মির্জা ইলিয়াছ উদ্দিন আহমেদ। দায়িত্ব পালন করছেন যমুনা ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও পদে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ব্যাংকটির বিভিন্ন পদে কাজ করে আসছেন তিনি। বেসরকারি এ ব্যাংকের দুই যুগের পথচলা, সমস্যা, সম্ভাবনাসহ দেশের ব্যাংক খাতের নানা দিক নিয়ে সম্প্রতি তিনি কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে
প্রতিষ্ঠার দুই যুগ পূর্ণ করেছে যমুনা ব্যাংক। দীর্ঘ এ সময়ে ব্যাংকটির প্রধান অর্জন কী?
যমুনা ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ২০২১ সালের ৩ জুন। সে হিসাবে ব্যাংকটি দুই যুগ পূর্ণ করেছে। দেশের মানুষের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য, আধুনিক ও কার্যকর ব্যাংকিং প্লাটফর্ম গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে এ ব্যাংকের যাত্রা। আমরা আনন্দের সঙ্গে জানাতে পারি, দীর্ঘ এ পথযাত্রায় আমরা শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হইনি, বরং আমাদের গ্রাহকদের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছি। আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন গ্রাহকদের আস্থা। দেশের প্রতিটি অঞ্চলে, শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামেও আমরা পৌঁছতে পেরেছি। বর্তমানে আমাদের রয়েছে ১৬৯টি শাখা, ১১৪টি উপশাখা, ৫৭টি এজেন্ট ব্যাংকিং কেন্দ্র এবং ৩৬১টি এটিএম ও সিআরএম বুথ। ব্যাংকটি এখন দেশের অন্যতম মুনাফা অর্জনকারী ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ২০২৫ সালের মার্চ প্রান্তিকে আমাদের ইপিএস ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, আর ২০২৪ সালের জন্য আমরা ২৪ শতাংশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছি। এটা আমাদের ব্যবসায়িক সফলতার প্রমাণ এবং গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা।
দেশের ব্যাংক খাতে নানা সংকট চলছে। এ সংকটের সময়ে যমুনা ব্যাংক কেমন আছে?
বর্তমান বৈশ্বিক ও স্থানীয় আর্থিক পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং হলেও যমুনা ব্যাংক স্থিরতা বজায় রেখেছে। আমরা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিই। ব্যাংকের প্রতিটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নিই হিসাব-নিকাশ করে। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের বিনিয়োগ বেড়েছে ৫৬ শতাংশ। পরিচালন মুনাফা বেড়েছে ১৭ শতংশ। আর আমানত বেড়েছে ২৩ শতাংশ এবং গ্রাহক ও আমানতকারীর সংখ্যা ১৩ শতাংশ বেড়েছে। এ পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, যমুনা ব্যাংকের ওপর দেশের মানুষ আরো বেশি আস্থা রাখছে। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত আমাদের কাছে জমা ছিল গ্রাহকদের ৩২ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকার আমানত। একই সময়ে আমরা ১৭ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছি। আর সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ডে আমাদের বিনিয়োগ ছিল ১৪ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। আমরা সবসময় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায় বিশ্বাস করি। তাই প্রতিকূল এ সময়েও যমুনা ব্যাংক স্থিতিশীল ও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
যমুনা ব্যাংকের শক্তির জায়গা কোনটি?
আমাদের শক্তি হচ্ছে গ্রাহককেন্দ্রিক সেবা, দক্ষ কর্মী বাহিনী ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন। আমরা প্রত্যেক গ্রাহকের প্রয়োজন বুঝে তাদের উপযোগী সেবা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের সার্ভিস নেটওয়ার্ক দেশের প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছেছে। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে আমরা অনেক দূর এগিয়ে গেছি। এখন অনেক গ্রাহক কাগজবিহীন লেনদেন, মোবাইল অ্যাপ, ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহার করে ঘরে বসেই আমাদের সব সেবা পাচ্ছেন। এ প্রতিটি পদক্ষেপই আমাদের শক্তি। কারণ আমরা শুধু একটি ব্যাংক নই, আমরা একটি নির্ভরযোগ্য আর্থিক অংশীদার।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এ মুহূর্তে ব্যাংকের কোন দিকগুলোর অগ্রগতিকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন?
বর্তমানে আমরা কয়েকটি খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি, বিশেষ করে এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প), কৃষি ও রফতানি খাত। এসব খাত দেশের অর্থনীতির ভিত্তি ও কর্মসংস্থানের অন্যতম উৎস। শুধু রফতানি খাতেই আমরা ৩১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি। শুধু বড় শিল্পেই নয়, ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলোকেও আমরা সমান গুরুত্ব দিচ্ছি। এছাড়া পরিবেশবান্ধব প্রকল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সামাজিক প্রভাবময় বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও আমরা ধারাবাহিকভাবে অর্থায়ন করছি। ভবিষ্যতে এ ধারা আরো বিস্তৃত হবে।
খেলাপি ঋণের উচ্চহার দেশের ব্যাংক খাতের বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রে যমুনা ব্যাংকের অবস্থান কী?
আমরা বরাবরই খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যাপারে সচেতন। ঋণ দেয়ার আগে আমাদের বিশ্লেষণ প্রক্রিয়া খুবই কঠোর ও বাস্তবভিত্তিক। আমরা নিয়মিতভাবে প্রতিটি ঋণ পর্যবেক্ষণ করি, প্রয়োজনে দ্রুত পদক্ষেপ নিই। ফলে আমাদের খেলাপি ঋণের হার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গ্রাহকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, পুনঃতফসিল ও আইনগত কাঠামোর মধ্য দিয়ে আমরা একটি ঝুঁকিহীন এবং সুস্থ ঋণ পরিবেশ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছি।
যমুনা ব্যাংক ঘিরে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাই।
আমার লক্ষ্য একটাই—যমুনা ব্যাংককে একটি আধুনিক, টেকসই ও সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। আমরা চাই আমাদের গ্রাহক যেন ঘরে বসেই ব্যাংকের সব সেবা পান। এজন্য আমরা প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছি, নতুন অ্যাপস, ই-সার্ভিস ও স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম চালু করছি। আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় রয়েছে সব শ্রেণীর মানুষকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আনা, নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়ানো। শুধু ব্যবসায়িক সাফল্য নয়, আমরা চাই সামাজিক প্রভাব তৈরির মাধ্যমে যমুনা ব্যাংক হোক মানুষের ‘বিশ্বাসের জায়গা’।
যমুনা ব্যাংকের আমানতকারীসহ গ্রাহকদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?
গ্রাহক ও অংশীজনরা যমুনা ব্যাংকের গত দুই যুগের পথচলায় আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে পাশে ছিলেন। গ্রাহকদের সেই আস্থা ও বিশ্বাসই আমাদের আজকের অবস্থানে পৌঁছতে সাহায্য করেছে। গ্রাহকের আমানত, আস্থা ও সহযোগিতা—তিনটি শক্তিই যমুনা ব্যাংকের ভিত। দেশের প্রত্যেক গ্রাহক, শেয়ারহোল্ডার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে আমি কৃতজ্ঞতা জানাই। আমি আশা রাখি, আগামী দিনের পথচলায়ও তারা আমাদের পাশে থাকবেন। আমরা একসঙ্গে ছিলাম, আছি ও থাকব। যমুনা ব্যাংক ভবিষ্যতের পথে আপনার বিশ্বস্ত সঙ্গী হতে চায়।