আন্তর্জাতিক বাজারদর যাচাইয়ের সাবস্ক্রিপশন নেই চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের

চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মূল্য তথ্য প্লাটফর্মের বৈধ সাবস্ক্রিপশন থাকা আমদানিকারকরা সংশ্লিষ্ট মূল্য তথ্য বা রেফারেন্স উপস্থাপন করলে কাস্টমস তা বিবেচনায় নিতে পারে।

বছরে ৮১ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আয় করে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ও স্বীকৃত তথ্যভাণ্ডারগুলোতে নিজস্ব সাবস্ক্রিপশন নেই সংস্থাটির। ফলে আমদানিকারকদের পণ্য চালানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বাজারদর সরাসরি যাচাই করে শুল্কায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে আমদানিকারকের ঘোষিত মূল্য ও কাস্টমসের নির্ধারিত মূল্যের মধ্যে পার্থক্য দেখা দিলে সেই ব্যবধান যাচাইয়ে তথ্যপ্রাপ্তির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, যেসব পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য যাচাইয়ের নির্ভরযোগ্য ও স্বীকৃত তথ্যসূত্র রয়েছে, সেসব উৎসের মূল্য বিবেচনায় নিয়ে শুল্কায়ন করা হয়। এক্ষেত্রে প্ল্যাটসের পাশাপাশি লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জ (এলএমই), সাংহাই মেটালস মার্কেট (এসএমএম) ও আইসিআইএসের মতো আন্তর্জাতিক মূল্য তথ্য প্লাটফর্মগুলোকে গুরুত্ব দেয়া হয়। তবে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের নিজস্ব সাবস্ক্রিপশন না থাকায় এসব প্লাটফর্মে প্রকাশিত মূল্য সরাসরি যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক মূল্য তথ্য প্লাটফর্মের বৈধ সাবস্ক্রিপশন থাকা আমদানিকারকরা সেখান থেকে প্রাপ্ত মূল্য তথ্য বা রেফারেন্স উপস্থাপন করলে তা পণ্য চালানের শুল্কায়নে বিবেচনায় নেয়া সম্ভব হয়। কিন্তু যেসব আমদানিকারক এ ধরনের মূল্য তথ্য বা রেফারেন্স উপস্থাপন করতে পারেন না, তাদের ক্ষেত্রে কাস্টমসের নিজস্ব সাবস্ক্রিপশন না থাকায় সংশ্লিষ্ট প্লাটফর্মে প্রদর্শিত মূল্য সরাসরি যাচাই করে শুল্কায়নে ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারদর যাচাইয়ের সুযোগে আমদানিকারকভেদে পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে কমার্শিয়াল আমদানিকারকদের পণ্য চালানের শুল্কায়নে এ সীমাবদ্ধতার কারণে বেশ জটিলতা তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, বছরের পর বছর আদালতে ঝুলে থাকা মামলার কারণে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আটকে রয়েছে। এসব মামলার উল্লেখযোগ্যসংখ্যকই সরাসরি মূল্য বিরোধ-সংক্রান্ত। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে ১০ হাজার মামলার বিপরীতে আটকে আছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। এর মধ্যে শুধু হাইকোর্টেই গেছে নয় হাজারের বেশি মামলা। এছাড়া কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিল ট্রাইব্যুনালে আছে আরো সাড়ে ৮০০ মামলা।

চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মূল্য তথ্য প্লাটফর্মের বৈধ সাবস্ক্রিপশন থাকা আমদানিকারকরা সংশ্লিষ্ট মূল্য তথ্য বা রেফারেন্স উপস্থাপন করলে কাস্টমস তা বিবেচনায় নিতে পারে। কিন্তু কাস্টম হাউজের নিজস্ব সাবস্ক্রিপশন না থাকায় কোনো আমদানিকারক এসব তথ্য উপস্থাপন করতে না পারলে সংশ্লিষ্ট পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারদর সরাসরি যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে কমার্শিয়াল আমদানিকারকদের পণ্য চালানের শুল্কায়নে প্রাসঙ্গিক আন্তর্জাতিক মূল্য তথ্য ব্যবহার করতে না পারায় জটিলতা বেশি তৈরি হচ্ছে।

সীকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রায়ই আমদানি পণ্যের ইনভয়েসে ঘোষিত মূল্যের চেয়ে বেশি মূল্য ধরে শুল্কায়ন করা হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, কোনো পণ্যের প্রকৃত ক্রয়মূল্য ও ইনভয়েসে ঘোষিত মূল্য টনপ্রতি ৮০০ মার্কিন ডলার হলেও কাস্টম হাউজ সেটির শুল্কায়ন করছে ১ হাজার ডলারেরও বেশি মূল্যে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন বাণিজ্যিক আমদানিকারকরা। যে সংস্থা বছরে ৮১ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আহরণ করে সরকারের কোষাগারে জমা দিচ্ছে, সেই সংস্থায় শুল্কায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহারের জন্য কেন আন্তর্জাতিক মূল্য তথ্যভাণ্ডারের বৈধ সাবস্ক্রিপশন থাকবে না, তা আমাদের বোধগম্য নয়। আমরা আশা করি, এনবিআর দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মূল্য তথ্যভাণ্ডারের সাবস্ক্রিপশন নিশ্চিত করবে। এতে পণ্যের প্রকৃত মূল্য যাচাই সহজ হবে এবং শুল্কায়নে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।’

এনবিআরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পণ্যের শুল্কায়নে ইনভয়েসে ঘোষিত মূল্য ও আন্তর্জাতিক বাজারদরের মধ্যে পার্থক্য থাকলে তা কীভাবে যাচাই করা হবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রচলিত নীতি অনুযায়ী আমদানি পণ্যের শুল্কায়নের প্রাথমিক ভিত্তি হলো লেনদেনমূল্য। অর্থাৎ পণ্য কেনার জন্য প্রকৃতপক্ষে যে মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে বা করার কথা, সেটিই শুল্কায়নের প্রধান ভিত্তি। তবে ঘোষিত মূল্য নিয়ে যুক্তিসংগত সন্দেহ দেখা দিলে বা নির্ধারিত শর্ত পূরণ না হলে বিধিবদ্ধ বিকল্প পদ্ধতিতে শুল্ক মূল্য নির্ধারণের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ কাস্টমস প্রকাশিত শুল্ক মূল্যায়নবিষয়ক নির্দেশনায়ও লেনদেনমূল্যকে প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ভিত্তিতে শুল্কায়ন সম্ভব না হলে একই ধরনের বা সদৃশ পণ্যের লেনদেনমূল্যসহ পর্যায়ক্রমে নির্ধারিত বিকল্প পদ্ধতি অনুসরণের বিধান রয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক মূল্য তথ্য প্লাটফর্মে প্রকাশিত দর শুল্কায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হলেও তা সব ক্ষেত্রে ইনভয়েসে ঘোষিত মূল্যকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিস্থাপনের ভিত্তি নয়। পণ্যের ধরন, গুণগত মান, বাণিজ্যিক পর্যায়, সরবরাহের শর্ত ও প্রাসঙ্গিক অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নিয়ে মূল্য যাচাই করা প্রয়োজন।’

ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘বিশেষ করে বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে কাস্টমসের নিজস্ব আন্তর্জাতিক মূল্য তথ্যভাণ্ডারে প্রবেশাধিকার থাকলে মূল্য যাচাইয়ের জন্য আমদানিকারকের সরবরাহ করা তথ্যের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে শুল্ক নির্ধারণে স্বচ্ছতা ও সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।’

কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের রাজস্ব আয় ৮১ হাজার ৪৭১ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। পাঁচ বছর আগে ২০২০-২১ অর্থবছরে সংস্থাটির রাজস্ব আয় ছিল ৫১ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। এত বড় রাজস্ব আহরণকারী প্রতিষ্ঠানের শুল্কায়ন কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক মূল্য তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা নিশ্চিত করা গেলে তা রাজস্ব সুরক্ষার পাশাপাশি আমদানিকারকদের সঙ্গে মূল্যায়নসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতেও সহায়ক হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্মকর্তারাও মনে করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যেসব পণ্যের দাম নিয়মিত ওঠানামা করে, সেসব পণ্যের আমদানি মূল্য যাচাইয়ে নির্ভরযোগ্য মূল্য তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্ল্যাটস, এলএমই, এসএমএম ও আইসিআইএসের মতো প্লাটফর্মে বিভিন্ন পণ্যের বাজারদর ও মূল্যপ্রবণতার তথ্য পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে এসব তথ্য ব্যবহার করা গেলে ঘোষিত মূল্য যাচাই, অস্বাভাবিক মূল্য ঘোষণার ঝুঁকি শনাক্ত এবং শুল্ক মূল্যায়নের সিদ্ধান্তের পক্ষে তথ্যভিত্তিক যুক্তি উপস্থাপনের সুযোগ বাড়বে।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের মুখপাত্র শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কোনো পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য যাচাইয়ের নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র থাকলে সেসব উৎসের তথ্য বিবেচনায় নিয়ে শুল্কায়নের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে প্ল্যাটসের পাশাপাশি এলএমই, এসএমএম ও আইসিআইএসের মতো আন্তর্জাতিক মূল্য তথ্য প্লাটফর্মের তথ্য বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য যাচাইয়ের নির্ভরযোগ্য প্লাটফর্মগুলোতে কাস্টমস হাউজের নিজস্ব ব্যবহারকারী পরিচিতি ও সাবস্ক্রিপশন নেই। এসব প্লাটফর্মে প্রবেশাধিকার থাকলে শুল্কায়ন কর্মকর্তা ও আমদানিকারকদের মধ্যে মূল্য নির্ধারণ নিয়ে বিরোধ কমে আসবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমানে মূল্য নিয়ে মতপার্থক্য তৈরি হলে অনেক ক্ষেত্রেই চালান অ্যাসেসমেন্ট কমিটিতে পাঠাতে হয়। এতে শুল্কায়ন প্রক্রিয়ায় জটিলতা বাড়ে এবং অনিষ্পন্ন বিল অব এন্ট্রির সংখ্যাও বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মূল্য তথ্য প্লাটফর্মে কাস্টমসের নিজস্ব বৈধ প্রবেশাধিকার থাকলে সংশ্লিষ্ট বাজারদরের ভিত্তিতে মূল্য যাচাই করা সহজ হবে। একই তথ্যসূত্র কাস্টমস ও আমদানিকারক উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড হিসেবে কাজ করতে পারে।’

আরও