নিরীক্ষা ও হিসাব বিভাগ পৃথক্‌করণ

নির্বাহী বিভাগের কাছে যাবে ব্যয় অনুমোদনের ক্ষমতা

বর্তমানে সরকারি ব্যয়ের বিল পাস ও ছাড় করাতে অনুমোদন নিতে হয় হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের (সিজিএ)। তবে জনপ্রশাসন সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সিজিএ কার্যালয়কে পুরোপুরিভাবে অর্থ বিভাগের অধীনে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বর্তমানে সরকারি ব্যয়ের বিল পাস ও ছাড় করাতে অনুমোদন নিতে হয় হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের (সিজিএ)। তবে জনপ্রশাসন সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সিজিএ কার্যালয়কে পুরোপুরিভাবে অর্থ বিভাগের অধীনে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে সরকারি অর্থ ব্যয় ও বিল পাসের ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের কাছে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ার শঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, নির্বাহী বিভাগ যাতে হিসাব বিভাগের কার্যক্রমে অযাচিত হস্তক্ষেপ করতে না পারে সেজন্য আইনি সুরক্ষার পাশাপাশি সমীচীন হবে সংশ্লিষ্ট সবার পরামর্শে এ সংস্কার বাস্তবায়ন করা।

অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়কে (সিএজি) শক্তিশালী করতে বেশকিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে নিরীক্ষা ও হিসাব বিভাগের কার্যক্রমকে আলাদা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এজন্য সিএজির কার্যালয়কে সচিবালয় ঘোষণা করা এবং পৃথক্‌করণের পর হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, কন্ট্রোলার জেনারেল ডিফেন্স ফাইন্যান্সের কার্যালয় (সিজিডিএফ) এবং রেলওয়ে হিসাব বিভাগকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের অধীন করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি নিরীক্ষা বিভাগের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরীক্ষা করা ও প্রতি বছর নির্দিষ্ট মাসে নিরীক্ষা ও নিরীক্ষিত হিসাব প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণের বিষয়েও সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হওয়ার কারণে সিএজির কার্যালয় থেকে সিজিএকে আলাদা করার জন্য সংশোধন করতে হবে সংবিধান। এ কারণে সরকারের নিরীক্ষা ও হিসাব বিভাগ পৃথক্‌করণ কার্যক্রমের বিষয়টি জুলাই সনদের খসড়ায় যুক্ত করা হয়েছে। সনদের জনপ্রশাসন অংশে হিসাব বিভাগ থেকে নিরীক্ষা বিভাগ আলাদাকরণ সংক্রান্ত প্রস্তাবে বলা হয়েছে—নিরীক্ষার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, হিসাব বিভাগ থেকে অডিটের পৃথক্‌করণ এবং অডিটের গুণগতমান উন্নতির জন্য নিরীক্ষা আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে। প্রজাতন্ত্রের বিদ্যমান হিসাব ও নিরীক্ষা বিভাগকে পৃথকের সুপারিশ আগেও বিভিন্ন কমিশন করেছে। বর্তমান কমিশনও একই সুপারিশ করছে। এ প্রস্তাবের বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় একমত পোষণ করেছে ২৫টি রাজনৈতিক দল ও জোট।

সরকারের নিরীক্ষা ও হিসাব বিভাগের একীভূত কাঠামোটি বেশ পুরনো। ব্রিটিশ শাসনামলে অর্থাৎ ১৮৬০ সালে এর যাত্রা শুরু হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সংবিধানে সিএজি গঠন, দায়িত্ব ও ক্ষমতার বিষয়টি নির্ধারণ করা হয়। আর হিসাব বিভাগের কার্যক্রম তখন এজি (সিভিল) নামে যাত্রা শুরু করে। ১৯৮৫ সালে এজি (সিভিল) কার্যালয়কে এক মেমোরেন্ডামের মাধ্যমে কন্ট্রোলার জেনারেল অব অ্যাকাউন্টস বাংলাদেশ (সিজিএ) নামকরণ করে অর্থ বিভাগ। স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় বা বিভাগের ওপর অর্পিত হিসাব রাখাসহ সরকারের জন্য হিসাব তৈরি থেকে সিএজি কার্যালয়কে অব্যাহতি দিয়ে সিজিএ কার্যালয়কে এ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে সিজিএ কার্যালয় স্বাধীনভাবে করলেও হিসাবরক্ষণের নীতি ও পদ্ধতি সম্পর্কে সিএজি কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়। তাছাড়া সিজিএ কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়ন সিএজি কার্যালয়ের মাধ্যমে হয়ে থাকে।

সিজিএ কার্যালয় তথা সরকারের হিসাব বিভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি কার্যক্রম হচ্ছে প্রি-অডিট করা। সামরিক, বেসামরিক ও রেলওয়ে বিভাগের সব ধরনের আর্থিক প্রি-অডিটের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের জন্য বিল ছাড় করে সিজিএ কার্যালয়। সরকারের কিছু বিভাগ যেমন গণপূর্ত বিভাগ, জনস্বাস্থ্য বিভাগ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, বন বিভাগ ও ডাক বিভাগ এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প প্রি-অডিটের আওতাবহির্ভূত। মূলত বিকেন্দ্রীকরণ উদ্যোগের আওতায় এগুলোকে এর বাইরে নেয়া হয়েছিল। এ প্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রি-অডিট না থাকায় প্রাপ্যতাবহির্ভূত বেতন-ভাতাদি নির্ধারণ ও গ্রহণ, ক্রয়ের স্বপক্ষে প্রমাণক ছাড়াই বিল পরিশোধ, সরকারি অনুমোদন ছাড়া অনেক ক্রয়কার্য সম্পাদন বা ক্রয় না করেই বিল উত্তোলনসহ নানা আর্থিক অনিয়ম ও অসংগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ বিভাগগুলোর পোস্টঅডিট প্রতিবেদনের নিরীক্ষা আপত্তিতে সেগুলো উঠে এসেছে। এ অবস্থায় জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব অনুসারে সিজিএ কার্যালয়কে পুরোপুরিভাবে অর্থ বিভাগের অধীন করা হলে সরকারি অর্থ ব্যয় ও বিল পাসের ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের কাছে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ার পাশাপাশি এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধের সুযোগ আরো সীমিত হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ভূঁইঞা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যয় করা, ব্যয়ের অনুমোদন ও হিসাব রাখার কার্যক্রম মূলত নির্বাহী বিভাগের কাজ। এটি যথাযথভাবে করা হচ্ছে কিনা সেটি দেখবে নিরীক্ষা বিভাগ, যারা স্বাধীনভাবে কাজ করে। হিসাবের চেক অ্যান্ড ব্যালান্স নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হবে। যেকোনো মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা সংস্থার হিসাব বিভাগ এক ধরনের অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা ভোগ করে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় হিসাব ও অর্থ কর্মকর্তা যে বিল পাস করেন সেখানে সচিবের অনুমোদন প্রয়োজন পড়ে না। যেহেতু হিসাব ও নিরীক্ষা বিভাগের বিদ্যমান ব্যবস্থাটি অনেক পুরনো সেহেতু এর সংস্কার কার্যক্রম অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এবং সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে পরামর্শক্রমে বাস্তবায়ন করা সমীচীন।’

নিরীক্ষা ও হিসাব বিভাগের কার্যক্রম পৃথক্‌করণের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। সংশ্লিষ্ট বিভাগ দুটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই পৃথক্‌করণের সুপারিশ করা হয়েছে বলে অভিযোগ বিসিএস অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস অ্যাসোসিয়েশনের। হিসাব বিভাগকে নিরীক্ষা বিভাগ থেকে পৃথক করা হলে তা সম্পূর্ণভাবে প্রশাসন তথা নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে, যা বিদ্যমান চেক অ্যান্ড ব্যালান্সকে দুর্বল ও অকার্যকর করবে বলে মনে করছে তারা। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও নিরীক্ষা ও হিসাব বিভাগের কার্যক্রম পরীক্ষামূলকভাবে পৃথক্‌করণ করে ভালো ফলাফল না আসায় পরবর্তী সময়ে আর সে বিষয়ে এগোয়নি। ভারতের এ অভিজ্ঞতার বিষয়টিও বিস্তারিত পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

হিসাব ও নিরীক্ষা বিভাগকে আলাদা করতে ২০১১ সালেও একটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিল বিশ্বব্যাংক। সে সময় অর্থ বিভাগ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, সড়ক বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি এবং ডেপুটি সিএজি এঅ্যান্ডআরের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন দাখিল করে। তাতে নিরীক্ষা ও হিসাব কার্যক্রম পৃথক্‌করণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলোর ব্যাপকতা, জটিলতা, সংবেদনশীলতা ও আন্তঃসম্পর্ক থাকায় এর পক্ষে আর সুপারিশ করা হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কাগজে-কলমে স্বাধীন হলেও সরকারের নিরীক্ষা ও হিসাব বিভাগ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। স্বাধীনতা থাকা সত্ত্বেও সরকারি পর্যায়ে দুর্নীতি ও অনিয়ম বেড়েই চলেছে। এমনকি খোদ নিরীক্ষা ও হিসাব বিভাগের কর্মকর্তাদেরও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার নজির রয়েছে।’

সংস্কারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারি ব্যয়ের অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে কোন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে সেটি সুনির্দিষ্ট করে আইন ও বিধিমালায় উল্লেখ রয়েছে। হিসাব বিভাগ সে অনুসারেই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। হিসাব বিভাগের কার্যক্রম অর্থ বিভাগের অধীন হওয়ার পর ম্যান্ডেট অনুসারে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে যাতে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপের সুযোগ না থাকে এমন ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু হস্তক্ষেপ হতে পারে এমন শঙ্কার কারণে সংস্কার না করার সুযোগ নেই। হিসাব বিভাগের কর্মকর্তারা যাতে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের সময় নির্বাহী বিভাগের অযাচিত হস্তক্ষেপের শিকার না হন, সেজন্য আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা হলে সেটির পরিণতি ভোগ করতে হবে, এমন ব্যবস্থা রাখা হলে এ সংস্কার ও পৃথক্‌করণ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।’

আরও