লোকোমোটিভ মেরামত ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা সংকটে ফেলেছে রাষ্ট্রায়ত্ত সর্ববৃহৎ গণপরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ রেলওয়েকে। রেলওয়ের অক্টোবরের নথিপত্র অনুযায়ী সংস্থাটির পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চল মিলিয়ে লোকোমোটিভের মজুদ ২৭০টি। এর মধ্যে চলাচল উপযোগী ১৮৩টি, অচল ৮৭টি। অর্থাৎ প্রকৃত মজুদের প্রায় ৩২ দশমিক ২২ শতাংশই চলাচলের বাইরে রয়েছে।
লোকোমোটিভের মধ্যে ৫৩টি ওয়ার্কশপে মেরামতাধীন থাকলেও ৩২টি দীর্ঘদিন ধরে ওয়ার্কশপে পাঠানোর অপেক্ষায় এবং দুটি শেডে মেরামতাধীন রয়েছে। এর মধ্যে অনেক লোকোমোটিভ মেরামতের জন্য দেয়া হলেও সাড়ে সাত বছরেও সচল করতে পারেনি রেলের যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগ। বাংলাদেশ রেলওয়ের মতো শতভাগ প্রকৌশল সুবিধাসম্পন্ন একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের এ ব্যর্থতা রেলের সেবার মানকে অস্বাভাবিক হারে কমিয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি অদূরদর্শিতায় তীব্র সংকটের পর বিদ্যমান লোকোমোটিভগুলো মেরামতে সময়মতো যন্ত্রাংশের অভাব, অদক্ষ ও স্বল্প জনবল, অনিয়মের কারণে পুরো রেল ব্যবস্থাপনাকে নাজুক করে তুলেছে। শুধু লোকোমোটিভের অভাবে কাঙ্ক্ষিত সেবার মান কমতে কমতে অর্ধেকে নেমে এসেছে বাংলাদেশ রেলওয়ের।
রেলওয়ের তথ্যমতে, দীর্ঘদিন ধরে রেলের যন্ত্রাংশ আমদানি অস্বাভাবিক কমেছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে সংগ্রহ ও মেরামতাধীন লোকোমোটিভের যন্ত্রাংশ খুলে অন্যটি মেরামত করে কোনো রকমে ওয়ার্কশপ পরিচালনা করছে রেলের যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগ। রেলের তিনটি লোকোমোটিভ কারখানায় কোনোটি ভারী মেরামতের অপেক্ষায়, কোনোটি আবার ওয়ার্কশপে পাঠানোর আগেই শেডে অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এতে বিদ্যমান লোকোমোটিভের বড় একটি অংশ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে সচল ইঞ্জিনের ওপর বাড়ছে পরিচালনগত চাপ; ব্যাহত হচ্ছে ট্রেন অপারেশনে সময়ানুবর্তিতা। বর্তমানে রেলের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ট্রেনই বিলম্বে যাত্রা শুরু করছে। আবার পথিমধ্যে লোকোমোটিভ বিকল হয়ে যাত্রা শুরুর পরও নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছতে পারছে না। এতে প্রায় প্রতিদিনই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ট্রেন বাতিল হওয়ার পাশাপাশি অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেও ট্রেন বাতিলের ঘটনা বাড়ছে।
রেলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৭০০ সিরিজের ২৭১০ ও ২৭০৭ নম্বর লোকোমোটিভ দুটি ২০১৯ সালের ১৯ মে থেকে ভারী মেরামতের তালিকায় রয়েছে। ২৭১০ নম্বর ইঞ্জিনে ফ্লাই হুইলের রিং গিয়ারের ত্রুটি এবং ২৭০৭ নম্বর ইঞ্জিনে ফ্লাই হুইল না ঘোরার সমস্যা রয়েছে। গত ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত দুটি ইঞ্জিনই সাত বছরের বেশি সময় ধরে মেরামত প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। সব মিলিয়ে সাড়ে সাত বছর থেকে এক বছরের বেশি সময় ধরে ওয়ার্কশপে মেরামতাধীন লোকোমোটিভ রয়েছে অন্তত ১৭টি। যন্ত্রাংশের অভাবে পুরনো লোকোমোটিভ থেকে যন্ত্রাংশ খুলে সদ্য ওয়ার্কশপে আসা লোকোমোটিভ মেরামত করে পুরনোগুলোকে আরো বেশি অকেজো করে দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
পুরনো লোকোমোটিভের পাশাপাশি সর্বশেষ আমদানি হওয়া লোকোমোটিভের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। ২০২১-২২ সালের দিকে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আমদানি হওয়া ৩০০০ সিরিজের ৩০০৩ নম্বর লোকোমোটিভটি ২০২৪ সালের ২৩ মার্চ থেকে ভারী মেরামতের তালিকায় থাকলেও এখনো সচল করতে পারেনি রেলওয়ে। লোকোমোটিভটির কম্প্রেসরের পিস্টন ভেঙে গেলেও মেরামত করতে এখনো সেটি কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ ওয়ার্কশপে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ৬০০০ সিরিজের ৬৫১১ নম্বর লোকোমোটিভটি ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল থেকে মেরামতের অপেক্ষায় রয়েছে। এতে কম্প্রেসরের সঙ্গে লুব অয়েল আসার সমস্যা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে ২৯০০ সিরিজের ২৯১১ নম্বর ইঞ্জিনটি ২০২৪ সালের ১৮ মে থেকে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতির কারণে বিশেষ মেরামতের তালিকায় রয়েছে। এসব ইঞ্জিনের ক্ষেত্রে মেরামতে বিলম্বের বিষয়ে যন্ত্রাংশ সংকট, দক্ষ কারিগরের অভাব এবং সর্বশেষ আমদানি হওয়া লোকোমোটিভগুলোর জন্য কারিগরিভাবে দক্ষ না হওয়াকে দায়ী করেছেন ওয়ার্কশপ-সংশ্লিষ্টরা।
রেলওয়ে-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লোকোমোটিভ সংকটের কারণ হিসেবে রেল কর্মকর্তা বারবার ইঞ্জিনের বয়স ও ২০ বছরের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কালকে দায়ী করেন। কিন্তু অর্থনৈতিক আয়ুষ্কালের দ্বিগুণ সময় পেরিয়ে গেলেও রেলের অনেক লোকোমোটিভ ভালো সার্ভিস দিচ্ছে। বর্তমানে ৬০ বছরের বেশি পুরনো কিছু ইঞ্জিন এখনো সচল থাকলেও মাত্র ছয় বছর আগে আমদানি করা নতুন লোকোমোটিভের প্রায় ৬০ শতাংশই অচল হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ আমদানিতে অনিয়ম, মেরামত ও প্রযুক্তি হস্তান্তরে চুক্তিতে ঘাটতিসহ ওয়ার্কশপের অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণে রেলওয়ে লোকোমোটিভেই সবচেয়ে সংকটে রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
লোকোমোটিভ মেরামতে দীর্ঘসূত্রতায় সবচেয়ে বড় কারণ জনবল সংকট। পাশাপাশি অভিজ্ঞ কারিগরের ঘাটতি, নতুন প্রযুক্তির ইঞ্জিন মেরামতে দক্ষতার অভাব, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের সরবরাহ ঘাটতি, মানহীন যন্ত্রাংশ ব্যবহারসহ সার্বিক ওয়ার্কশপ ব্যবস্থাপনা দুর্বলতায় লোকোমোটিভ খাতে পিছিয়ে রয়েছে রেলওয়ে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ডিজেল ওয়ার্কশপের কর্মব্যবস্থাপক প্রকৌশলী এহতেশাম শফিক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রেলওয়ে একটি সমন্বিত প্রকৌশল ইউনিট হিসেবে কাজ করে। পরিপূর্ণ ও দক্ষ জনবলের মাধ্যমে সক্ষমতা অনুযায়ী ওয়ার্কশপে আসা লোকোমোটিভগুলো মেরামত করা হয়। রেলের অধিকাংশ লোকোমোটিভের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে। যার কারণে মেরামতের পরিধি বেড়ে গেলেও জনবলসহ নানা সংকটে কাঙ্ক্ষিত আউটটার্ন দেয়া সম্ভব নয়।’ এর পরও সীমিত সক্ষমতায় রেলওয়ে সর্বোচ্চ পরিমাণ মেরামত করে রেলের লোকোমোটিভের সরবরাহ চেইনকে স্বাভাবিক রাখছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
রেলওয়ের ওয়ার্কশপগুলোর জনবল সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পার্বতীপুর কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ ওয়ার্কশপে অনুমোদিত ৫৫৯টি পদের বিপরীতে কর্মরত জনবল ১৩৩ জন। অর্থাৎ শূন্যপদ ৪২৬টি; অনুমোদিত জনবলের প্রায় ৭৬ দশমিক ২১ শতাংশই ঘাটতি রয়েছে। পার্বতীপুর ডিজেল লোকোমোটিভ ওয়ার্কশপে অনুমোদিত প্রায় ৬৭৫ জনের বিপরীতে কর্মরত ১৬২ জন। সেখানে ঘাটতি ৫১৩ জন বা ৭৬ শতাংশ। পাহাড়তলী ডিজেল ওয়ার্কশপে অনুমোদিত ৩৩০টি পদের বিপরীতে কর্মরত ১১০ জন; শূন্যপদ ২২০টি, যা অনুমোদিত জনবলের দুই-তৃতীয়াংশ।
রেলের প্রকৌশলসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ রেলওয়ের অনুমোদিত জনবল ৪৭ হাজার ৬৩৭ হলেও কাজ করছে মাত্র ২৪ হাজার ৪০৩ জন। রেলের পরিধি দিনদিন বাড়লেও জনবল কাঠামো কমতে থাকায় বর্তমানে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল দিয়ে কোনো রকমে সার্ভিস পরিচালনা করছে। কিন্তু ওয়ার্কশপের মতো বিশেষায়িত খাতে অস্থায়ী ও নতুন জনবল দিয়ে কাজ করানোর সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে রেলের নিয়মিত লোকোমোটিভ আমদানিতে সময়ক্ষেপণ হয়েছে। বিগত কয়েক বছরে দেশীয় রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতায় যন্ত্রাংশ আমদানিতেও বেগ পেতে হয়েছে। বর্তমান সরকার রেলের লোকোমোটিভসহ যন্ত্রাংশ আমদানি, জনবল নিয়োগে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। দুই ডজনের বেশি লোকোমোটিভের বিশেষ মেরামতে একটি প্রকল্পও হাতে নেয়া হয়েছে।’ কয়েক মাসের মধ্যেই রেলের নেয়া নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে লোকোমোটিভের মেরামত ও সরবরাহ সংকট কেটে যাবে বলে মনে করেন তিনি।