টাঙ্গাইলে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের বাস। শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক একজন মানুষের গড়ে প্রতিদিন মাছের চাহিদা রয়েছে ৬৩ গ্রাম। সে হিসাবে একজন মানুষের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২২ কেজি। মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, গত বছর মাছের চাহিদা ছিল ১০৬ হাজার টন। উৎপাদন হয়েছিল ৬৯ হাজার টন। ঘাটতি ছিল ৩৭ হাজার টন। আগের বছরগুলোয়ও চাহিদার বিপরীতে ঘাটতি ছিল। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মাছে চাহিদা পূরণ না হওয়ায় নির্ভরতা বাড়ছে সামুদ্রিক মাছের ওপর।
পুষ্টিবিদরা বলছেন, সামুদ্রিক মাছ উপকারী চর্বি, ভিটামিন-ডি ও আয়োডিনের চমৎকার উৎস, যা দেহের হাড়, মস্তিষ্ক ও থাইরয়েড গ্ল্যান্ডের সুস্থতায় অত্যন্ত কার্যকর। কড লিভার অয়েল ভিটামিন ডি-এর ভালো উৎস। সামুদ্রিক মাছে উপস্থিত ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড হার্টের জন্য উপকারী। এটি হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমায়। শিশু-কিশোরদের মানসিক ও শরীরিক গঠনে ভূমিকা পালন করে সামুদ্রিক মাছ। ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু অংশের ক্ষমতা বাড়ায়, যেটি স্মরণশক্তি বাড়াতে সহায়তা করে। ডিমনেশিয়া বা অ্যালঝেইমারের মতো রোগ প্রতিরোধ করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সপ্তাহে দুদিন সামুদ্রিক মাছ খায়, তাদের হৃদরোগের আশঙ্কা ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। এছাড়া ওমেগা-৩ বিষণ্নতাসহ বিভিন্ন মানসিক রোগের জন্য বেশ কার্যকর। শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের খুব ভালো উৎস সামুদ্রিক মাছ। সামুদ্রিক মাছে দুই ধরনের ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া যায়। ইপিএ ও ডিএইচএ। এই দুই ধরনের ফ্যাটি অ্যাসিডের কোনোটাই মানবদেহ উৎপাদন করতে পারে না। কাজেই খাদ্যের মাধ্যমে দুই ধরনের ফ্যাটি অ্যাসিড গ্রহণ করতে হয়। ১০০ গ্রাম সামুদ্রিক মাছ থেকে ৪২ গ্রাম প্রোটিন পাওয়া যায়। আয়োডিন, সেলেনিয়াম, জিংক ও পটাশিয়ামসহ অনেক অপরিহার্য পুষ্টি উপাদান থাকে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড টেকনোলজি অ্যান্ড নিউট্রিশনাল সায়েন্স বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. আজিজুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশীয় মাছের যে বৈচিত্র্য আমাদের দেশে রয়েছে, পৃথিবীর অন্য কোথাও তা পাওয়া যাবে না। জলবায়ুর পরিবর্তন ও জলাশয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট করার কারণে আমাদের এ সুযোগ নিজেরাই নষ্ট করছি প্রতিনিয়ত। এজন্য অচিরেই এমন সময় আসবে যখন উন্নত দেশগুলোর মতো আমাদেরও সামুদ্রিক মাছের ওপর নির্ভরতা ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকবে না। প্রাণিজ প্রোটিনের সবচেয়ে নিরাপদ উৎস সামুদ্রিক মাছ। সামুদ্রিক মাছে রয়েছে প্রচুর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নত করে। কার্ডিওভাসকুলার রোগ (সিভিডি) ও ক্যান্সার প্রতিরোধেও এ মাছের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সামুদ্রিক খাবার খেলে ভ্রূণ উন্নত হয়। এছাড়া শিশুদের মেধার বিকাশসহ বেশ কয়েকটি রোগ প্রতিরোধ করা যায়।’
টাঙ্গাইলে বড় আকারের প্রতি কেজি রূপচাঁদা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ১০০-১ হাজার ৫০০ টাকা। এছাড়া লবস্টার ১ হাজার ৮০০-২০০০, ইন্ডিয়ান স্যালমন ৮০০ টাকা, লাল কোরাল ৭৯০, সাদা কোরাল ৭০০, কালো কোরাল ৫০০, গলদা চিংড়ি সাইজ অনুযায়ী ১০০০-১ হাজার ৩০০ টাকা কেজি, টুনা ৩৫০-৫০০ এবং কাঁকিলা, বাইম, রিটা, লাক্ষা ও মারলিন মাছ বিক্রি হচ্ছে ৪০০-৬০০ টাকার মধ্যে।
জায়ান্ট ফিশ মার্টের স্বত্বাধিকারী আহাদ বলেন, ‘টাঙ্গাইলে এখন সামুদ্রিক মাছের চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে ডাক্তার যেসব রোগীকে পরামর্শ দেন তারাই বেশি অর্ডার করেন। এছাড়া দক্ষিণাঞ্চাল ও চট্টগ্রামের যারা টাঙ্গাইলে চাকরি করেন, তারাও প্রতিনিয়ত অর্ডার করেন। রূপচাঁদা, কোরাল, স্যালমন, সুরমা, টুনা, পোয়া, ছুরি, বাইলা, চাপিলা, টেংরা, গ্যানগেনি, মলা, বিভিন্ন প্রজাতির চিংড়িসহ প্রায় ৩৫ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছের অর্ডার নিচ্ছি আমরা। এছাড়া সামুদ্রিক কাঁকড়া, অক্টোপাস, স্কুইড, ডরি ফিশও বিক্রি করা হয়।’
টাঙ্গাইল পার্ক বাজারে মোতালেব হোসেন রানা, সুমন এবং কোহিনূর ব্যাপারী দেশীয় মাছের পাশাপাশি সামুদ্রিক মাছ বিক্রি করেন। আব্দুল্লাহ এন্টারপ্রাইজের প্রোপ্রাইটর মো. মোতালেব হোসেন রানা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টাঙ্গাইলে আগে একদমই সামুদ্রিক মাছের চাহিদা ছিল না। এখন প্রচুর পরিমাণে সামুদ্রিক মাছ বিক্রি হচ্ছে। আমি প্রতি মাসে প্রায় ৩০ লাখ টাকার সামুদ্রিক মাছ পাইকারি বিক্রি করছি। বাজার ওঠা-নামার কারণে প্রতিদিনই বিভিন্ন দামে মাছ বিক্রি হয়। কলোম্ব মাছ বেশি বিক্রি হয়।’
টাঙ্গাইল জেলা মৎস্য অফিসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে জেলায় মাছের উৎপাদন ছিল ৫৯ হাজার ৯১২ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে চাহিদা ছিল ৮৭ হাজার ৭১১ টন। উৎপাদন হয় ৬৩ হাজার ৭৮২ দশমিক শূন্য ২ টন। সে হিসাবে চাহিদার তুলনায় মাছ উৎপাদন ছিল ৭২ দশমিক ৭২ শতাংশ। ঘাটতি ছিল ২৭ শতাংশের বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মাছের উৎপাদন ৬৯ দশমিক ২৭ হাজার টন। তবে চাহিদা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৬ দশমিক ৭১ হাজার টন। ঘাটতি রয়েছে ৩৭ দশমিক ৪৪ টন। জেলায় ৩৬ হাজার ৪২৮ জন মৎস্যচাষী রয়েছেন। বাণিজ্যিক খামার রয়েছে ১৬৬টি। এছাড়া পুকুর ও দিঘি রয়েছে ৪১ হাজার ৬৩৩টি, প্লাবনভূমি রয়েছে ২৯২, বিল ২৭৭, নদী ১১ ও খাল ১১২টি রয়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মাছের উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু ঘাটতির কারণে জনসংখ্যা বেড়েছে। তবে ঘাটতি থাকলেও মানুষ মাছ পাচ্ছে নিয়মিতই। ইলিশ, সামুদ্রিক মাছ, ঘেরের চিংড়িসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে টাঙ্গাইলে মাছ আসছে। এখানকার মাছও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে।
ঘাটতির পূরণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মাছের ঘাটতি পূরণে সরকার নির্ধারিত কার্যক্রম যেমন—চাষীকে পরামর্শদান, পানি পরীক্ষা, জলাশয় খনন, মৎস্য আইন বাস্তবায়ন, প্রশিক্ষণ, বিল নার্সারি বাস্তবায়ন, মৎস্য অভয়াশ্রম স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে। এছাড়া কর্মকর্তারা নিজ উদ্যোগে বিল ও প্লাবনভূমিতে মাছ চাষের জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছেন।’