দেশের বৃহৎ জলাভূমি চলনবিলের পানি অনেকটাই শুকিয়ে এসেছে। বিলের একটি অংশ পড়েছে সিরাজগঞ্জ জেলার মধ্যে। পানি নেমে যাওয়ার পর চলনবিলে ধরা পড়ে প্রচুর পরিমাণে দেশী প্রজাতির মাছ। বিলের নিচু জায়গা বা বড় খালগুলোয় শুরু হয়েছে মাছ ধরার উৎসব। ভেসাল, সুতিজাল, বেড়জাল, পলো দিয়ে মাছ ধরছেন জেলেরা। পাশেই বাঁশের ছাউনিতে বসানো হয়েছে শুঁটকির অস্থায়ী চাতাল। সেখানে মিঠাপানির মাছ থেকে শুঁটকি তৈরি হচ্ছে। চাহিদার সঙ্গে বাড়ছে এ অঞ্চলে শুঁটকির উৎপাদনও। তবে প্রত্যাশিত দাম পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ শুঁটকি উৎপাদনকারীদের।
ভোজনরসিক বাঙালির কাছে বেশ প্রিয় শুঁটকি। দেশজুড়ে খ্যাতিও রয়েছে চলনবিলের শুঁটকির। চলতি মৌসুমে এসব চাতাল থেকে ৩৫০ টন দেশী প্রজাতির মাছের শুঁটকি উৎপাদনের আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব শুঁটকির মধ্যে রয়েছে মলা, টাকি, বাইন, পাতাসি, আইকোর, চাঁদা, চেলা, শোল, পুঁটি, চিংড়ি, টেংরা, খলসে, বোয়াল, গজার, মাগুর, শিং, কৈসহ দেশী প্রজাতির মাছ। দেশের চাহিদা মিটিয়ে এসব শুঁটকি রফতানি হচ্ছে বিদেশেও। যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের কাছে শুঁটকির বিশেষ কদর রয়েছে।
মানভেদে ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ গ্রেডে বাছাই করা হয়। যার মধ্যে ‘এ’ গ্রেডের শুঁটকিই রফতানি করা হয়। এ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে জেলার প্রায় পাঁচ হাজার নারী-পুরুষ। সিরাজগঞ্জ-হাটিকুমরুল-বনপাড়া মহাসড়কের পাশে মহিষলুটি, মান্নান নগর, তাড়াশ উপজেলার মাগুড়া বিনোদ, নওগাঁ ইউনিয়ন, উল্লাপাড়া উপজেলার মোহনপুর-উধুনিয়া সড়কের পাশে এবং শাহজাদপুরের পোতাজিয়ায় গড়ে উঠেছে চলনবিলের সর্ববৃহৎ শুঁটকি চাতাল। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চাতালে কাজ করছেন শত শত শ্রমিক। রাস্তার পাশে মাচার ওপর শুঁটকির পসরা সাজিয়ে বিক্রিও করছেন কেউ কেউ।
তাড়াশ উপজেলার মান্নান নগর এলাকার শুঁটকি ব্যবসায়ী আবু সুফিয়ান জানান, আড়ত থেকে বিভিন্ন দামে মাছ কিনে তারা চাতালে নিয়ে আসেন। এরপর মাছ কেটে পরিষ্কার করে রোদে শুকানো হয়। শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশেও রফতানি করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা এসে শুঁটকি কিনে নিয়ে যান। অতিরিক্ত দাম দিয়ে মাছ কিনে শুঁটকি করতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ। তবে সে অনুপাতে বাজারে দাম মিলছে না।
মো. সাহেব আলী জানান, প্রতি বছরই এখানে চাতাল স্থাপন করা হয়। শোল মাছের শুঁটকির কেজি আকারভেদে ৮০০-১০০০ টাকা, পুঁটি ৩০০, টাকি ৩৫০, চেলা ৬০০, পাতাসি ৮০০, গুচি আকারভেদে ৭০০-১০০০, কাঁচকি ৭০০, বোয়াল ৮০০-১০০০ টাকা, মলা ৫০০ ও বাইন ১ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রক্রিয়াকরণে কোনো ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার না করায় স্বাদ অক্ষুণ্ন থাকে। তাই খুচরা ক্রেতারও অভাব হয় না। চলনবিল এলাকায় মাছ সংরক্ষণাগার থাকলে বর্ষার সময় ধরে রেখে শীতের শুরুতে শুঁটকি তৈরি করা যেত। একটি মাছ সংরক্ষণাগারই উন্মোচন করতে পারে চলনবিলের মাছকেন্দ্রিক অর্থনীতির নতুন দিগন্ত।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘চলতি মৌসুমে জেলায় ৩৪৫ টন শুঁটকি উৎপাদন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সঠিক উপায়ে উৎপাদন ও সংরক্ষণ করা গেলে সারা বছরই শুঁটকি বাজারজাত করা সম্ভব। চলনবিলের মিঠাপানির মাছ থেকে উৎপাদিত শুঁটকির গুণগত মান ভালো ও স্বাস্থ্যসম্মত।’