তাপপ্রবাহের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ক্রমেই ভয়ংকর হয়ে উঠছে এপ্রিল। গত বছরের এপ্রিলে ৭৬ বছরের রেকর্ড ভেঙেছিল তাপমাত্রা। তবে এবার গত কয়েক বছরের তুলনায় একটু আগেভাগেই পারদ চড়তে শুরু করেছে। মার্চের মাঝামাঝিতে শুরু হয়েছে তাপপ্রবাহ। এ পরিস্থিতি আগামী জুন পর্যন্ত থাকতে পারে, যা প্রাণ ও প্রকৃতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার চৈত্রের আগে থেকেই তাপমাত্রা বেড়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ১২ জেলার ওপর দিয়ে গতকাল মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ীতে, ৩৭ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একদিনের ব্যবধানে রাজধানীতেও সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়ে গেছে। ঢাকায় গত শনিবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৪ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গতকাল পারদ ওঠে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলমান তাপপ্রবাহ সারা দেশে বিস্তার লাভ করতে পারে।
কোনো এলাকায় যদি সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়, তবে সেখানে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে ধরা হয়। আর তাপমাত্রা ৩৮ থেকে ৩৯ দশমিক ৯ হলে তা মাঝারি তাপপ্রবাহ। তীব্র তাপপ্রবাহ ধরা হয় যখন তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়। অতি তীব্র তাপপ্রবাহ বলে গণ্য হয় তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রির বেশি হলে।
দেশে চলতি বছর শীত ততটা পড়েনি। গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে স্বাভাবিকের চেয়ে তাপমাত্রা দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। ফেব্রুয়ারিতেও তাপমাত্রা ছিল ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। বৃষ্টিও হয়েছে প্রায় ৭৭ শতাংশ কম। ফেব্রুয়ারির শুরু দিকে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা যেখানে ২৮ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল, শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় সর্বোচ্চ ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। তবে মার্চের শুরুতে তাপমাত্রা আরো বেড়ে যায়। চলতি মাসের মাঝামাঝিতেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপপ্রবাহ দেখা দিয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসেও বলা হয়েছে, চলতি মার্চ ও আসছে এপ্রিলে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি থাকবে। গত বছরের মতো এবারো হিটওয়েভ থাকবে কয়েক মাস ধরে। তবে বজ্রঝড় বা কালবৈশাখী আগের বছরের চেয়ে বেশি হলেই কেবল টানা তাপপ্রবাহের শঙ্কা কমে আসবে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্রের আবহাওয়াবিদ ড. বজলুর রশিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এবার একটু আগে থেকে তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। আজ এবং আগামীকাল তাপমাত্রা বেশি থাকবে। এ সময়ে বৃষ্টির সম্ভাবনা কম। এপ্রিলে তাপমাত্রা আরো বাড়বে। গত বছর এ সময়ে তাপমাত্রা আরো কম ছিল। গত বছর হিটওয়েভে ৪৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ছিল। এবার সেটি কমে ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকবে বলে আশা করছি। গতবার অনেকগুলো হিটওয়েভ ছিল। সর্বোচ্চ টানা ৩৫ দিন হিটওয়েভ ছিল। সেটি এবার কতদিন থাকে এখনই বলা যাচ্ছে না।’
মার্চ মূলত গরম শুরুর মাস। তবে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এ মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে তাপমাত্রা অনেকটাই বেশি। পুরো দেশেই ধারাবাহিকভাবে তা বাড়ছে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফাতিমা আক্তার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মার্চের মাঝামাঝি সময়ে তাপমাত্রা বাড়ে স্বাভাবিকভাবে। অন্যান্য বছরও বেড়েছে। এবার কম বৃষ্টিপাত হওয়ায় গরম বেশি অনুভূত হচ্ছে।’
অসময়ে তাপপ্রবাহ প্রাণী ও উদ্ভিদের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শীত শেষ না হতেই এমন হিটওয়েভ কয়েক বছর ধরে হচ্ছে। তবে এবার একটু আগেই তাপমাত্রা বেড়েছে। এর অন্যতম কারণ বৃক্ষনিধন, অধিক যানবাহন, এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহার ও পরিবেশের ইকোসিস্টেমকে ধ্বংস করা। এবারো প্রাণ-প্রকৃতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তাদের।
অসময়ের হিটওয়েভ নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন সাউথ এশিয়ান মেটিওরোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (সামা) যুগ্ম সম্পাদক ড. মোহন কুমার দাশ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘গ্রীষ্মের এ সময়টায় তাপমাত্রা বাড়ে। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়বে। মার্চ থেকে জুনে সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হিটওয়েভ ভয়াবহ রূপ নেয়, যা গত বছর আমরা দেখেছি। এখানে আরেকটি বিষয় হচ্ছে রোববার (গতকাল) চুয়াডাঙ্গা ও ঢাকায় প্রায় একই রকম তাপমাত্রা ছিল। সেখানে সিলেটে ছিল এ দুই জেলার তুলনায় বেশ কম। এ ধরনের ভিন্নতা আশঙ্কাজনক। হিটওয়েভের কারণে প্রতি বছর পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় অনেক প্রাণহানি ঘটে। বাংলাদেশে মানুষ ও প্রাণীর জীবন বাঁচাতে হিটওয়েভ নিয়ে সঠিক আগাম সতর্কতা, হটস্পট শনাক্তকরণ ও যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।’
এ বছর অসময়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বৃষ্টিপাত না হওয়াকে দায়ী করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক জিল্লুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এটি অনিয়মিত আবহাওয়া। কয়েক বছর ধরে এমনটা হচ্ছে। এটি বৈশ্বিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ভবিষ্যতে জলবায়ুর এ পরিবর্তন বাড়তে থাকবে। এর কারণ বাতাসের আর্দ্রতা কমে যাওয়া, গ্রিন হাউজ ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া। ঢাকা শহরের তুলনায় গ্রামের তাপমাত্রা সহনীয়। কারণ সেখানে গাছপালা, জলাশয় আছে, উঁচু দালান কম। হিটওয়েভ এবার কোন পর্যায়ে যায় তা এখনই বলা যাচ্ছে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘অসহনীয় তাপমাত্রা কমাতে সবার ভূমিকা রাখতে হবে। সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। এয়ার কন্ডিশন ও গ্রিন হাউজের ধারণা থেকে বের হয়ে নীতি তৈরি করতে হবে। আইন তৈরি করে পরিবেশ রক্ষায় কাজ করতে হবে।’
অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার শীত কম পড়েছে। আবার হঠাৎ করে তাপমাত্রা বেড়েছে। মানুষের মতো উদ্ভিদের ওপরও এর প্রভাব পড়ে বলে জানান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম মাহফুজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার প্যাটার্নে পরিবর্তন আসে। এতে ডেলিকেট সেলগুলো নষ্ট হতে পারে। পরিবেশের ইকোসিস্টেম পরিবর্তনের কারণে উদ্ভিদের ইকোসিস্টেমও ব্রেক ডাউন হয়েছে। এ কারণে হঠাৎ গরম হঠাৎ শীত এমন পরিবর্তনে উদ্ভিদের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে।’
প্রতি বছরই আগের বছরের রেকর্ড ভাঙছে তাপমাত্রা। শুধু বাংলাদেশেই নয়, গেল বছর ছিল বিশ্ব-ইতিহাসের সর্বোচ্চ উষ্ণ। জাবির জীববিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এ সময়ে প্রাণীকুলও বৈরী পরিবেশের মধ্য দিয়ে যায়। শীত থেকে হঠাৎ আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে প্রাণীর প্রজনন প্রক্রিয়ায় সমস্যা হয়। রোগবালাইয়ের সম্ভাবনা বেশি থাকে। ফলে জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব পড়বে। সামনের দিনগুলোয় এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এভাবে জলবায়ুর পরিবর্তন হুমকির সম্মুখীন হতে হবে।’
বছরের উষ্ণতম দিনের সংখ্যা এখন শুধু এপ্রিল তথা গ্রীষ্মকালে সীমাবদ্ধ নেই; বর্ষাকালেও বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রীষ্মকালের দৈর্ঘ্য বেড়ে যাওয়া থেকে শুরু করে বর্ষাকালেও তাপপ্রবাহ চলা, এ সবকিছু ঘটছে মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে। ওয়ার্ল্ড ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্সের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি জলবায়ু ঝুঁকিতে আছে, তার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষ দশে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক আখতার হোসেন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে পরিবেশের সব ক্ষেত্রে কমবেশি প্রভাব পড়ে। প্রতিবারের মতো এবারো তাপমাত্রা বাড়ছে। মানুষ পরিবেশের ইকোসিস্টেমটা নষ্ট করেছে। এর বিরূপ প্রভাব পরিবেশের ওপর পড়বে। মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের রোগবালাই বাড়বে, প্রভাব পড়বে জীববৈচিত্র্যেও।’