স্থানীয় সরকার বিভাগ (এলজিআরডি) থেকে সব সিটি করপোরশনের জন্য বরাদ্দের ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন। এ বৈষম্য শিকার হওয়ায় চট্টগ্রাম সিটির দোষ কি প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
বৈষম্যের কথা তুল ধরতে গিয়ে শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রামের প্রতি কিভাবে বৈষম্য করা হচ্ছে, তার একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরতে চাই। দুদিন আগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে আমাকে একটি তথ্য পাঠানো হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, সোলার এনার্জি খাতে দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পেয়েছে ১০ কোটি টাকা, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন পেয়েছে ১০ কোটি টাকা এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন পেয়েছে পাঁচ কোটি টাকা। এছাড়া সম্প্রতি ঢাকার দুটি সিটি করপোরেশনকে দেড় হাজার কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তাহলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের দোষ কী? এসব কথা বলার অর্থ হলো, কীভাবে চট্টগ্রামকে অবহেলিত করা হচ্ছে, সেটি তুলে ধরা। কিন্তু এসব বিষয় আমরা কোনো ফোরামে বলি না, বলতে চাই না। এখন এসব কথা বলতে হবে। চেম্বার অব কমার্সে এসব কথা বলা আমাদের জন্য একটি ভালো উপায়।
শুক্রবার দুপুরে চট্টগ্রামের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত 'চট্টগ্রাম: ইকোনোমিক গেটওয়ে অ্যান্ড লাইফলাইন অব বাংলাদেশ' শীর্ষক সেমিনারে এ অভিযোগ করেন প্রশাসক। সেমিনারটির আয়োজন করেন কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ চ্যাপ্টার।
সেমিনারে চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে সিটি প্রশাসক বলেন, আমরা যদি বাংলাদেশকে মানবদেহের মস্তিষ্ক হিসেবে বিবেচনা করি, তাহলে চট্টগ্রামকে বলতে হবে মানবদেহের হৃৎপিণ্ড। বৃহত্তর চট্টগ্রামকে যদি চট্টগ্রাম নগরীর চারপাশের ধমনি ও শিরা হিসেবে বিবেচনা করি, তাহলে সেগুলোর স্বাভাবিক রক্তপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ চট্টগ্রামের অবকাঠামোর সংযোগ ও কাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজ টানেল তৈরি হয়েছে, কিন্তু টানেলের অন্য প্রান্তে গিয়ে যদি কোনো কাজ করতে না পারেন, তাহলে সেই অবকাঠামো দিয়ে কী হবে? সেখানে বিদ্যুৎ নেই, পানি নেই, গ্যাস নেই। তাই অবকাঠামো নির্মাণের আগেই পরিকল্পনা করতে হবে, কীভাবে সেটিকে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত করা যায়। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সিটি গভর্নমেন্টের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, মেয়র হিসেবে আমার শপথ নেয়ার দুই বছর পূর্ণ হয়েছে। মেয়র হিসেবে প্রায় এক বছর ১১ মাস ২০ দিন এবং প্রশাসক হিসেবে ১০ দিন দায়িত্ব পালন করেছি। দায়িত্ব নেয়ার প্রথম দিন থেকেই আমি একটি কথা বলার চেষ্টা করেছি। সেটি হলো, সিটি গভর্নমেন্ট বা নগর সরকার প্রয়োজন। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, নগর সরকার ছাড়া পরিকল্পিত শহর গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
পরিকল্পিত শহর গড়তে চাইলে নগর সরকার প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, নগর সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে না পারলে নগরের সার্বিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। আমরা মেয়রকে সিটি ফাদার বলি। কিন্তু বন্দরে কী হচ্ছে, তা আমি জানি না। আজকে পদে পদে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। অনেক সময় মানুষ মনে করে, মেয়র কি করছেন? কিন্তু ময়লা-আবর্জনার বিষয়টি আমার দায়িত্বে নেই। এটি জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব। বিষয়টি দুর্ভাগ্যজনক। খেলাধুলার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। নগরের মধ্যে একটি বিশাল মাঠ রয়েছে, সেখানে খেলা হচ্ছে না। এটি সিটি করপোরেশনের মাঠ। কিন্তু সেটিও জেলা প্রশাসকের অধীনে। আগ্রাবাদ এলাকায় এত সমস্যা কেন, সেখানে এত ধরনের কাজ কেন চলছে, সেটিও অনেকে জানতে চান। কিন্তু এসব কাজ চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) করছে। অর্থাৎ নগরের বিভিন্ন সেবা ও অবকাঠামোর দায়িত্ব বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাতে রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, এখানে শুধু আমরা বসে সমন্বয় করলেই হবে না। জলাবদ্ধতা দূর করা কিংবা শহরকে পরিচ্ছন্ন, সবুজ, স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ করতে হলে রাষ্ট্রীয়ভাবে সমন্বয়ের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য সিটি গভর্নমেন্ট বা নগর সরকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমার ইচ্ছা করে শহরের বিভিন্ন এলাকাকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে দিতে। সেখানে পর্যটনের আবহ তৈরি করতে। কিন্তু তা পারি না। কারণ, কোনো জায়গায় গেলে বলা হয়, এটি রেলের জায়গা, এটি বন্দরের জায়গা, এটি অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের জায়গা। তাহলে আমার ক্ষমতা কোথায়।
তিনি বলেন, 'সিটি গভর্নমেন্ট ছাড়া আপনি আমাকে সিঙ্গাপুর বানাতে বলছেন, টরন্টোর মতো একটি শহর গড়ে তুলতে বলছেন। কিন্তু সেই ক্ষমতা আমাকে দিচ্ছেন না। তাহলে কিভাবে কাজ করব।
সেমিনারে উপস্থাপন করেন আন্তজার্তিক সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) ঢাকার নতুন ব্যুরোপ্রধান সাংবাদিক জুলহাস আলম। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম চেম্বার অব কর্মাস অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক। চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করেন আমির হুমায়ূন মাহমুদ চৌধুরী, চট্টগ্রামের সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য হলেন অধ্যাপক শরীফ আশরাফউজ্জামান, চট্টগ্রাম বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ ওবায়দুল করিম, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন, দৈনিক আজাদী পত্রিকার সম্পাদক এম এ মালেক, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসানসহ অর্থনীতিবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ, ব্যবসায়ী ও অন্যান্যরা।