‘গ্রেট নেশন প্যাশন’

হোঁচট খাওয়ার বাংলাদেশ ও তারেক রহমানের নতুন যাত্রা

বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা কেবল একটি রাজনৈতিক জয়ের পরিসংখ্যান নয়। এটি ভোটারদের একটি সচেতন সিদ্ধান্ত—রাষ্ট্র পুনর্গঠনে তারা আস্থা রেখেছেন দলটির ওপর। এখন প্রশ্ন একটাই, নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেট কি রাষ্ট্রীয় সংস্কারের সূচনা ঘটাবে? তারেক রহমান কি দীর্ঘদিনের ক্ষয় মেরামত করে একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্র গড়ার পথে হাঁটতে পারবেন? নাকি পূর্বসূরিদের মতোই রাজনৈতিক বাস্তবতার ঘূর্ণাবর্তে আটকে যাবেন, আর বঙ্গীয় বদ্বীপের ‘গ্রেট নেশন’ গড়ার স্বপ্ন অসম্পূর্ণই থেকে যাবে?

২০০৭ সালের বসন্ত। চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভি শুরু করল এক ধারাবাহিক—‘দ্য রাইজ অব দ্য গ্রেট পাওয়ার্স’। প্রাইম টাইম নয়, বড় প্রচারণাও ছিল না। তবুও হইচই ফেলে দিল। অনুষ্ঠানটি বিশ্বের নয়টি শক্তিধর রাষ্ট্রের উত্থানের ইতিহাস বিশ্লেষণ করেছিল। যে তালিকায় চীনের নামই ছিল না। ঠিক সেই অনুপস্থিতিটাই পুরো জাতিকে অস্বস্তিতে ফেলল। চীন তখন দ্রুত প্রবৃদ্ধির পথে। অর্থনীতিবিদরা পূর্বাভাস দিচ্ছিলেন জিডিপির হিসাবে শিগগিরই জার্মানিকে ছাড়িয়ে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হবে দেশটি। কিন্তু পরিসংখ্যানগত উত্থান সত্ত্বেও ‘বিশ্বশক্তির’ তালিকায় জায়গা না পাওয়া এক গভীর মানসিক অস্বস্তি তৈরি করল। দেশটির বুদ্ধিজীবী মহলে, ইন্টারনেটে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে, ব্যবসায়ী আড্ডায় ছড়িয়ে পড়ল ‘গ্রেট নেশন প্যাশন’।

এ আবেগ দ্রুত সামাজিক রূপ নেয়। জনপরিসরে ঘুরতে শুরু করে ‘গ্রেট নেশন প্যাশন’ শব্দবন্ধটি। জাতীয় আত্মপরিচয়, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়। ২০০৭ সালের শুরুতে ‘চাইনিজনেস’ এক নতুন সামাজিক ফ্যাশনে পরিণত হয়। ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি আবার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। টেলিভিশনের গভীর রাতের অনুষ্ঠান এক্সপার্টস’ ফোরাম-এ দুই অধ্যাপক ‘থ্রি কিংডমস’ কিংবা কনফুসিয়াসের ‘অ্যানালেক্টস’ নিয়ে আলোচনা করতেন। আর তা হয়ে উঠত সর্বাধিক আলোচিত অনুষ্ঠান। এ আবেগ ধারণ করল জনপ্রিয় সংগীতও। তাইওয়ানের গার্লস ব্যান্ড এসএইচই তাদের নতুন অ্যালবামের শিরোনাম গান করল ‘চাইনিজ ল্যাঙ্গুয়েজ’। গানের কথায় ঘোষণা, ‘সারা পৃথিবী এখন চীনা ভাষায় কথা বলছে; আমরা যা বলছি, তা বিশ্বকে শুনতেই হবে।’ মোটা দাগে এটি ছিল রাষ্ট্র-মনস্তত্ত্বের রূপান্তর।

এর আগে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে চীনের অর্থনীতি ছিল জটিল ও নিয়ন্ত্রণহীন ঘূর্ণাবর্তে। সে সময় অর্থনৈতিক সংস্কারের হাল ধরেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী জু রংজি। ‘ত্রিভুজ ঋণ সংকট’ সামলানো থেকে শুরু করে অকার্যকর রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কঠোরতা আর ১৯৯৪ সালে কর ব্যবস্থাকে কেন্দ্রীয় শৃঙ্খলায় আনেন তিনি। যার ধারাবাহিকতায় পরের দুই দশকে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চপ্রবৃদ্ধি চীনের অর্থনীতিকে বৈশ্বিক উৎপাদন শক্তিতে পরিণত করে। আর সে উত্থানের ওপর দাঁড়িয়েই পরে ‘গ্রেট নেশন’ ধারণা জোরালো হয়ে ওঠে। লাখ লাখ নতুন বিনিয়োগকারী বাজারে ঢোকে, শেয়ারবাজারে উত্থান ঘটে। শুধু শহুরে পেশাজীবী নয়; ছাত্র, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ সবাই।

এরপর ২০০৮ সালে বেইজিং অলিম্পিক। আতশবাজির ঝলক, নিখুঁত কোরিওগ্রাফ, প্রযুক্তি ও ঐতিহ্যের মিশেল—চীন যেন বিশ্বকে একটাই বার্তা দিল ‘আমরাও গ্রেট নেশন’। বিশ্বপরাশক্তিতে রূপান্তরের পর্ব শুরু হয় পরের দশকে। ২০১২ সাল থেকে শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে চীন নিজেকে পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। আত্মপরিচয়ের বৌদ্ধিক আলোচনাকে নীতিগত রূপ দিয়ে বেইজিংয়ের ‘গ্রেট নেশন প্যাশন’ রূপ নেয় ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায়।

চীন যেমন অর্থনৈতিক রূপান্তরের ওপর দাঁড়িয়ে জাতীয় আত্মবিশ্বাস নির্মাণ করেছিল, তেমনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মালয়েশিয়া এক ভিন্ন মডেল তৈরি করে। যার গল্প শুরু হয় ১৯৫৭ সালে মালয়ার স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে। ১৯৬৩ সালে সাবাহ ও সারাওয়াক যুক্ত হয়ে গড়ে ওঠে মালয়েশিয়া। উপনিবেশ-উত্তর প্রশাসনিক কাঠামো সুসংগঠিত থাকলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল জটিল। মালয়, চীনা ও ভারতীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গড়া রাষ্ট্রটিতে জাতিগত দাঙ্গার প্রবণতা ছিল। ১৯৬৯ সালের সহিংসতা-উত্তর মালয়েশিয়া ঘুরে দাঁড়ায়। রাষ্ট্র রূপান্তরের যাত্রা সেখানেই শুরু, যা পরিপূর্ণ করেন মাহাথির মোহাম্মদ ১৯৮১ সালে ক্ষমতায় এসে। তিনি মালয়েশিয়াকে কাঁচামালনির্ভর অর্থনীতি থেকে শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্রে রূপান্তরের লক্ষ্য নেন। নব্বইয়ের দশকে প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের আশপাশে স্থিত থাকে এবং দেশটি ‘নিউলি ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজিং ইকোনমি’ হিসেবে পরিচিতি পায়। ১৯৯৪ সালে ‘মাল্টিমিডিয়া সুপার করিডোর’ প্রকল্প ঘোষণার মাধ্যমে শিল্পায়নকে তথ্যভিত্তিক অর্থনীতির দিকে মোড় দেয়ার চেষ্টা হয়। কিন্তু মাহাথিরের ‘গ্রেটেস্ট মালয়েশিয়া’ প্রকল্প শুধু অর্থনীতির গ্রাফ নয়; এটি ছিল সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস নির্মাণের প্রকল্প। ১৯৯১ সালে ‘ভিশন ২০২০’ ঘোষণার সময় মাহাথির বলেছিলেন, ‘মালয়েশিয়ার উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক অর্থে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। উন্নত হতে হবে জাতীয় ঐক্য ও সামাজিক সংহতির ক্ষেত্রে; অর্থনীতি, সামাজিক ন্যায়বিচার, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ এবং জাতীয় গর্ব ও আত্মবিশ্বাসে।’

বিপরীতে বাংলাদেশে ‘গ্রেট নেশন’ ধারণাটি কখনো সুসংগঠিত রাষ্ট্র-প্রকল্পে রূপ নেয়নি। যদিও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জাতি হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা স্বাধীনতার ঘোষণার সঙ্গেই জন্ম নিয়েছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ কেবল একটি ভূখণ্ড অর্জন করেনি; অর্জন করেছিল আত্মমর্যাদার দাবি। মানুষের প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্র হবে ন্যায়ভিত্তিক, আত্মনির্ভর ও সম্মানজনক। কিন্তু স্বাধীনতার পর বাস্তবতা ঠিক উল্টো। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, খাদ্য সংকট, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার ভেতরে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব প্রত্যাশিত প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতি গড়ে তুলতে পারেনি। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ এবং একদলীয় শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন রাষ্ট্রীয় আস্থাকে একেবারে দুর্বল করে দেয়। যে রাষ্ট্রকে মানুষ উত্থানের পথে দেখতে চেয়েছিল, সেটি জন্মলগ্নেই হোঁচট খায়।

১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ প্রবেশ করে গভীর অনিশ্চয়তার সময়কালে। একের পর এক অভ্যুত্থান, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং প্রশাসনিক স্থবিরতা রাষ্ট্রকে প্রায় ভেঙে পড়ার অবস্থায় নিয়ে যায়। রাজনৈতিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ, সামরিক প্রভাব বিস্তৃত, আমলাতন্ত্র বিভক্ত—সব মিলিয়ে রাষ্ট্রকাঠামো কার্যকরভাবে কাজ করছিল না। এ সংকটময় বাস্তবতায় জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পুনর্গঠনে কৌশলগত পথ বেছে নেন। জিয়াউর রহমানের প্রচেষ্টা ছিল স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে পুনরায় সক্রিয় করা। ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ, মুক্তিযোদ্ধা, টেকনোক্র্যাট ও সংখ্যালঘু প্রতিনিধিদের নিয়ে তিনি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রশাসনিক কাঠামো বিস্তৃত করার চেষ্টা করেন। লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক সংঘাত কমানো, আমলাতন্ত্রকে কার্যকর করা এবং অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে উৎপাদনমুখী পথে নেয়া। গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন কর্মসূচি, বেসরকারি খাতের প্রসার এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো পুনঃপ্রবর্তনের উদ্যোগের মাধ্যমে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্র গড়ার আকাঙ্ক্ষা তার আমলে নতুন ভাষা পায়। কিন্তু সেনাবাহিনীর হঠকারী কিছু সদস্যের হাতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সেই যাত্রা থেমে যায়।

পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ স্বৈরশাসন রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে আবার সংকুচিত করে। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সীমিত হয়। প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তিনির্ভর হয়ে ওঠে। ১৯৯০-পরবর্তী গণতান্ত্রিক পুনরুত্থান মানুষের মধ্যে নতুন আশা জাগালেও দলীয় দ্বন্দ্ব, অবিশ্বাসের রাজনীতি এবং ক্ষমতার পালাবদলের তিক্ততায় প্রত্যাশিত ফল মেলেনি। তবু মানুষের আকাঙ্ক্ষা থেমে থাকেনি। স্বাধীনতার পর থেকে প্রতিটি প্রজন্মই কোনো না কোনো সময়ে বিশ্বাস করেছে—এবার হয়তো রাষ্ট্র তার সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেবে। যদিও সে বিশ্বাসে আঘাত এসেছে বারবার।

শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসনামলে ব্যাংক খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার, খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক আনুগত্যের সংস্কৃতি অর্থনীতির ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। একই সঙ্গে আমলাতন্ত্রের দলীয়করণ প্রশাসনিক নিরপেক্ষতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে ব্যক্তিনির্ভর। ক্ষমতার অপব্যবহার ও সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেয়ার কারণে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতার বদলে ব্যক্তিনির্ভর অবস্থানে অকার্যকর হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য ক্রমে ভেঙে পড়ে। এ সময় বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প নেয়া হয়। কিন্তু এসব মেগা প্রকল্পের অনেকগুলোর অর্থনৈতিক উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রবৃদ্ধির বিপরীতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার ছিল সীমিত; অর্থনীতিতে ‘জবলেস গ্রোথ’-এর প্রবণতা স্পষ্ট হয়। প্রবৃদ্ধির হার কাগজে-কলমে উচ্চ দেখালেও শিল্প খাতে কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান বাড়েনি, বেকারত্ব কমেনি। সরকারি পরিসংখ্যান নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। জিডিপি প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস বা মাথাপিছু আয়সংক্রান্ত তথ্য ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়। কিন্তু উৎপাদনশীলতা, রফতানি বহুমুখীকরণ বা আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা—এসব কাঠামোগত সূচকে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। রাজনৈতিক পরিসরও সংকুচিত হয়। একতরফা নির্বাচন, বিরোধী শক্তির দমন, মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ে। মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম ও হত্যার ঘটনা দেশ ছাপিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচিত হয়। নাগরিক স্বাধীনতার পরিসর সংকুচিত হওয়ায় রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয় ও মানবাধিকার সংকট মিলিয়ে চিত্রটি ছিল এক রকমের ‘ফাঁপা উন্নয়ন’।

জমে থাকা ক্ষোভ ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমি তৈরি করে। রাজপথে নেমে তরুণ প্রজন্ম শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন দাবি করেনি; তারা জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রশ্ন তোলে। ফলে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান কেবল শাসক পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের দাবিও। মানুষ আবার সে পুরনো স্বপ্নটাকেই সামনে এনেছে—একটি কার্যকর, ন্যায়ভিত্তিক, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্র। গণ-অভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী শাসনকালকে অনেকেই একটি ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন। মানুষের প্রত্যাশা ছিল, তিনি হয়তো মাহাথিরের মতো একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্র-রূপান্তরের সূচনা করবেন। দুর্নীতিগ্রস্ত কাঠামো ভেঙে আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনিক সংস্কার, আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ে তোলার সুযোগ ছিল তার সামনে। কিন্তু দেড় বছরে দৃশ্যমান কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন হয়নি। আন্তর্জাতিক সূচকে পাসপোর্টের মানে অবনমন হয়েছে। দরপত্রবিহীন কেনাকাটার সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আসেনি, দুর্নীতি বৃদ্ধির অভিযোগও জোরালো হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধনের পাশাপাশি ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। যদিও তাদের ১৮ মাসে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ঋণ গ্রহণ বেড়েছে। সব মিলিয়ে এ সময়ে সরকারের নেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম অঙ্গীকার ছিল বৈষম্যহীন সমাজ। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বৈষম্য কমার বদলে বেড়েছে। দায়িত্ব নেয়ার পর ১৮ মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষিত ২ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার নতুন প্রকল্পের প্রায় ৪২ শতাংশই পেয়েছে প্রধান উপদেষ্টার নিজ জেলা চট্টগ্রাম। যে প্রশাসনিক কাঠামো, যে ক্ষমতাকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া এবং যে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পূর্ববর্তী শাসনামলে গড়ে উঠেছিল, তার অনেকটাই বহাল থেকেছে। ফলে যে অন্তর্বর্তী শাসনকালকে অনেকে রূপান্তরের সূচনা ভাবছিলেন, অনেকের চোখে সেখানে মুখ বদলালেও কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা হয়নি। অর্থাৎ গণ-অভ্যুত্থানকে চালিত করা বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন অন্তর্বর্তী পর্বেই এসে যেন প্রাথমিকভাবে হোঁচট খায়।

এ প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হলো গণতন্ত্রে উত্তরণের সন্ধিক্ষণ—১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। যে দলের নেতৃত্বে আছেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সন্তান তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে গত বছরের ডিসেম্বরে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন তিনি। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়েছেন তারেক রহমান। গণতন্ত্রে উত্তরণের এ অভিযাত্রায় মানুষ স্থিতিশীলতার পক্ষে রায় দিয়েছে। একই সঙ্গে ভোটের বণ্টন ইঙ্গিত দেয়—রাজনৈতিক ইসলামের নামে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রতি ভোটারদের অনীহা রয়েছে। বিশ্বের বহু দেশে দেখা গেছে, ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক রাজনৈতিক প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় স্থিতি বা অর্থনৈতিক সাফল্য নিশ্চিত করতে পারেনি। কোথাও তা অভ্যন্তরীণ বিভাজন তৈরি করেছে, কোথাও আন্তর্জাতিক চাপ ডেকে এনেছে। আবার কোথাও সরাসরি হস্তক্ষেপের পথ খুলে দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ধারার রাজনীতি নারীর সামাজিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা সংকুচিত করেছে এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিসর সীমিত করেছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে উত্তর আফ্রিকা, এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অভিজ্ঞতাও দেখিয়েছে যখন ধর্মভিত্তিক রাজনীতি রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রাধান্য পায়, তখন বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো হস্তক্ষেপ করে। বাংলাদেশের ভোটাররা এ বৈশ্বিক বাস্তবতা সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন না। একই সঙ্গে তারা উদার গণতান্ত্রিক মধ্যপন্থার পক্ষে রায় দিয়েছেন।

২০২৬ সালের নির্বাচনে মানুষ আবারো ‘গ্রেট নেশন’ গড়ার দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা ও জমে থাকা আবেগকে সঙ্গে নিয়েই ভোট দিয়েছে। যেখানে কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রকে নতুন করে দাঁড় করানোর প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশও ছিল। কিন্তু সামনে পথ সহজ নয়। দীর্ঘ ১৬ বছরের আওয়ামী শাসনামলে প্রশাসন, অর্থনীতি, ব্যাংক খাত—সবখানেই যে ক্ষতি হয়েছে, তা একসঙ্গে মেরামত করা বিশাল চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্রীয় লুটপাট, অর্থ পাচার, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা—সব মিলিয়ে নতুন সরকারের সামনে একটি জটিল বাস্তবতা দাঁড়িয়ে আছে। এ প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের নেতৃত্বও প্রশ্নের বাইরে নয়। অতীত রাজনীতিতে তার ভূমিকা ও অবস্থান নিয়ে নানা সমালোচনা রয়েছে। তবে নির্বাচনের ফলাফল দেখিয়েছে—মানুষ শেষ পর্যন্ত তার নেতৃত্বের ওপরই আস্থা রেখেছে।

সাম্প্রতিক বিশ্বে বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ধরনের নেতৃত্ব সামনে এসেছে, যারা রাষ্ট্রের রূপান্তর ঘটিয়েছেন নানা কৌশলে। নিউজিল্যান্ডের জেসিন্ডা আর্ডার্ন সংকটের সময়ে সহমর্মিতা ও মানবিক অবস্থান থেকে জাতীয় ঐক্য ধরে রাখার দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। জার্মানির আঙ্গেলা মেরকেল দীর্ঘ সময় ধরে ইউরোপীয় ঐক্য ও স্থিতিশীল শাসনকে অগ্রাধিকার দিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেও প্রতিষ্ঠাননির্ভর নেতৃত্ব দেখিয়েছেন। আধুনিককালে রাষ্ট্র পুনর্গঠন কেবল উপনিবেশ-উত্তর রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি দাঁড়িয়ে আছে গ্লোবালাইজেশন, ডিজিটাল রূপান্তর এবং সামাজিক সংহতির জটিল ত্রিভুজে। আধুনিক নেতৃত্বের মূল বৈশিষ্ট্যগুলোর অন্যতম প্রযুক্তিগত দক্ষতা। বিজ্ঞান ও ডিজিটাল উপকরণকে শাসন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কাজে লাগানোর সক্ষমতা। এছাড়া আন্তঃসাংস্কৃতিক সহমর্মিতা বা বহু জাতিগত ও সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে বিস্তৃত ঐক্য গড়ে তোলা এবং দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো, টেকসই উন্নয়ন ও নীতি পরিকল্পনা করা। একুশ শতকে রাষ্ট্র রূপান্তর ও পুনর্গঠনের আরেকটি বড় শর্ত হলো গভীর সংকটের মধ্যেও দেশকে নেতৃত্ব দেয়ার সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক বা নিরাপত্তাজনিত ধাক্কা দক্ষভাবে সামলানো। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল অভিযোজন—প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে শাসন ব্যবস্থা ও অর্থনীতিকে আরো কার্যকর করা। একইভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মাধ্যমে বৈষম্য কমানো এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের অংশীদার করা জরুরি। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো বৈশ্বিক অবস্থান বা গ্লোবাল পজিশনিং। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কৌশলগতভাবে পরিচালনা করে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা, যা আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জাতি গড়ার অন্যতম সূচক।

এশিয়া ও আফ্রিকার সাম্প্রতিক ইতিহাসে রাষ্ট্র রূপান্তরের একাধিক উদাহরণ রয়েছে, যেখানে নেতৃত্ব শুধু সরকার পরিচালনা করেনি, বরং রাষ্ট্রের চরিত্রই বদলে দিয়েছে। সিঙ্গাপুরে লি কুয়ান ইউ স্বাধীনতার পর জাতিগত বিভাজন, বেকারত্ব ও সীমিত সম্পদের বাস্তবতার মধ্যেও কঠোর মেধাভিত্তিক প্রশাসন গড়ে তোলেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন এবং বাণিজ্য ও রফতানিনির্ভর অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দেন। ধারাবাহিক নীতি ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার ফলে সিঙ্গাপুর আজ উচ্চ আয়ের রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। দক্ষিণ কোরিয়ায় পার্ক চুং হি সামরিক শাসনের বিতর্ক সত্ত্বেও রফতানিনির্ভর শিল্পায়ন ও প্রযুক্তি বিনিয়োগের ভিত্তি স্থাপন করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি কয়েক দশকে প্রযুক্তি শক্তিতে রূপ নেয়। ভিয়েতনাম নগুয়েন ফু ত্রং-এর সময়সহ দীর্ঘকাল ধরে ‘দোই মোই’ সংস্কারের ধারাবাহিকতায় পরিকল্পিত অর্থনীতি থেকে বাজারমুখী মডেলে সরে এসে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের কেন্দ্রে ঢুকে পড়ে। আফ্রিকায় রুয়ান্ডা গণহত্যার ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে পল কাগামের নেতৃত্বে প্রশাসনিক দক্ষতা, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলে। রাজধানী কিগালিকে গড়ে তোলা হয় পরিচ্ছন্ন ও ডিজিটাল শহরের মডেল হিসেবে। কমিউনিস্ট শাসনের পতনের পর পূর্ব ইউরোপ ও সোভিয়েত-উত্তর অঞ্চলের কয়েকটি দেশ নিজেদের পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে সাফল্য লাভ করে। ১৯৮৯-পরবর্তী পোল্যান্ড বাজারমুখী দ্রুত সংস্কার (শক থেরাপি) গ্রহণ করে শিল্প-অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে মধ্য ইউরোপের একটি প্রভাবশালী অর্থনীতিতে পরিণত হয়। চেক প্রজাতন্ত্র উৎপাদন ও রফতানি আধুনিকায়ন করে উচ্চ আয়ের পথে এগোয়। বাল্টিক অঞ্চলে এস্তোনিয়া ডিজিটাল রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রে বসিয়ে ই-গভর্ন্যান্স, স্বচ্ছ প্রশাসন ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবার মডেল দাঁড় করায়।

এসব বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের সামনে একটি নীতিগত তুলনামূলক কাঠামো হাজির করে। বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা কেবল একটি রাজনৈতিক জয়ের পরিসংখ্যান নয়। এটি ভোটারদের একটি সচেতন সিদ্ধান্ত—রাষ্ট্র পুনর্গঠনে তারা আস্থা রেখেছেন দলটির ওপর। এখন প্রশ্ন একটাই, নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেট কি রাষ্ট্রীয় সংস্কারের সূচনা ঘটাবে? তারেক রহমান কি দীর্ঘদিনের ক্ষয় মেরামত করে একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্র গড়ার পথে হাঁটতে পারবেন? নাকি পূর্বসূরিদের মতোই রাজনৈতিক বাস্তবতার ঘূর্ণাবর্তে আটকে যাবেন, আর বঙ্গীয় বদ্বীপের ‘গ্রেট নেশন’ গড়ার স্বপ্ন অসম্পূর্ণই থেকে যাবে?

দেওয়ান হানিফ মাহমুদ: সম্পাদক, বণিক বার্তা

[অনুলিখন ও সহায়তায় মাহফুজ রাহমান]

আরও