রাষ্ট্রগঠন ও হট্টগোলের সমাজ

১৯৭২ সালের ১৭ জানুয়ারি। বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ‘গ্রেট ম্যান অর র‌্যাবল রাউজার’ শিরোনামে। প্রতিবেদনের ভাষ্য, ‘আড়ম্বরপূর্ণ ভাষার বাইরে মুজিবের গভীরতা ঠিক কতটুকু, তা এখনো স্পষ্ট না।

১৯৭২ সালের ১৭ জানুয়ারি। বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ‘গ্রেট ম্যান অর র‌্যাবল রাউজার’ শিরোনামে। প্রতিবেদনের ভাষ্য, ‘আড়ম্বরপূর্ণ ভাষার বাইরে মুজিবের গভীরতা ঠিক কতটুকু, তা এখনো স্পষ্ট না। তার রাজনৈতিক সফলতার সিংহভাগই গড়ে উঠেছে পূর্ববঙ্গের সব সমস্যার দায় পশ্চিম পাকিস্তানের সাবেক শাসকগোষ্ঠীর কাঁধে চাপিয়ে জনমতকে পরিচালিত করার মাধ্যমে। অতি অঙ্গীকার আর জটিল অর্থনৈতিক ও কৃষি সমস্যার অতি সরলীকরণের প্রবণতা রয়েছে তার। পূর্ব পাকিস্তানের পাটচাষীদের সমাবেশে তিনি একবার বলেছেন, ভাইয়েরা আমার, আপনারা কি জানেন করাচির রাস্তা সোনা দিয়ে মোড়ানো? আর সেটা করা হয়েছে পাট রফতানির মাধ্যমে আয় করা আপনাদেরই পয়সায়।’

টাইম ম্যাগাজিন ‘র‌্যাবল রাউজার’ বিশেষণ ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ যিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জনসাধারণকে আবেগময় ভাষার মাধ্যমে উসকে দেন বা উত্তেজিত করেন। করাচির রাস্তা আসলেই স্বর্ণে মোড়ানো নাকি জনমতকে উসকে দেয়ার জন্য বলা, তা প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না। স্বাধীনতার পর বাকশালের প্রতিষ্ঠা ও তার রাজনৈতিক ব্যর্থতা যেন টাইম ম্যাগাজিনের সেই শিরোনামকে আরো প্রাসঙ্গিক করে তোলে। বাংলার রাজনীতির গত ১০০ বছরের ইতিহাস এ রকম পরিস্থিতি থেকে খুব একটা ভিন্নতর নয়। এখানকার স্বাধীনতা অর্জনের পূর্ববর্তী অন্য মহান নেতাদের সঙ্গেও অনায়াসে বসিয়ে দেয়া যায় এমন শিরোনাম। জনমতকে উসকে দিয়ে সবসময় রাজনৈতিক আন্দোলন ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এখানে। কিন্তু প্রতিবার আন্দোলনের পর মুখ থুবড়ে পড়েছে জনপ্রত্যাশা ও রাষ্ট্রগঠনের সম্ভাবনা। ফলে ফের তোড়জোড় শুরু হয়েছে নতুন কোনো বিশৃঙ্খলার।

অভ্যুত্থান ও বিপ্লবের পর সাধারণত দেশ শূন্য সময়ে পৌঁছে যায়। সুযোগ তৈরি হয় নৈর্ব্যক্তিকভাবে দেশ ও জাতি গঠনে কাজ করা। নেতৃত্বে এমন মানুষ আসার, যারা নিজের বা দলের স্বার্থের বাইরে গিয়ে দেশের স্বার্থ দেখবেন। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় ১৯৪৭, ১৯৭১ ও ১৯৯০-এ বড় বড় বাঁক বদলানো রাজনৈতিক ঘটনার পরও নেতারা রাষ্ট্রগঠনের দিকে না তাকিয়ে দলীয়করণের দিকে পা বাড়িয়েছেন। ফলে রাষ্ট্র সংস্কার বা মেরামত দিন শেষে রাজনৈতিক স্বার্থ মজবুত করার প্রয়াসে পর্যবসিত হয়েছে। সংস্কারহীন রাষ্ট্রে নতুন করে দাঁড়িয়েছে দলীয় ফ্যাসিবাদী শক্তি; নতুন করে প্রয়োজন পড়েছে অভ্যুত্থান ও রক্ত দেয়ার। যেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়া আটকে গেছে একটা দুষ্টচক্রে। অথচ কোনো দেশকে উঠে দাঁড়ানোর জন্য কৃষি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার উন্নয়ন দরকার। দরকার স্বাধীন বিচার বিভাগ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন। বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান দেশে এখনো কৃষি পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ। জনপরিসরে সে অর্থে আস্থা অর্জন করতে পারেনি অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। শিক্ষার অগ্রগতি কেবল পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন পর্যন্তই। শিল্প পরিস্থিতিও স্থায়ী নয়। উদাহরণস্বরূপ, তৈরি পোশাক শিল্পের কথাই ধরা যাক। দেশের রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশ এ খাত থেকে আসে। অথচ এ খাত কেবল শ্রমনির্ভর। বৈশ্বিক দক্ষতার বিচারে এদেশের গার্মেন্ট কর্মীদের অবস্থান অনেক নিম্নস্তরে। তাই বিপুলসংখ্যক কর্মী নিয়ে আমাদের রফতানি আয়ের আকার ছোট। এ কারণে এদেশে শ্রমিকের মজুরিও কম। গার্মেন্ট খাতের কাঁচামালের জন্য নির্ভর করতে হয় আমদানির ওপর। বাংলাদেশে প্রকৃত শিল্পায়ন বলতে যা বোঝায় তা এখনো হয়নি। বিশেষত ভারী শিল্পে দেশ অনেক পিছিয়ে। বড় ও ভারী শিল্পের রূপান্তর এখনো এদেশে হয়নি। অন্যদিকে প্রবাসীরা যে রেমিট্যান্স পাঠান, সেটাও দাঁড়িয়ে আছে সস্তা শ্রমের ওপর। যে পরিমাণ কর্মী বিদেশে কাজ করছেন তার তুলনায় আমাদের রেমিট্যান্স আয় কম, কারণ তাদের অনেকেই প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে নিম্ন মজুরিতে কাজ করেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সম্প্রসারণের এ যুগে সস্তা শ্রম বিক্রির ওপর ভরসা করা নিশ্চয়ই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। দেশে প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমবাজার বেশি ছোট আকারের, এখনো বেশির ভাগ মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। রাষ্ট্রগঠনের জন্য যে শক্তিশালী পদক্ষেপ দরকার, বঙ্গীয় বদ্বীপ ঔপনিবেশিক রাহুমুক্তির সাত দশক অতিক্রম করে ফেললেও তার স্থায়ী রূপকল্প তৈরি হয়নি। বরং সমাজে তৈরি হয়েছে একের পর এক হট্টগোল।

এমন নয় যে ১৯৪৭ সালের পর রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সংস্কারমূলক কোনো পদক্ষেপ কখনো নেয়া হয়নি। পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান সরকার কৃষির ক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার হাতে নেয়। তার নির্দেশনা ছিল কোনো ফার্মই ১২ দশমিক ৫ একরের ছোট কিংবা ৫০০ একরের বড় হতে পারবে না। এর ফলে ছোট খামারিরা যৌথ খামার গড়ে তুলল আর বড় খামারিরা ভূমির পুনর্বণ্টন করল। ফলে উভয় ক্ষেত্রেই উৎপাদনক্ষমতা বেড়েছে। নতুন স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা ও টেক্সট বুক নীতির মধ্য দিয়ে শিক্ষার যে পরিবর্তন শুরু হয়, তার প্রভাবও ছিল প্রশংসনীয়।এসব উদ্যোগ সে সময় এদেশে নতুন এক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ ঘটিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এ মধ্যবিত্তের নেতৃত্বেই আইয়ুব খানের পতন ঘটে। এর পর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর শেখ মুজিবুর রহমান নতুন রাষ্ট্রটিকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে ব্যর্থ হন। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে জ্বালানি স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট সত্ত্বেও তখন বিদেশীদের কাছ থেকে পাঁচটি গ্যাস ক্ষেত্র কিনে তিনি জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত্তি রচনা করেছিলেন। পেট্রোবাংলা প্রতিষ্ঠা, পেট্রোলিয়াম অ্যাক্ট, যুক্তরাষ্ট্রের ‘এসো ইস্টার্ন’ সরকারিভাবে গ্রহণ তেল ও গ্যাস খাতের বিকাশ সুগম করে। ক্ষমতায় আসার পর জিয়াউর রহমান বুঝেছিলেন, দেশের অভ্যন্তরে সবার কর্মসংস্থান করা সম্ভব নয়। ফলে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক পাঠানো ও তরুণদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার ব্যাপারে তৎপর হন, সফলতাও পান। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচির মতো পদক্ষেপগুলোও ছিল সুদূরপ্রসারী। তিনি যে গ্রাম সরকার ও গ্রামীণ অর্থনীতি নিয়ে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলেন, তা আশাজাগানিয়া ছিল জাতির জন্য। এরশাদের আমলে গ্রাম সরকার গঠন ও ঔষধনীতি পরবর্তী সময়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল দেশের আইন ও স্বাস্থ্য খাতে। তবে এ সবই ছিল বিচ্ছিন্ন প্রয়াস। সামগ্রিকভাবে দেশের রাষ্ট্রকাঠামোর স্থায়ী ভিত তৈরিতে নির্ভরযোগ্য কোনো পাটাতন তৈরি হয়নি।

১৯৪৭ সালে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি মেলে এদেশের মানুষের। সেই আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। কিন্তু পাকিস্তান হাসিল হওয়ার অন্তত এক দশক আগে থেকেই তারা বাংলার রাজনৈতিক নীতিনির্ধারক হিসেবে হাজির ছিলেন। পাকিস্তান আন্দোলন বেগবান করতে প্রচারণা করেছেন তারাই। কিন্তু পাকিস্তান হাসিল হওয়ার পর থেকেই দেখা গেল রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মধ্যে প্রবেশ করেছে রাষ্ট্রগঠনের সব সমীকরণ। পঞ্চাশের দশকে যে অস্থিরতা ছিল তা ষাটের দশকে কমেনি। বরং প্রবেশ করতে হয় নতুন অস্থিরতার মধ্যে। পাকিস্তানি নেতারাও যোগ্যতার চেয়ে প্রাধান্য দিতে লাগলেন বিশেষ আদর্শকে। ফলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিক সেজে বসল অদক্ষ লোক। ঠিক একই ঘটনা দেখা যায় একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর। দুই দশকের রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। কিন্তু তারপর সামগ্রিকভাবে জাতি গঠনের দিকে না ঝুঁকে নতুন করে ক্ষমতা ও আধিপত্য নিয়ে শুরু হয় রেষারেষি। জাতি ও রাষ্ট্রের অবকাঠামো তৈরির বিপরীতে প্রাধান্য পায় আদর্শিক দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতা। উদাহরণ হিসেবে, সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশে শুরু হয় সিরাজুল আলম খান ও শেখ ফজলুল হক মণির দ্বন্দ্ব, দেশ হাঁটতে থাকে বিপর্যয়ের পথে। সেই দ্বন্দ্ব কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়ে আটকে থাকেনি, ছড়িয়ে গেছে তাদের সমর্থক ও অনুসারীদের মধ্যে। সংঘাত স্থায়ী রূপ লাভ করে ১৯৭২ সালে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল নির্বাচনে সিরাজ গ্রুপের পরাজয় দিয়ে। মুখোমুখি আসে মুজিববাদ ও মুজিববাদবিরোধী গ্রুপ। শেখ মুজিবুর রহমান শেখ মণিকে সমর্থন দিলে আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে শেখ মণি গ্রুপ। এমন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেই জন্ম নেয় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল নামের রাজনৈতিক সংগঠন। সত্তরের দশকের অস্থির রাজনীতিতে জাসদ ছিল অন্যতম অনুঘটক। স্বাধীনতার পর যে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিকীকরণের ঘটনা ঘটে, তার অন্যতম পরিণাম ছিল ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ। কেবল যুক্তরাষ্ট্রের অসহযোগিতা কিংবা ব্যবসায়ী শ্রেণীর মজুদ দায়ী ছিল না; দায়ী ছিল খাদ্য মন্ত্রণালয়ের রক্ষণশীলতাও। রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর দিকে না তাকিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোয় অদক্ষ লোককে বসিয়ে দেয়া হলে তা বিপজ্জনক ফল নিয়ে আসে। রাজনৈতিকীকরণের সেই প্রক্রিয়া স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবকে টেনে নিয়েছিল বাকশালের দিকে।

স্বাধীনতার পর বড় একটা প্রশ্ন দেখা দেয়, সেটা হলো মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের সশস্ত্র বাহিনী ও প্রশাসনে অন্তর্ভুক্তি। বিষয়টি সামনে এনেছিলেন ভারতের সাবেক প্রভাবশালী আমলা এবং দেশটির নিরাপত্তা ও বিদেশনীতির অন্যতম রূপকার কৃষ্ণস্বামী সুব্রামানিয়াম। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তার ভাষ্য ছিল, মুক্তিবাহিনীর জন্ম সামরিকতন্ত্রে ইতি টানার জন্য। সে লক্ষ্য পূরণ হওয়ার পর এর বিলুপ্ত হওয়াই সমীচীন ছিল। যেন অন্য কেউ এর গৌরবকে ব্যবহার করে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে না পারে। মুক্তিবাহিনীর নাম ও বৈধতাকে ব্যবহার করে ফের সামরিকতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে না পারে। মুক্তিবাহিনী আদর্শিক জায়গা থেকে সংগ্রামে নেমেছিলেন; আর সেনাবাহিনীর দায়িত্ব হয় স্তরভিত্তিক সুষমবণ্টিত। দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। মুক্তিবাহিনীকে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা কিংবা সামরিক বাহিনীতে হস্তক্ষেপ জটিলতা তৈরি করবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন সুব্রামানিয়াম। বাস্তবিক অর্থে সেটাই ঘটেছে। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রে মুক্তিবাহিনীর পরবর্তী অবস্থান ও কার্যক্রম বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছিল সরকারের জন্য। সেনা অসন্তোষ তৈরি ও পরবর্তী বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। ডাচ সাংবাদিক ও গবেষক পিটার কাস্টার্স সেই উত্তাল সময়ে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। তার দাবি, জুনিয়র আর্মি অফিসারদের ক্যুর কারণে সপরিবারে নিহত হন শেখ মুজিবুর রহমান। কারণ তিনি স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু সত্যিকার অর্থে মুজিব হত্যার মধ্য দিয়ে জুনিয়র অফিসারদের শাসনও কি স্থায়ী সমাধান টানতে পেরেছিল? তার জবাব হিসেবেই নভেম্বরের ৩ তারিখে শুরু হয় আরেক দফা ক্যু। পিটার কাস্টার্সের ভাষায়, ‘১৯৭৫ সালের প্রথম ও দ্বিতীয় ক্যুর কোনোটাই সামাজিক মুক্তি থেকে অনুপ্রাণিত হয়নি।’ এজন্যই ৭ নভেম্বর কর্নেল তাহেরের নাম সামনে আসে। ব্রিটিশবিরোধী সিপাহি বিদ্রোহ, বলশেভিক বিপ্লব, ভেলভেট বিপ্লব থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন তিনি। মানুষকে মুগ্ধ করার ক্ষমতা ছিল তার। কিন্তু তিনি সেনাবাহিনীতে সমাজতন্ত্রের আদর্শ ছড়িয়ে দিতে লাগলেন। এটা অনিবার্যভাবে পরিস্থিতিকে নেতিবাচক দিকে নিয়ে গেছে। ৭ নভেম্বর সিপাহি জনতার বিদ্রোহ হলো, প্রত্যাশা মানুষের জন্য মুক্তি নিয়ে আসা। কিন্তু সামাজিক মুক্তি কি সত্যিই মিলেছে?

১৯৪৭ সালের আগে বাঙালি বুর্জোয়া শ্রেণীর অনুপস্থিতি দেখা যায়। ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত মূলত মাড়োয়ারি হিন্দুরা। দেশভাগের পর অর্থনীতির চাকা দখল করে অবাঙালি মুসলমান। ১৯৭১ সালে কি অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটেছে? বরং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিকীকরণ করা হয়েছে, তার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রগঠনের চেয়ে প্রাধান্য পেয়েছে নিজের কিংবা দলীয় স্বার্থ। অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান তার বুর্জোয়া রাষ্ট্রব্যবস্থার সংকট গ্রন্থে দেখিয়েছেন বাংলাদেশের অর্থনীতির সংকট। ১৯৭৬ সালের দিকে একটি পুঁজিপতি শ্রেণী সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারের নীতি হিসেবে বাছবিচারহীনভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি সরবরাহ করা শুরু হয়। বুর্জোয়া শ্রেণীর অবিকশিত চরিত্র, ঋণ বণ্টনে রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় দুর্নীতির ফলে বণ্টিত ঋণ খেলাপি ঋণে পরিণত হয়। পরিণামে উন্নয়নে সহায়তাকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো হয়েছে বিধ্বস্ত। এ খেলাপি সংস্কৃতি ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় সংক্রমিত হয়েছে। জিয়াউর রহমান, এরশাদ, খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলেও ব্যাংক লুণ্ঠনের কোনো সুরাহা হয়নি। অথচ আধুনিক রাষ্ট্র সংস্কারের পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব রাষ্ট্রের পুঁজির সুরক্ষা দিতে পারা এবং লুণ্ঠন প্রতিহত করা।

১৯৯০ সালের অভ্যুত্থান বাংলাদেশের সামনে নতুন সুযোগ নিয়ে এসেছিল। সেনাশাসক এরশাদের পদত্যাগ ও গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন তীব্র হতে থাকে। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার প্রচারণায় তখন ভারতীয় আধিপত্যের বিপরীতে বাংলার সার্বভৌমত্ব এবং বিশেষ করে গঙ্গার পানি বণ্টনকে আলোচনায় আনেন; শেখ হাসিনা সামনে আনেন সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা। ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। এ সময় অর্থনীতি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে মুক্তবাজারে প্রবেশ করতে শুরু করে। এর ফলে একদিকে অনেক অযৌক্তিক বিরাষ্ট্রীয়করণ হয়েছে। অন্যদিকে অনেক ছোট উদ্যোক্তা বড় উদ্যোক্তায় পরিণত হন। অন্যদিকে গড়ে ওঠে লাখ লাখ ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা। দেশের শেয়ারবাজারে ছোট, বড়, মাঝারি মিলে কয়েক লাখ সক্রিয় বিনিয়োগকারী যুক্ত হন। পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা শ্রেণীও দ্রুত বিকশিত হয়। কিন্তু রাষ্ট্রগঠনের মৌল কাঠামোয় সংস্কার আসেনি। ২০০৭-০৮ সালে আবারো অনিশ্চয়তা। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুই বছরের শাসনকালে রাষ্ট্রের কাঠামোতে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারেনি। ফলে নির্বাচনের পর নতুন যে সরকার আসে তারা দেড় দশক ধরে একটি ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা কায়েম করে। গত দেড় দশকে নির্বাচন কমিশন বলে কিছু তৈরি হয়নি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ছিল শূন্যে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা তথৈবচ। বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা এবং চাকরির পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসও নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নিয়োগ, বদলিসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনুমোদনের ক্ষেত্রে ঘুস ও অবৈধ আর্থিক লেনদেনের আখ্যান তো রয়েছেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী শিক্ষকরা উচ্চশিক্ষার মান ও কার্যক্রমকে বিপর্যস্ত করেছেন। প্রাথমিক স্তরে দেশে ৮-৯ ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত। শিক্ষার্থীরা সাধারণ জ্ঞান, গণিত, ইংরেজি ও ভাষা দক্ষতায় দুর্বল। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা পাস করে বের হচ্ছেন তাদের অনেকে উপযুক্ত দক্ষতার অভাবে বেকার থাকছেন। বিগত সরকার একদিকে যেমন লুটপাটে ব্যস্ত ছিল, অন্যদিকে তারা দেশের মানব সম্পদকে অপচয় করেছে। দেশে চিকিৎসাপ্রত্যাশীদের বড় অংশ বিদেশমুখী। দেশের পাসপোর্ট পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্বল পাসপোর্টের তালিকায়। বিপুল অংকে তৈরি মেগা প্রকল্পে ঘটে মেগা দুর্নীতি, যার বেশির ভাগই এখন আর্থিক বোঝা তৈরি করেছে। এর বাইরে বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং ব্যাংক খাতে লুণ্ঠন ও দুর্নীতির মতো কেলেঙ্কারি তো আছেই। অথচ আওয়ামী লীগ তার গত ৭৬ বছরের ইতিহাসে যখনই আন্দোলন ও বিরোধী দলে ছিল, নানা রকম অধিকার ও সামাজিক ন্যায্যতার প্রসঙ্গকে সামনে এনেছে।

আন্দোলনে তৎপর থাকার পরও আমাদের রাষ্ট্রের অভিভাবকরা কেন দায়িত্ব পাওয়ার পর নিজেদের ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে পারেন না, সেটা আলাদাভাবে গবেষণার বিষয়বস্তু হতে পারে। আর এ কারণেই গত ১০০ বছরে বহু নেতৃত্ব এসে চলে গেলেও প্রান্তিক যে মানুষগুলো তিনবেলা খাবার পেলেই সন্তুষ্ট; সরকারপ্রধান, রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রকাঠামো তাদের সে প্রত্যাশাকে অবলীলায় ভুলে যায়।

জার্মান গবেষক ও রাজনীতিবিদ জয় অ্যাসোনগেজোহ অ্যালমেজাং আফ্রিকার রাজনীতি নিয়ে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে দেখিয়েছেন, কীভাবে সেখানকার নেতৃত্বের ত্রুটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও সরকার পরিচালনার জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে ব্যক্তিগত স্বার্থকে একপাশে সরিয়ে রাখার মাধ্যমেই মানুষ নেতৃত্বের ত্রুটি অনেকটা কমিয়ে আনতে পারে। এক্ষেত্রে পরস্পরের মধ্যে সমঝোতা করতে হয়। সরকার যখন বিশেষ সুবিধার মধ্য দিয়ে সমর্থক তৈরি করে তখন সামাজিক মুক্তি থমকে যায়। জনমুক্তি আটকে পড়ে যায় আমলাতন্ত্রের শেকলে। তৃতীয় বিশ্বের জন্য দুর্নীতিগ্রস্ত নেতৃত্বের পাশাপাশি এ বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত তোষামুদে শ্রেণীর দৌরাত্ম্যও নেতিবাচকভাবে প্রভাব ফেলে গণতান্ত্রিক অবকাঠামোকে ধ্বংস করতে, প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে দিতে। তৃতীয় বিশ্বের আরেকটা সংকট হলো নেতৃত্বকে পারিবারিক ওয়ারিশে রূপদান। যোগ্যতার চেয়ে যখন পারিবারিক সম্পর্ক প্রাধান্য পেতে শুরু করে তখন ত্রুটিগ্রস্ত নেতৃত্ব সামনে থাকা খুবই স্বাভাবিক। সাতচল্লিশের পর থেকেই নেতারা ক্ষমতায় আসার পর তাদের নেতৃত্বকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য সংবিধানকে ইচ্ছামতো ব্যবহার করেছেন। সেক্ষেত্রে জাতীয় অগ্রগতি ও সামাজিক মুক্তির চেয়ে প্রাধান্য পেয়েছে তাদের নিজস্ব ক্ষমতা।

প্রতিটি আন্দোলন হয় মূলত বহুপক্ষের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায়। সব পক্ষকেই ছাড় দেয়ার মানসিকতা নিয়েই জাতির পুনর্গঠন সম্ভব। নিজের কথাই শেষ কথা কিংবা কথায় কথায় আলটিমেটাম দিয়ে দেশ পরিচালনা করা কঠিন। এ কথা সত্য যে আন্দোলনে কোনো একপক্ষের অংশীদারত্ব অন্য পক্ষের চেয়ে কম বা বেশি থাকতে পারে। কিন্তু সেটাকে পুঁজি করে কারো ইচ্ছাকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখা এবং কারো প্রস্তাবকে বাতিল করার প্রবণতা হলে তার পরিণতি সেখানেই নিয়ে যাবে, গত দেড় দশক জাতি যেখানে বন্দি ছিল। ফ্যাসিবাদ রাজনৈতিকভাবে দৃশ্যমান হওয়ার আগে সামাজিকভাবে বিরাজ করে। আমার কথাই সর্বশেষ—এ ধরনের মনোবৃত্তি ফ্যাসিবাদের পাটাতন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক দেশ আজকের দিনে ধনী, উন্নত দেশের তালিকায় নাম লিখিয়েছে। ১৯৫০ সালে পৃথিবীতে একজন মানুষের গড় আয় ছিল ৩ হাজার ৩০০ ডলার। ২০২১ সালের হিসাবে তা বেড়ে হয়েছে ২৩ হাজার ৩৮০ ডলার। আর ধনী দেশগুলোর ক্ষেত্রে এ আয় প্রায় ৫০ হাজার ডলার। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে বাংলাদেশে মানুষের মাথাপিছু বর্তমান আয় সেই ১৯৫০ সালের পৃথিবীতে একজন মানুষের গড় আয়ের চেয়ে কম। বিশ্বে অর্থনীতির অগ্রগতির উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দক্ষিণ কোরিয়া। দেশটি ১৯৫০-এর দশকের তুলনায় আজ ৩২ গুণ ধনী রাষ্ট্র। আয়ের বিবেচনায় তারা আজ উন্নত রাষ্ট্র। এক্ষেত্রে নাম আসে চীনেরও। বিরাট ভূখণ্ড ও জনসংখ্যার দেশটি ১৯৫০ সালের তুলনায় নিজেদের আজ ১৬ গুণ বেশি ধনী রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। এ পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে রাষ্ট্র তথা তার অর্থনীতিকে বদলে দেয়ার আন্তরিক আকাঙ্ক্ষা থেকে। রাজনৈতিক হানাহানির পরিবর্তে তারা দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। দেশের অভ্যন্তরীণ পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও রফতানিতে মনোযোগ দিয়ে দ্রুত তারা দেশের অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছে। এজন্য তারা মানব ও খনিজ সম্পদকে কাজে লাগানোয় গুরুত্ব দিয়েছে। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে। শক্তিশালী অর্থনীতি ও মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের নিশ্চয়তা না থাকলে ঐক্যবদ্ধ, শান্তিপূর্ণ সমাজ-রাষ্ট্র নির্মাণ সম্ভব নয়।

পাকিস্তান আমলে এদেশের মানুষ ক্ষমতা ও সম্পদের কেন্দ্রীভবনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। সেই সংগ্রামে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রদর্শনে মোটাদাগে অনুসৃত হয়েছে সেই পাকিস্তানের শাসকদের নীতি। ক্ষমতা ও সম্পদের কেন্দ্রীভবন বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নে বিরাট অন্তরায় সৃষ্টি করেছে। ব্যাপকভিত্তিক উন্নয়নের পরিবর্তে ‘আমার ও আমার ঘনিষ্ঠ সহচরদের ব্যবস্থা’ গড়ে উঠেছে। আবার দুই বেলা দুই মুঠো খেয়ে বেঁচে থাকা সন্তুষ্ট ৯০ শতাংশ সাধারণ জীবনের পাশে হঠাৎ গড়ে ওঠা উপকরণবহুল ঐশ্বর্য ও বিলাসের অট্টালিকা সমাজের শৃঙ্খলাকে ভেঙে ফেলছে। হিংসা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ভবিষ্যতের পথে উৎকণ্ঠা ও অনিরাপত্তা সৃষ্টি করেছে। এ রকম চলতে থাকলে আবারো একবার বাংলাদেশ সম্ভাবনার অপমৃত্যু দেখতে পারে এবং সঠিক পথের যাত্রায় হোঁচট খেতে পারে। যদিও ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের বড় অনুপ্রেরণা হলো নতুন বাংলাদেশ; ‘আমার ও আমার ঘনিষ্ঠ সহচরদের দেশ’ না।

দেওয়ান হানিফ মাহমুদ: সম্পাদক, বণিক বার্তা

[লেখাটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন আহমেদ দীন রুমি]

আরও