সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের পর ব্যবসায়ীরা পালিয়ে গেলেন, রাজনীতিবিদরা আত্মগোপন করলেন, আর আমলারা ফিরে এলেন। কারণ এ পুরনো বন্দোবস্তের সবচেয়ে বড় রক্ষক হলো আমলাতন্ত্র। ওই আমলাতন্ত্র তখন আবার ফিরে এল। আর আমলাতন্ত্রকে ফিরে আসার সবচেয়ে বড় সুযোগ করে দিল অন্তর্বর্তী সরকার। বাংলাদেশে অতীতেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছিল, কিন্তু সেগুলো টেকেনি। কারণ এসব পরিবর্তনের পক্ষে থাকা সামাজিক শক্তিগুলোকে সংগঠিত করা হয়নি।’
গতকাল দুপুরে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে ‘আগামী সরকারের জন্য নির্বাচিত নীতি সুপারিশ ও প্রস্তাবিত জাতীয় কর্মসূচি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্লাটফর্ম এ আয়োজন করে।
অন্তর্বর্তী সরকার প্রসঙ্গে নাগরিক প্লাটফর্মের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘ওনারা নতুন শক্তির কথা বলে শেষ বিচারে গিয়ে একটি ক্ষুদ্র ও উগ্র গোষ্ঠীর কাছে অনেক ক্ষেত্রে জিম্মি হয়ে গেলেন। নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে পারলেন না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নিরপেক্ষভাবে নির্বাচনটাও করতে পারবেন কিনা।’
তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যে সংস্কারের কথা বলেছিল, সে সংস্কারকে কার্যকর করার ক্ষেত্রে যে সক্ষমতা, অংশীজনের অংশগ্রহণ, উন্মুক্ততা দরকার, সেটি তারা দেখাতে পারেনি।’ সংলাপের ক্ষেত্রে সরকার শুধু রাজনীতিবিদদের গুরুত্ব দিয়েছে, এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘একটা জাতীয় উত্থান, জাতীয় জাগরণ, জাতীয় অংশগ্রহণের ভেতরে অংশীজনদের নিয়ে নতুন বন্দোবস্তের চিন্তাকে সামনে উপস্থাপন করা হয়নি।’
সংলাপে অংশীজনদের মতামত না নেয়াকে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘এর দুটো ফলাফল হলো যারা নতুন বন্দোবস্তের কারিগর হতে চেয়েছিলেন, তারা পুরনো বন্দোবস্তের অংশ হয়ে গেলেন। তারা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ভেতরে ঢুকে গেলেন এবং ব্যয়বহুল নির্বাচনের অংশ হয়ে গেলেন। বড়জোর তারা ক্রাউড ফান্ডিং করে টাকা তুললেন, কিন্তু টাকার খরচ কমানোর ক্ষেত্রে কিন্তু আর পারলেন না। সমস্যার দ্বিতীয় ফলাফল হিসেবে কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী, যারা পুরনো বন্দোবস্তের ধারক ও বাহক ছিল, তাদের উত্থান হয়েছে।’
গণমাধ্যম প্রসঙ্গে বিশিষ্ট এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘অতীতে গঠিত মিডিয়া কমিশনের কোনো সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন হয়নি। কমিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ ছিল মিডিয়া হাউজগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। যে মিডিয়া প্রতিষ্ঠান নিজের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারে না, তার অন্যের কাছে স্বচ্ছতা দাবি করার নৈতিক অধিকারও সীমিত হয়ে যায়। গণমাধ্যমের পেশাজীবী সংগঠনগুলো রাজনৈতিক বিভক্তির কারণে স্বাধীন ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। মিডিয়া যদি রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত থাকে, তাহলে তাদের কণ্ঠস্বরের গ্রহণযোগ্যতা কমে যায় এবং তারা পেশাগত স্বার্থরক্ষা করতে পারে না।’
মিডিয়া হাউজের ভেতরে কর্মরত সাংবাদিক ও কর্মচারীদের পেশাগত উৎকর্ষ, ন্যায্য মজুরি, প্রণোদনা ও কাজের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে আগামী সরকারের জন্য ১২টি নীতি বিবৃতি ও প্রস্তাবিত জাতীয় কর্মসূচি উপস্থাপন করা হয়। নীতি সুপারিশগুলো তুলে ধরেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং জাতীয় কর্মসূচি উপস্থাপন করেন সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন নাগরিক প্লাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্য আসিফ ইব্রাহিম, রাশেদা কে চৌধুরী, শাহীন আনাম, সুলতানা কামাল প্রমুখ।