ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে বড় সম্ভাবনা

—এস. এম. মনিরুল ইসলাম

ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত), ইডকল

ওই সময়ে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ মানুষের কাছে কবে পৌঁছবে, তা ছিল অনিশ্চিত। অন্যদিকে গ্রিড সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করার সক্ষমতাও সম্ভবত সে সময় আমাদের ছিল না।

আমি ইডকলের যাত্রার শুরুর দিকটি উল্লেখ করতে চাই। ২০০২ সালে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ ছিল না। বিদ্যুতায়নের হার ছিল ৪০ শতাংশের নিচে এবং অধিকাংশ গ্রামীণ জনপদ ছিল অফ-গ্রিড এলাকায়। এমন প্রেক্ষাপটে ইডকল সোলার হোম সিস্টেম কর্মসূচি চালু করে। এর আওতায় একটি বাড়ির জন্য স্বতন্ত্র সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হতো, যা দিয়ে একটি পরিবারের মৌলিক আলোর চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব ছিল।

ওই সময়ে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ মানুষের কাছে কবে পৌঁছবে, তা ছিল অনিশ্চিত। অন্যদিকে গ্রিড সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করার সক্ষমতাও সম্ভবত সে সময় আমাদের ছিল না। এ পরিস্থিতিতে ইডকল সোলার হোম সিস্টেম কর্মসূচি চালু করে। এ কর্মসূচির আওতায় আমরা অফ-গ্রিড এলাকায় ৪৩ লাখ বাড়ি ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সোলার হোম সিস্টেম স্থাপন করি।

তখন সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তি সম্পর্কে আমাদের ধারণা ছিল খুবই সীমিত। এমনকি ইডকলে যারা এ কর্মসূচি চালুর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদেরও পর্যাপ্ত ধারণা ছিল না। মানুষকে বাস্তবে দেখিয়ে বোঝাতে হয়েছে যে সূর্যের আলো থেকেও বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। সচেতনতা তৈরির সেই জায়গা থেকে আজ আমরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, বাংলাদেশে এখন সৌরবিদ্যুৎ সম্পর্কে জানেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। আমাদের শুরু করা সোলার হোম সিস্টেম কর্মসূচি পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বৃহত্তম অফ-গ্রিড সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

এ কর্মসূচির স্বীকৃতির বাইরেও আমরা মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পেরেছি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গ্রামের কোনো বাড়িতে একটি শিশু আগে কেরোসিনের কুপির আলোয় পড়াশোনা করত। সৌরবিদ্যুতের আলো ব্যবহারের পর তার পড়াশোনার সময় বেড়েছে। একইভাবে সন্ধ্যার পর যে দোকানটি বন্ধ হয়ে যেত, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে তার কর্মঘণ্টাও বেড়েছে। সামগ্রিকভাবে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েছে।

শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশ এখনো এ কর্মসূচি থেকে কার্বন রাজস্ব পাচ্ছে। এ পর্যন্ত সোলার হোম সিস্টেম কর্মসূচির মাধ্যমে ২৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি কার্বন রাজস্ব এসেছে। এর মধ্যে মাত্র তিন মাস আগে দেশের জন্য ১৫ দশমিক ৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার কার্বন রাজস্ব আনা সম্ভব হয়েছে। আগামী দিনগুলোতেও এ কর্মসূচি থেকে আরো কিছু সময় কার্বন রাজস্ব পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সোলার হোম সিস্টেমের সাফল্যের পর আমরা বাংলাদেশে উৎপাদনশীল কাজে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার শুরু করি। এর ধারাবাহিকতায় সোলার মিনি-গ্রিড ও সোলার সেচ প্রকল্পের মতো উদ্যোগগুলো সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছি। বর্তমানে সোলার আইপিপি, এমনকি এমপিপি প্রকল্পগুলোতেও ইডকলের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রচলন, প্রসার ও উন্নয়নে ইডকল অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে—এ দাবি করলে সম্ভবত আপনারা আমার সঙ্গে একমত হবেন।

সেই ধারাবাহিকতায় আমরা এখনো কাজ করে যাচ্ছি। ইডকলের পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে ৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। আমরা মনে করি, সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকেরও বেশি অর্জনে ইডকলের উদ্যোগ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর একটি শুমারি থেকে দেখা যায়, দেশে চার ধরনের বাড়ি রয়েছে—ঝুপড়ি, কাঁচা, আধাপাকা ও পাকা বাড়ি। আমরা যদি শুধু আধাপাকা ও পাকা বাড়ির সংখ্যা বিবেচনা করি, তাহলে এ ধরনের বাড়ির সংখ্যা দাঁড়ায় ১ কোটি ৬৩ লাখ। এ বাড়িগুলোর ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে যদি অর্ধেক বাড়িতেও চার কিলোওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা সম্ভব হয়, তাহলে মোট ৩৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হবে। আমরা এখন এ কর্মসূচির আওতায় একটি হায়ার-পারচেজ পদ্ধতি চালুর চেষ্টা করছি। এর মাধ্যমে সোলার হোম সিস্টেম কর্মসূচির সফল মডেলটিকে আবারো কাজে লাগাতে চাই।

এ উদ্যোগে আমরা যাদের ডিমান্ড অ্যাগ্রিগেটর বলছি, তারা শেষ ধাপে মানুষের কাছে এ সমাধান পৌঁছে দেবেন। এক্ষেত্রে বাড়ির মালিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মোট ব্যয়ের ২০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট হিসেবে দেবেন। ডিমান্ড অ্যাগ্রিগেটর ২০ শতাংশ অর্থ ইকুইটি হিসেবে বিনিয়োগ করবেন। বাকি ৬০ শতাংশ অর্থ ইডকল সহজ শর্তে পুনঃঅর্থায়ন হিসেবে দেবে। এটিকে আমরা ২০-২০-৬০ মডেল বলতে পারি।

শিগগিরই আমরা এ কর্মসূচি মাঠ পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছি। আমরা মনে করি, আগামী গ্রীষ্মের আগে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ডিআরএস কর্মসূচি বড় ধরনের অবদান রাখতে পারবে। এর ফলে আগামী গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ নিয়ে মানুষের ভোগান্তি কমানো সম্ভব হবে।

আরও