সুন্দরবন, মোংলা বন্দরসহ প্রাকৃতিক সম্পদবেষ্টিত খুলনা বিভাগে চাঁদাবাজি ও দখলদারত্ব বিস্তার করতে শুরু করেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হিসাবে এ ধরনের অপরাধের জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রামের পরই উঠে এসেছে ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা এ বিভাগটি। চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের মতো অপরাধে গ্রেফতারদের মধ্যে ৫৭ শতাংশই নতুন মুখ। অর্থাৎ তাদের নামে এরই মধ্যে চাঁদাবাজির মতো অপরাধে যুক্ত থাকার রেকর্ড ছিল না। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন অপরাধীদের আবির্ভাব ঘটেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত এ ধরনের অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে না পারলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি আরো অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট ভারতে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর গঠন করা হয় অন্তর্বর্তী সরকার। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্যে অপরাধীদের সংশ্লিষ্টতায় ক্রমবর্ধমান হারে বাড়তে থাকে চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের মতো অপরাধ। এ পরিস্থিতিতে পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) পক্ষ থেকে দেশব্যাপী চাঁদাবাজি ও অবৈধ দখলদারত্বে যুক্ত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়। এমনকি এ ধরনের অপরাধকে প্রাধান্য দিয়ে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও র্যাবের সমন্বয়ে দেশব্যাপী শুরু হয় বিশেষ অভিযান। দেশের আটটি বিভাগ ও আটটি রেঞ্জে অভিযান শুরু করে পুলিশ। অভিযানে গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে অনেকেরই রয়েছে রাজনৈতিক পরিচয়। আবার নতুন এ অপরাধেও যুক্ত হয়েছেন কেউ কেউ। তাদের সবার তথ্য সংবলিত একটি ডাটাবেজ তৈরি করছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত ১৫ জুলাই থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে পরিচালিত অভিযানে সর্বমোট ৬৫০ জনকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭১ জনই নতুন মুখ। তাদের বিরুদ্ধে আগে কখনো চাঁদাবাজি ও অবৈধ দখলদারত্বের কোনো অভিযোগ ছিল না। বাকি ২৭৪ জন আগে থেকেই চাঁদাবাজ ও অবৈধ দখলদার হিসেবে চিহ্নিত। তাদের বিরুদ্ধে মামলাও রয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে চাঁদাবাজ ও অবৈধ দখলদার সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে। ঢাকা মেট্রোপলিটন ও ঢাকা রেঞ্জ মিলিয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে ২৩৩ জনকে। এর মধ্যে ৭৯ জন আগে থেকে চিহ্নিত। তাদের বিরুদ্ধে পুরনো মামলা রয়েছে। এর বাইরে ১৫০ জনকে চাঁদাবাজির নতুন মামলা দেয়া হয়েছে। ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে। এ বিভাগটি চাঁদাবাজি ও অবৈধ দখলদারত্বের অপরাধ বিবেচনায় দ্বিতীয় অবস্থানে। সেখানে সর্বমোট ৮৩ জনকে চিহ্নিত করে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৬ জন আগে থেকে চিহ্নিত। তাদের নামে চাঁদাবাজির মামলাও ছিল। নতুন করে এ অপরাধে যুক্ত হয়েছেন ৪৬ জন। তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়েছে।
ক্রমবর্ধমান চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের অপরাধ দেশের বিনিয়োগ পরিবেশকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে বলে মনে করে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোও। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের বিস্তার ব্যবসায়িক আস্থা মারাত্মক ক্ষুণ্ন করছে। আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সরকারের দৃশ্যমান ব্যর্থতা বিনিয়োগ পরিবেশকে ঝুঁকিপূর্ণ করছে। ব্যবসায়ীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, যা কর্মসংস্থান ও রফতানি প্রবৃদ্ধির জন্য হুমকি। সরকারকে অবিলম্বে শক্ত পদক্ষেপ নিয়ে ব্যবসায়িক আস্থা পুনঃস্থাপন করতে হবে।’
দেশের প্রাচীনতম নদীবন্দরগুলোর মধ্যে খুলনা অন্যতম। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থলবন্দর, শিল্প-কারখানাও রয়েছে বিভাগটিতে। খুলনা শহর থেকে ৪৮ কিলোমিটার দূরে দেশের দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর মোংলা সমুদ্রবন্দর অবস্থিত। সামগ্রিকভাবে মৎস্য সম্পদ, বনজ সম্পদ খুলনা বিভাগকে অন্য সব বিভাগ থেকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। পাশাপাশি ফুল ও সবজির বড় জোগানও সরবরাহ হয় এ বিভাগ থেকেই। চাঁদাবাজ ও অবৈধ দখলদারের বিস্তার বিবেচনায় খুলনা বিভাগের অবস্থান এখন তৃতীয়। এ ধরনের অপরাধে যুক্ত থাকায় বিভাগটি থেকে এরই মধ্যে ৬১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৬ জন আগে থেকেই চিহ্নিত। ১৫ জনকে নতুন করে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা দেয়া হয়েছে।
চাঁদাবাজি ও অবৈধ দখলদারত্ব রোধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যেকোনো দেশেই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যে ঘাটতি তৈরি হয় সেটা মোকাবেলা করতে কঠোরভাবে আইনের প্রয়োগ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। আইন প্রয়োগে ঘাটতি থাকলে জবাবদিহি ও দায়িত্বশীলতা তৈরি হয় না। ফলে পুলিশ আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে সংকটের মধ্যে পড়ছে। ৫ আগস্টের পর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উত্তরণে যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তা মাঠের অপরাধ বাস্তবতা মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে যথাযথ নয়। এ ধরনের অপরাধ দমনে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আইন প্রয়োগ করে সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে না পারলে বিভিন্ন অপরাধমূলক চক্রের অপরাধ-তৎপরতা বৃদ্ধি পায়, যা সমাজে নানাবিধ অপরাধ সৃষ্টি করে।’
এ বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সারা দেশেই চাঁদাবাজি ও দখলদারত্ব রোধ করতে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু প্রভাবশালীরা এখনো নানাভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। যখনই আমরা কোনো অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছি, তখনই তারা থানা ঘেরাওসহ নানা ধরনের কার্যক্রম শুরু করছে। অথচ এসব ক্ষেত্রে তাদের সহযোগিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’