শালবন, জাতীয় উদ্যান, সাফারি পার্ক, ঐতিহাসিক স্থাপনা, বিল, রিসোর্ট ও বিনোদন কেন্দ্র—পর্যটনের বৈচিত্র্যে কমতি নেই গাজীপুরে। রাজধানীর কাছাকাছি হওয়ায় সহজ যোগাযোগের সুবিধাও রয়েছে। তবু পর্যটনের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল প্লাটফর্মের যুগে জেলার বহু পর্যটন কেন্দ্রের পরিচিতি সীমিত। নেই সমন্বিত ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার, অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থানের নেই নিজস্ব ওয়েবসাইটও। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যটন কেন্দ্রগুলোর তথ্য এক জায়গায় এনে কার্যকর ডিজিটাল ব্র্যান্ডিং করা গেলে গাজীপুরের পর্যটন শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও গতি আসবে।
পর্যটকরা এখন গন্তব্য বাছাই, যাতায়াত, আবাসন ও খাবারের তথ্য জানতে গুগল ম্যাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এআইভিত্তিক প্লাটফর্মের ওপর নির্ভর করছেন। কিন্তু গাজীপুরের পর্যটন কেন্দ্রগুলোর তথ্য এসব মাধ্যমে পর্যাপ্ত নয়। জেলার পর্যটন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে সমন্বিত ভ্রমণ পরিকল্পনারও অভাব রয়েছে। ফলে ঢাকার কোনো পর্যটক একদিনে একাধিক গন্তব্য ঘুরে দেখার উপযোগী পথনির্দেশনা সহজে পান না। গণপরিবহন, পর্যটক নির্দেশনা, নিরাপত্তা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতাও এ খাতের বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গাজীপুর জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার (পর্যটন সেল) আহমেদ আলী আদনান জানান, জেলার সব পর্যটন কেন্দ্রের জন্য এখনো কেন্দ্রীয় ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার তৈরি হয়নি। তবে গাজীপুরকে ডিজিটাল পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এআই চ্যাটবট বা এআই ট্যুরিস্ট গাইড চালুর বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব দেয়া হবে। এ ব্যবস্থা চালু হলে পর্যটকরা এক জায়গা থেকেই গন্তব্য, যাতায়াত, আবাসন, খাবার ও স্থানীয় গাইডের তথ্য জানতে পারবেন।
গাজীপুরের অন্যতম পরিচিত পর্যটন কেন্দ্র ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান। প্রায় দুই হাজার একর আয়তনের এ উদ্যানে একসময় প্রতিদিন হাজারো দর্শনার্থী এলেও বর্তমানে তা ১০০-১৫০ জনে নেমে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। প্রায় দুই বছর ধরে সেখানে পিকনিকও হচ্ছে না।
সরজমিনে দেখা গেছে, উদ্যানের শিশু পার্কের অনেক রাইড নষ্ট, টয়লেট ব্যবহার অনুপযোগী, ক্যান্টিন বন্ধ এবং লেকের পানিতে ময়লা-আবর্জনা রয়েছে। ভাঙা সিঁড়ি, অচল নৌযান ও বিশ্রামাগারের অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘জনবল সংকটের পাশাপাশি নিরাপত্তা জোরদারের প্রয়োজন রয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’ অবকাঠামো উন্নয়ন ও পর্যটক বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। তবে উদ্যানের নিজস্ব ওয়েবসাইট না থাকায় ডিজিটাল প্রচারণার সুযোগ সীমিত। বুকিংয়ের জন্য বন বিভাগের ঢাকা অফিসে যোগাযোগ করতে হয়।
অন্যদিকে গাজীপুর সাফারি পার্কে শুক্রবার চার থেকে পাঁচ হাজার এবং অন্যান্য দিনে ৫০০ থেকে এক হাজার দর্শনার্থী আসেন বলে সংশ্লিষ্টদের হিসাব। কিন্তু পার্কটিরও নিজস্ব পূর্ণাঙ্গ ওয়েবসাইট বা স্বতন্ত্র ডিজিটাল প্রচারণা নেই। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক রহমান জানান, বন অধিদপ্তরের প্রচারণার মাধ্যমেই মূলত দর্শনার্থীরা পার্ক সম্পর্কে জানতে পারেন।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক ইয়াসমিন মুশতারি বলেন, ‘মানুষের মুখে মুখে এবং টেলিভিশন ও সংবাদপত্রের মাধ্যমে সাফারি পার্ক সম্পর্কে জেনেছেন তিনি। ডিজিটাল যুগে অনলাইনে সহজে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থা আরো উন্নত করা দরকার বলে অভিমত তার।’
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের সালনা পর্যটন রিসোর্ট অ্যান্ড পিকনিক স্পটেও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা মো. নৈতিক ইসলাম জানান, সেখানে ছয়টি কটেজ, সাতটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণবিহীন কক্ষ ও একটি পিকনিক স্পট রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে সাত থেকে ১০ জন পর্যটক আসেন। ওয়েবসাইট থাকলেও সেখান থেকে বুকিং কম; এআই প্লাটফর্মেও পর্যাপ্ত তথ্য নেই।
গাজীপুরে দুই শতাধিক বেসরকারি রিসোর্ট ও পিকনিক স্পট রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোর ওয়েবসাইট, অনলাইন বুকিং ও ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবস্থা থাকলেও উদ্যোগগুলো বিচ্ছিন্ন। কয়েকটি রিসোর্টের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ওয়েবসাইট থেকে বুকিং পাওয়া গেলেও গুগল ম্যাপ ও এআই প্লাটফর্ম থেকে গ্রাহক আসার প্রবণতা কম।
ছুটি রিসোর্টের সহকারী মহাব্যবস্থাপক ও ব্র্যান্ডপ্রধান মোরশেদুল ইসলাম বলেন, ‘পর্যটন খাতের ডিজিটাল রূপান্তরে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। দেশের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রের তথ্য একসঙ্গে প্রচার করা কোনো একক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। এ বিষয়ে পর্যটন বোর্ড ও পর্যটন করপোরেশনের কাছে প্রস্তাব দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।’
গাজীপুরের পর্যটন কেন্দ্র ঘিরে স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প, গাইড সেবা ও গ্রামীণ আবাসনের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে পর্যটকরা রিসোর্ট বা পার্কে কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে ফিরে যান। তাদের ব্যয়ের বড় অংশ স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ সীমিত থাকে।
পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত এবং ভাওয়াল রাজদীঘি সংস্কার ও টেকসই উন্নয়ন বাস্তবায়ন আন্দোলনের আহ্বায়ক মনোয়ার হোসেন রনি বলেন, ‘জেলার অনেক গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র অবহেলায় পড়ে আছে। এগুলো আধুনিকায়ন ও পর্যটকবান্ধব করার জন্য জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘গাজীপুরের ঐতিহ্য দেশী-বিদেশী পর্যটকদের সামনে তুলে ধরতে হবে। সমন্বিত ডিজিটাল প্লাটফর্মে স্থানীয় খাবার, কৃষিপণ্য, হস্তশিল্প, গ্রামীণ আবাসন, গাইড ও নৌভ্রমণের তথ্য যুক্ত করা গেলে পর্যটনের সুফল স্থানীয় অর্থনীতিতে আরো বিস্তৃত হবে।’
স্থানীয় রিসোর্টগুলোকে ঘিরে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানালেন জেলা প্রশাসক মো. নুরুল করিম ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ‘ঢাকার কাছাকাছি হওয়ায় সবুজ প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটাতে অনেকে গাজীপুরে আসেন। মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে পর্যটন খাতের প্রসার এবং দর্শনার্থীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ে কাজ করা হবে।’
তিনি জানান, সরকারি উদ্যোগে একটি সমন্বিত অনলাইন ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে পর্যটকরা কোথায় কী রয়েছে, কখন এবং কীভাবে সেবা পাওয়া যাবে, তা জানতে পারবেন। কেন্দ্রীয় ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার তৈরির কাজ চলছে। তবে এআই ট্যুরিস্ট গাইড তৈরির কোনো কাজ এখনো শুরু হয়নি।