দেশে এলপিজি আমদানির ১৭ শতাংশই যাচ্ছে শিল্পে

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আমদানি তথ্যেও সাম্প্রতিক সময়ে এলপিজি আমদানিতে বড় ধরনের ঘাটতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাইয়ে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার ৯৭৫ টন। আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টনে।

দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে উৎপাদন সচল রাখতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ব্যবহার বাড়াচ্ছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। প্রতি মাসে আমদানি হওয়া গড় দেড় লাখ টন এলপিজির ১৭ শতাংশই এখন শিল্প খাতে ব্যবহার হচ্ছে। এক বছর আগেও যা ছিল ১০ শতাংশের মতো। সংশ্লিষ্ট অপারেটরদের দাবি, কোনো কোনো মাসে শিল্পে এলপিজির ব্যবহার ৩৫-৪০ হাজার টনে পৌঁছেছে। জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা ও বিকল্প জ্বালানি ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে তা আরো বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি মাসে গড়ে দেড় লাখ টন এলপিজি সরবরাহ হয়। এর ১৭ শতাংশ হিসাবে শিল্প খাতে মাসিক ব্যবহার দাঁড়ায় প্রায় ২৫ হাজার ৫০০ টন। তবে কয়েকজন অপারেটরের দাবি, সাম্প্রতিক মাসগুলোয় শিল্পে এলপিজির প্রকৃত ব্যবহার এ হিসাবের চেয়েও বেশি। প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ ও চাপ কমে যাওয়ায় এবং ডিজেলসহ অন্যান্য জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় কারখানাগুলো বিকল্প হিসেবে এলপিজির দিকে ঝুঁকছে।

এলপিজির শিল্প গ্রাহকের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বা খাতভিত্তিক ব্যবহার নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে। তবে অপারেটরদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংস্থাটি বলছে, গত সেপ্টেম্বরে দেশে মোট এলপিজি সরবরাহের ১৭ শতাংশ শিল্প খাতে ব্যবহৃত হয়েছে। আর এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) শীর্ষ নেতাদের তথ্য অনুযায়ী, শিল্প খাতে এলপিজির গ্রাহক প্রায় ৪০০। এ সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।

শিল্পে এলপিজির ব্যবহার বৃদ্ধির এ প্রবণতার মধ্যে গত মাসের শেষ সপ্তাহে দেশের বাজারে সিলিন্ডার সংকট তীব্র হয়ে ওঠে। এর আগে এলএনজি আমদানি ও সরবরাহে বিঘ্ন এবং টার্মিনালের ত্রুটির কারণে অন্তত দুই সপ্তাহ ধরে প্রাকৃতিক গ্যাসের তীব্র সংকট চলছিল। এ পরিস্থিতিতে এলপিজির সরবরাহ ও মজুদ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তবে অপারেটর, জ্বালানি বিভাগ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে ব্যবসায়ীরা দাবি করেন, দেশে এলপিজি আমদানিতে ঘাটতি হয়নি। পর্যাপ্ত আমদানি সত্ত্বেও পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কোনো কোনো পর্যায়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়ে থাকতে পারে বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আমদানি তথ্যেও সাম্প্রতিক সময়ে এলপিজি আমদানিতে বড় ধরনের ঘাটতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাইয়ে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার ৯৭৫ টন। আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টনে। সেপ্টেম্বরে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ১২৯ টন। অর্থাৎ আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—দুই মাসেই আমদানি দেড় লাখ টনের বেশি ছিল।

অপারেটরদের দাবি, আমদানিতে ঘাটতি না থাকলেও শিল্প খাতে এলপিজির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। শিল্পের উৎপাদন সচল রাখতে বড় গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করতে হচ্ছে। এতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য সরবরাহের পরিমাণ সমন্বয় করার প্রয়োজনও পড়েছে।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে শীর্ষ এক এলপিজি কোম্পানির কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিল্প খাতে আমাদের গ্রাহক সংখ্যা ৩০-এর বেশি। এসব গ্রাহকের মাসিক এলপিজির চাহিদা প্রায় দেড় হাজার টন। গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে তাদের ব্যবহার এতটাই বেড়েছিল যে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ দেয়া সম্ভব হয়নি। এ কারণে শিল্পের কয়েকজন গ্রাহকের সরবরাহ কিছুটা কমিয়ে আবাসিক গ্রাহকদের সরবরাহ বাড়াতে হয়েছে।’

শিল্পে এলপিজির ব্যবহার বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন সচল রাখতে উদ্যোক্তারা এলপিজি ব্যবহার বাড়াচ্ছেন। তুলনামূলক সাশ্রয়ী হওয়ায় অনেকের কাছে এটি বিকল্প জ্বালানি হিসেবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।’

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিও শিল্পে এলপিজির চাহিদা বাড়ার অন্যতম কারণ। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে গত ২১ সেপ্টেম্বর দেশে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ায় সরকার। চলতি বছরে তিন দফা মূল্য সমন্বয়ের পর ডিজেলের দাম লিটারে ৩৫ টাকা, কেরোসিনে ৪৩ টাকা, পেট্রলে ৪৪ টাকা ও অকটেনে ৪৫ টাকা বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট হিসাব থেকে জানা গেছে। অন্যদিকে কারখানায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলের দামও সম্প্রতি প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে।

গ্যাসের সরবরাহ ও চাপ কম থাকায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বিকল্প জ্বালানিতে উৎপাদন চালাতে হচ্ছে। এতদিন কোনো কোনো উদ্যোক্তা ডিজেলচালিত জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুতের ঘাটতি সামাল দিলেও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে সেই ব্যবস্থার ব্যয় বেড়েছে। একই সঙ্গে ফার্নেস অয়েলচালিত যন্ত্রে উৎপাদনও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে উদ্যোক্তারা এলপিজির ব্যবহার বাড়াচ্ছেন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বিইআরসির সাবেক সদস্য মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাসের সংকট সামনে আরো প্রকট হলে এলপিজির ব্যবহার বাড়বে। কারখানা চালাতে হলে উদ্যোক্তাদের ব্যয় সাশ্রয়ের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। এতদিন ডিজেলসহ অন্যান্য জ্বালানিকে প্রাধান্য দিলেও সেগুলোর ব্যয়ও এখন বাড়ছে। এ কারণে এলপিজির ব্যবহার শিল্প খাতে ব্যাপকভাবে বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’

দেশের শীর্ষ এলপিজি অপারেটর ওমেরা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের দাবি, শিল্প খাতে তাদের বিক্রি আগের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। জ্বালানি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, দেশের এলপিজি বাজারের প্রায় ১৯ শতাংশ এ প্রতিষ্ঠানের দখলে।

ওমেরা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তানজীম চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিল্প খাতে এলপিজির ব্যবহার আগের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। জ্বালানির প্রাপ্যতা ও ব্যয় সাশ্রয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শিল্পোদ্যোক্তারা এলপিজির ব্যবহার বাড়াচ্ছেন। ওমেরার ক্ষেত্রেও গত কয়েক মাসে শিল্প খাতে বিক্রি দ্বিগুণ হয়েছে।’

আরেক অপারেটর মেঘনা ফ্রেশ এলপিজিও শিল্পে ব্যবহার বৃদ্ধির কথা জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির চিফ মার্কেটিং অফিসার (সিএমও) আবু সাঈদ রাজা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিল্প খাতে এলপিজির ব্যবহার অব্যাহতভাবে বাড়ছে। প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট ও সরবরাহের চাপজনিত সমস্যার কারণে উদ্যোক্তারা এলপিজির প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন। শিল্প খাতকে আরো সহায়তা করতে অপারেটররাও সরবরাহের বিষয়ে সহযোগিতা করে যাচ্ছে।’

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের আগের হিসাব অনুযায়ী, দেশে আমদানি ও সরবরাহ করা এলপিজির প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যবহৃত হতো আবাসিক বা গৃহস্থালি খাতে। শিল্পে ব্যবহার হতো ১২ শতাংশ এবং অটোগ্যাসে ৫ শতাংশ। বাকি ৩ শতাংশ ব্যবহৃত হতো অন্যান্য খাতে। তবে অপারেটরদের সাম্প্রতিক হিসাব বলছে, শিল্প খাতে এলপিজির হিস্যা এখন ১৭ শতাংশে পৌঁছেছে। যদিও খাতভিত্তিক ব্যবহার নিয়ে সরকারি সংস্থাগুলোর হিসাবের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।

বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিল্প খাতে এলপিজির ব্যবহার আগের তুলনায় বেড়েছে, অপারেটরদের দেয়া হিসাব থেকে তা দেখা যাচ্ছে। আগে এ খাতে ব্যবহার ১০-১২ শতাংশের মধ্যে ছিল। গত সেপ্টেম্বরের হিসাবে তা গড়ে ১৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কোনো কোনো কোম্পানির ক্ষেত্রে এ হার ২০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।’

তবে শিল্প খাতে এলপিজির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সাম্প্রতিক সিলিন্ডার সংকটের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন ধারণার সঙ্গে একমত নন অপারেটরদের সংগঠন লোয়াবের নেতারা। তাদের মতে, শিল্পে এলপিজির চাহিদা একদিনে বা হঠাৎ করে বাড়েনি; বরং কয়েক বছর ধরে তা ক্রমাগত বাড়ছে। সাম্প্রতিক সংকটের কারণ অনুসন্ধানে তাই আমদানি ও সরবরাহের পাশাপাশি পরিবেশক পর্যায়ে বণ্টন এবং বাজার ব্যবস্থাপনাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

লোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে শিল্প খাতে এলপিজির চাহিদা আকস্মিকভাবে বেড়েছে, বিষয়টি এমন নয়। জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন সচল রাখতে উদ্যোক্তারা অনেক আগে থেকেই এলপিজির ব্যবহার বাড়াচ্ছেন। এ প্রবণতা ক্রমাগত বাড়ছে। তবে শিল্পে ব্যবহার বাড়ার কারণে সাম্প্রতিক সিলিন্ডার সংকট তৈরি হয়েছে, বিষয়টি এমন নয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘দেশে মোট এলপিজি সরবরাহের প্রায় ১৭ শতাংশ শিল্প খাতে ব্যবহার হচ্ছে। এ খাতে গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৪০০। এ সংখ্যাও ক্রমাগত বাড়ছে।’

আরও