বিবিসি বাংলার খবর

নরসিংদীর মাধবদী কিভাবে শক্তিশালী ভূমিকম্পের কেন্দ্রে পরিণত হলো

আজ সকালেও একই জেলার পলাশ উপজেলায় রিখটার স্কেলে ৩ দশমিক ৩ মাত্রার একটি মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, মাধবদীর এ ভূমিকম্প কেন সারা দেশে, বিশেষ করে ঢাকায় এত তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করল?

গত শুক্রবার রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে যে ভূমিকম্প অনুভূত হয়, তার উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে নরসিংদীর মাধবদী উপজেলায়। মাটির প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে এ ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭। ভূমিকম্পটির জেরে এখন পর্যন্ত দেশে অন্তত ১০ জন নিহত এবং পাঁচ শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। খবর বিবিসি বাংলা।

আজ শনিবার (২২ নভেম্বর) সকালেও একই জেলার পলাশ উপজেলায় রিখটার স্কেলে ৩ দশমিক ৩ মাত্রার একটি মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, মাধবদীর এ ভূমিকম্প কেন সারা দেশে, বিশেষ করে ঢাকায় এত তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করল?

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলছেন, ভূগর্ভে ইন্ডিয়ান প্লেট ও বার্মিজ প্লেটের অবস্থান পরিবর্তনই মাধবদীর ভূমিকম্পের প্রধান কারণ।

ভূমিকম্পের কারণ ও মাধবদীর অবস্থান

বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠ কয়েকটি গতিশীল টেকটনিক প্লেটে বিভক্ত। প্লেটগুলো যে জায়গায় সংযুক্ত থাকে তাকে 'ফল্ট লাইন' বলা হয়। বাংলাদেশে এমন একাধিক ফল্ট লাইন সক্রিয় আছে। এ প্লেটগুলো যখন নড়াচড়া করে বা একটির সঙ্গে অপরটির ঘর্ষণ হয়, তখন শক্তি সঞ্চিত হতে থাকে। যখন এ শক্তি শিলার ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যায়, তখনই ভূ-পৃষ্ঠে কম্পন অনুভূত হয়।

ভূ-তাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশ দুটো প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। পশ্চিমে ইন্ডিয়ান প্লেট আর পূর্ব দিকে বার্মা প্লেট। বাংলাদেশের উত্তর দিকে রয়েছে ইউরেশিয়ান প্লেট।

অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার জানিয়েছেন, ভারতীয় প্লেটটি পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে বার্মা প্লেটের নিচে অর্থাৎ চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রামের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। এ তলিয়ে যাওয়ার কারণে একটি সাবডাকশান জোন তৈরি হয়েছে, যা সিলেট থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, এ অঞ্চলে ৮ দশমিক ২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প তৈরির মতো শক্তি জমা হয়ে আছে এবং এটি কোনো না কোনো এক সময় বের হবেই।

তিনি আরো জানান, নরসিংদীর মাধবদীতে যে ভূমিকম্পের উৎস ছিল, সেটি এ সাবডাকশান জোনেরই একটি অংশ। নরসিংদীতে দুই প্লেটের যে সংযোগস্থল, সেখানেই কম্পনটি সৃষ্টি হয়েছে।

বড় বিপদের দ্বারপ্রান্তে ঢাকা?

অধ্যাপক আখতার জানিয়েছেন, মাধবদীতে প্লেট লকড হয়ে ছিল, যার খুব সামান্য ক্ষুদ্রাংশ খুলে যাওয়ার কারণেই শুক্রবার ভূমিকম্প হয়েছে। তিনি বলেন, এটিই ধারণা দেয় যে, সামনে বড় ভূমিকম্প আমাদের দ্বারপ্রান্তে আছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, বড় প্লেট বাউন্ডারির খুব সামান্য শক্তি বেরিয়ে যাওয়ায় সামনে এ শক্তির সম্পূর্ণ বের হওয়া আরো সহজ হয়ে গেছে।

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই প্লেটের সংযোগস্থলে ৮০০ বছরের বেশি সময় ধরে শক্তি সঞ্চয় হচ্ছে। সৈয়দ হুমায়ুন আখতার মনে করেন, ৮ দশমিক ২ থেকে ৯ মাত্রার ভূকম্পন তৈরির মতো শক্তি এখন জমা আছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এটা বের হবেই। মাধবদীর ভূমিকম্পের কারণে এখন সামনে সহজেই সেই শক্তি বের হয়ে আসতে পারে। আর সেটি হলে আমাদের ঢাকা নগরী একটি মৃত্যুপুরী হয়ে ওঠার আশঙ্কা আছে। সে কারণে আর অবহেলা না করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে বড় ধরনের ভূমিকম্পের প্রধান উৎস দুটো। এর একটি হলো ‘ডাউকি ফল্ট’ (যা শিলং মালভূমির পাদদেশে ময়মনসিংহ-জামালগঞ্জ-সিলেট অঞ্চলে বিস্তৃত) এবং অন্যটি হলো সিলেট থেকে চট্টগ্রাম ও টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল। এই দুটো অঞ্চলের যেখানেই বড় কোনো ভূমিকম্প হলে অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে ঢাকাতেই বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রসঙ্গত, আগেও এ অঞ্চলে বড় মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। ১৭৯৭ সালে ভূমিকম্পের ফলে ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ বদলে গিয়েছিল এবং ১৭৬২ সালে টেকনাফ থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত ৮ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পে সেন্টমার্টিন দ্বীপ তিন মিটার উপরে উঠে আসে। ১৮৯৭ সালে ডাউকি ফল্ট অঞ্চলে ৮ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল।

আরও