন্তানরা সগৌরবে বাস করতে পারবে, তবে আমরা দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেব।
‘গ্রিন ডায়ালগ: জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস’ আয়োজনটি সঞ্চালনা করছেন বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। অনুষ্ঠানে দেশের জলবায়ু, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক, উদ্যোক্তা ও দেশী-বিদেশী বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন।