সিরাজগঞ্জের চৌবাড়ী ২০ শয্যা হাসপাতাল

তিন বছর আগে ভবন নির্মাণ হলেও জনবল সংকটে চালু হয়নি স্বাস্থ্যসেবা

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার চৌবাড়ীতে নির্মাণ করা হয়েছে ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার চৌবাড়ীতে নির্মাণ করা হয়েছে ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল। মূলত কামারখন্দ, বেলকুচি উপজেলার পশ্চিম ও উল্লাপাড়ার পূর্বাংশের কয়েক হাজার মানুষের জন্যই হাসপাতালটি স্থাপন করা হয়েছে। ২০১৮ সালের নভেম্বরে অবকাঠামো নির্মাণ শুরু হলেও ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে জনবল সংকটে এখনো চালু করা যায়নি ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হাসপাতালটি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাসপাতালে আসবাব দেয়া হয়নি। জনবলও নিয়োগ হয়নি। শুধু অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে যেসব সরঞ্জাম ছিল তাও চুরি হয়ে গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সরকারি অর্থে হাসপাতালটি নির্মাণ হলেও মানুষের কোনো কাজে আসছে না। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ থেকেও হাসপাতালটি চালুর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ২০ শয্যা হাসপাতাল নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ১৬ কোটি ১৯ লাখ। ২০১৮ সালের নভেম্বরে শুরু হয় নির্মাণকাজ। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে নির্মাণকাজ শেষে স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয় ভবনটি।

এ ব্যাপারে কামারখন্দ উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আব্দুল মোমিন উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যেখানে কামারখন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই জনবল সংকট রয়েছে, সেখানে ওই হাসপাতাল চালু করব কীভাবে। ভবনটি খালি পড়ে রয়েছে। সেখানে কেউ থাকে না। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনবল সংকট থাকায় সেখানে নৈশপ্রহরী দেয়া সম্ভব হয়নি। এ কারণে প্রায় ৫০ লাখ টাকার জিনিসপত্র চুরি হয়ে গেছে। পুলিশকে একাধিকবার মৌখিক অভিযোগ দেয়ার পর লিখিতভাবে অভিযোগ করেছি। পরে সেটি মামলা হিসেবে নেয়া হয়। কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি।’

কামারখন্দ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. বাবুল আক্তার বলেন, ‘হাসপাতালে অনেক জিনিসপত্র চুরি হয়ে গেছে—এমন অভিযোগ পাওয়ার পর পরিদর্শন করেছি। জনবল না থাকায় বিভিন্ন সময় চুরির ঘটনা ঘটেছে। তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

সরজমিনে দেখা গেছে, চৌবাড়ী বাজার পেরিয়ে আঞ্চলিক সড়কের পাশে অবস্থিত দোতলা সাদা ভবনটির ফটকে ঝুলছে পুরনো তালা। হাসপাতাল চত্বরটি এখন মাদকসেবীদের আড্ডায় পরিণত হয়েছে। চত্বরজুড়ে জন্মেছে আগাছা, করিডোরগুলোতে রয়েছে মাকড়সার জাল। জানালার কাচ ভাঙা ও ধুলাবালিতে ঢাকা রয়েছে কক্ষগুলো। যেখানে থাকার কথা রোগীর শয্যা, সেখানে এখন ফাঁকা কক্ষ ও জঙ্গলে ভরা। ৫৫টি সিলিং ফ্যান, ৯০টি লাইট, প্রতিটি ইউনিটের সার্কিট ব্রেকার, ওয়াশ রুমের স্যানিটারি ফিটিংস, একটি এসির আউটডোর ইউনিট, পাওয়ার স্টেশনের ট্রান্সফরমার, জেনারেটরের কয়েল, ব্যাটারি, তামার তারসহ ৪০-৫০ লাখ টাকার মূল্যবান যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জাম চুরি হয়ে গেছে।

আদৌ হাসপাতালটি চালু হবে কিনা তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা বলছেন, স্বাস্থ্য বিভাগ হাসপাতালটির দায় নিতে চাচ্ছে না। এ কারণে কামারখন্দ, বেলকুচি উপজেলার পশ্চিম ও উল্লাপাড়া উপজেলার পূর্বাংশের কয়েক হাজার মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

চৌবাড়ী বাজার এলাকার মো. রাজ জানান, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে হাসপাতালটি কেন নির্মাণ করা হলো সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। হাসপাতালটি জনগণের কোনো কাজেই আসছে না।

চৌবাড়ী ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তোজ্জামেল হক বলেন, ‘হাসপাতালটি চালু হলে শিক্ষার্থীরা চিকিৎসাসেবা পেত। কিন্তু এখন সবাই সেবাবঞ্চিত হচ্ছে। আসল কথা হলো কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কেন এ হাসপাতাল নির্মাণ করা হলো তা আমাদের বোধগম্য নয়।’

উপজেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর মো. আবু সাঈদ বলেন, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। জনবল নেই, পাহারাদার নেই। এ কারণে যন্ত্রাংশ চুরি হচ্ছে।

সার্বিক বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. নুরুল আমীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি যোগদানের আগে থেকেই ওই হাসপাতাল এ অবস্থায় রয়েছে। এখন আমার করার কিছু নেই। এমনিতেই কামারখন্দ ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে জনবল সংকট রয়েছে। অথচ চৌবাড়ীতে ২০ শয্যা হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু জনবল দেয়া সম্ভব হয়নি। চৌবাড়ী হাসপাতাল চালু করার মতো জনবল আমাদের নেই। নতুন করে নিয়োগ দিয়ে হাসপাতালটি চালু করতে হবে। হাসপাতালের যন্ত্রাংশ চুরির ঘটনায় মামলা হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।’

আরও