রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাশে ৪৪২ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করবে বিপিডিবি

দেশের বিদ্যুৎ খাতে বিপিডিবি বর্তমানে একটি লোকসানি প্রতিষ্ঠান। বিদ্যুৎ ক্রয় বাবদ প্রতিষ্ঠানটি প্রতি বছর সরকারের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ভর্তুকি নিচ্ছে।

বাগেরহাটের রামপালে অবস্থিত ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাশে ৪৪২ মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে বিপিডিবির নেয়া এ প্রকল্পে ব্যয় হবে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। এরই মধ্যে এ-সংক্রান্ত একটি প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করে সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে বিপিডিবি।

বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, রামপালে বিপিডিবি যে স্থানে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করার উদ্যোগ নিয়েছে, সেখানে মূলত রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সেকেন্ড ফেজ (দ্বিতীয় পর্যায়) নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ না করার নীতিগত সিদ্ধান্ত হলে অধিগ্রহণ করা ৬৮৫ একর জমি দীর্ঘদিন পতিত অবস্থায় থাকে। এ জমিতে এখন ৪৪২ মেগাওয়াট (ডিসি) ক্ষমতাসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়ে ২০২৯ সালের জুনে এ প্রকল্পের কাজ শেষ করতে চায় বিপিডিবি। এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ২ হাজার ৪৯৮ কোটি ৯৯ লাখ টাকা ব্যয় হবে। এ প্রকল্পে ৩৭৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা বিপিডিবি নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেবে। বাকি ২ হাজার ১২৪ কোটি টাকা বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল থেকে ব্যয় হবে। বিপিডিবি এ ব্যয়ের হিসাব করেছে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার ১২৩ টাকা দর ধরে।

রামপালে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বর্তমানে উৎপাদনে রয়েছে। এটি পরিচালনা করছে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফপিসিএল), যার ৫০ শতাংশের মালিকানায় রয়েছে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি এনটিপিসি। বাকি ৫০ শতাংশের মালিকানায় বিপিডিবি। তাপভিত্তিক এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাশে বৃহৎ সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা যায় কিনা, সেই বিষয়ে অনুমতি চেয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে চিঠি দেয় বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগ। পরে মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে প্রকল্পটির নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয় বলে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

বিপিডিবির সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে শিল্প ও শক্তি বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিপিডিপি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে প্রকল্পের ডিপিপি পাঠিয়েছে, সে অনুযায়ী প্রক্রিয়া শুরু করেছি আমরা। যেহেতু রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে অতীতে নানা অভিযোগ ছিল, এজন্য সেখানে প্রকল্প নেয়া যায় কিনা সেই বিষয়ে আমরা পরিকল্পনামন্ত্রীর অনুমতি চেয়েছিলাম, মন্ত্রী মৌখিক অনুমতি দিয়েছেন। তবে এখনো প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা হয়নি।’

দেশের বিদ্যুৎ খাতে বিপিডিবি বর্তমানে একটি লোকসানি প্রতিষ্ঠান। বিদ্যুৎ ক্রয় বাবদ প্রতিষ্ঠানটি প্রতি বছর সরকারের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ভর্তুকি নিচ্ছে। এ পরিস্থিতির মধ্যে বৃহৎ সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে কোথা থেকে অর্থের সংস্থান আসবে, এমন প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, ‘বিপিডিবির সৌরবিদ্যুতের এ প্রকল্পে কীভাবে অর্থায়ন হবে, প্রকল্পের কোথায় কীভাবে হিসাব প্রাক্কলন করা হয়েছে তা পিইসির সভায় জানতে চাওয়া হবে। সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় ও বিদ্যুৎ ক্রয়সংশ্লিষ্ট পূর্ব অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে। ফলে প্রকল্পে অতিরিক্ত কোনো ব্যয় ধরা হলে সেটা অবশ্যই আলোচনায় উঠে আসবে।’

সৌরবিদ্যুতের প্রকল্প প্রস্তাবে বিপিডিবির বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা ২ টাকা ৯৪ পয়সা। প্রকল্পটির ভায়াবল ট্যারিফ ৬ টাকা ৩৩ পয়সা। আর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন নির্ধারিত সেলিং রেট ধরা হয়েছে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা।

বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রামপালে বিপিডিবির অধিগ্রহণ করে রাখা জমিতে ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করা হবে। মূলত রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সেকেন্ড ফেজের জন্য এ জমি অধিগ্রহণ করা হয়। কিন্তু কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে পরিবেশগত ইস্যু তৈরি হলে এ জমিটি পড়ে থাকে। এখন বিপিডিবি নিজস্ব অর্থায়নে সেখানে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করবে।’

দেশে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বাড়াতে সরকার নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ওপর জোর দিয়েছে। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে সৌরবিদ্যুতে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে মোট ১০ হাজার মেগাওয়াট। এরই মধ্যে এ খাতের প্রসারে সৌরবিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ (যন্ত্রাংশ ও ব্যাটারি) আমদানিতে ২০৩১ সাল পর্যন্ত শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক এবং আগাম কর তুলে দিয়েছে সরকার।

আরও