বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আরো কমিয়েছে আইএমএফ

কোনো সংস্থার পূর্বাভাসকে বিতর্কিত করতে চায় না সরকার: অর্থমন্ত্রী

বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা চাওয়ার বিষয়ে প্রকাশিত খবর প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এ নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং এর ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।’

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভার দ্বিতীয় দিনে গতকাল প্রকাশিত হয়েছে আইএমএফের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক (ডব্লিউইও)। প্রতিবেদনে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশ করা হয়েছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। আইএমএফের এ পূর্বাভাসের বিষয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সরকার কোনো সংস্থার পূর্বাভাসকে বিতর্কিত করতে চায় না। গতকাল থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।

পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানির উচ্চ মূল্য ও বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনার চাপে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমছে। এরই মধ্যে জ্বালানি আমদানিনির্ভর বাংলাদেশও বাড়তি ঝুঁকিতে পড়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পূর্বাভাস কমানোর কয়েক দিনের মাথায় আইএমএফের নতুন পূর্বাভাস এল।

মূল্যস্ফীতি ও জিডিপি নিয়ে বিশ্বব্যাংক ও এডিবির পূর্বাভাস এবং সরকারের অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘সংস্থাগুলো নিজস্ব হিসাব ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে পূর্বাভাস দিয়েছে। সময়ের সঙ্গে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক পর্যালোচনা করে প্রকৃত পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা যাবে। তিনি বলেন, ‘তারা তাদের হিসাব অনুযায়ী পূর্বাভাস দিয়েছে, আমরা আমাদের কাজ করে যাচ্ছি। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে—এটাই মূল কথা।’

বাজেটে নির্ধারিত মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বাজেটে যেসব প্রক্ষেপণ দেয়া হয়েছে, সরকার সেগুলো পূরণ করতে পারবে বলে আশা করছে।’ বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে চলমান আলোচনা ও সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং সরকারের ঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যও অর্জন করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।

বিশ্বব্যাংকের এমডির সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় দেশের অর্থনীতি সংকটের মধ্যে ছিল। আগের সময়ের বিভিন্ন দায়ও সরকারকে বহন করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাত। এসব বাস্তবতা বিশ্বব্যাংক অনুধাবন করছে এবং বাংলাদেশের পাশে থাকতে আগ্রহী। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পর আগামী দিনের জন্য সরকার যে নীতি, কর্মসূচি ও অর্থনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করেছে, তার সঙ্গে বিশ্বব্যাংক একমত। এ নিয়ে দুই পক্ষ একসঙ্গে কাজ করবে এবং প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে।’ বাংলাদেশকে পূর্ণাঙ্গ সমর্থন দিতে বিশ্বব্যাংক প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানান তিনি।

বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা চাওয়ার বিষয়ে প্রকাশিত খবর প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এ নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং এর ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, এখানে কোনো সিদ্ধান্ত হচ্ছে না। এ নিয়ে অনেক ভুল প্রতিবেদন দেখছি। এটি কেবল আলোচনা। এর ভিত্তিতে পরবর্তী ফলোআপ হবে।’ বর্তমান আলোচনাকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘ভবিষ্যতে দুই পক্ষের কাজ ও সিদ্ধান্তের ভিত্তি তৈরি হচ্ছে এ আলোচনার মাধ্যমে। ঢাকাতেও আলোচনা অব্যাহত থাকবে।’

তবে আলোচনার অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নির্ধারণের জন্য যে ভিত্তি তৈরি করা দরকার, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে পৌঁছেছে। সরকারের অর্থনৈতিক নীতি, কর্মসূচি ও মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা রয়েছে। বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতাহার এবং সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের অবস্থানের সামঞ্জস্য রয়েছে। কীভাবে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা হবে এবং নির্ধারিত লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়ন করা হবে, তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে।

বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অংশীদারত্বের কাঠামো নিয়েও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব লিখিতভাবে জমা দেয়া হয়েছে বলে জানান আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক কী হবে, তা লিখিতভাবে জমা দিয়েছি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ কাঠামো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আলোচনার মাধ্যমে এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।’ বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সুপারিশ ও পরামর্শ দেয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশও নিজস্ব সুপারিশ দিয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। এসব প্রস্তাবের ভিত্তিতেই আলোচনা চলছে।

এদিকে একই দিন বার্ষিক সভার পাশাপাশি ব্যাংককে আইএমএফ ও আঞ্চলিক আর্থিক ব্যবস্থাগুলোর (আরএফএ) ১১তম বার্ষিক উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। থাইল্যান্ডের বন্যাকবলিত মানুষের প্রতি সংহতি জানান অংশগ্রহণকারীরা।

উদ্বোধনী বক্তব্যে আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বৈশ্বিক অর্থনীতির সামনে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা ও জটিলতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘দেশগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও নীতিগত সুযোগ আগের তুলনায় কমে এসেছে।’ প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), উৎপাদনশীলতা ও প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বড় সম্ভাবনা তৈরি করছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে সেই সুফল পেতে সময়মতো নীতিগত পদক্ষেপের গুরুত্বের ওপর জোর দেন।

আলোচনায় আর্থিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক আর্থিক সুরক্ষা জালের সক্ষমতার ওপর এআইয়ের প্রভাব নিয়েও কথা হয়। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, প্রযুক্তি আর্থিক ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়াতে পারে, তবে একই সঙ্গে নতুন পরিচালনগত ও সাইবার ঝুঁকিও তৈরি করছে। এসব ঝুঁকি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়।

আইএমএফ এ বছর নজরদারি, কর্মসূচি নকশা, আর্থিক খাতের মূল্যায়ন, ঋণ বিশ্লেষণ ও বাহ্যিক খাতের মূল্যায়ন—এসব ক্ষেত্রে যে নীতিগত পর্যালোচনা করেছে, তার হালনাগাদ তথ্যও সংলাপে তুলে ধরা হয়। এ বিষয়ে পরবর্তী উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা ২০২৭ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত হবে।

আরও