প্রাণীর কামড়-আঁচড়ে বেড়েছে আক্রান্ত

বরিশালে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন সংকট

বরিশালের হাসপাতালগুলোয় উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে কুকুর-বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড়-আঁচড়ে আক্রান্তের সংখ্যা।

বরিশালের হাসপাতালগুলোয় উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে কুকুর-বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড়-আঁচড়ে আক্রান্তের সংখ্যা। তাদের বেশির ভাগই সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন না পেয়ে হতাশ হচ্ছে। অনেকেই বাইরে থেকে বেশি দামে ভ্যাকসিন কিনে আনছে। কেউ কেউ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিচ্ছে। এতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে তাদের।

সরকারিভাবে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বরিশাল সদর জেনারেল হাসপাতালসহ বিভাগের ছয়টি জেলা শহর ও ৪২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জলাতঙ্ক রোগের চিকিৎসা দেয়া হয়। এছাড়া সিভিল সার্জন অফিসসহ বেসরকারি পর্যায়েও চিকিৎসা নিচ্ছে আক্রান্তরা। তবে চিকিৎসা মিললেও বরিশাল শহরে সরকারিভাবে ভ্যাকসিন পাওয়া যায় কেবল বরিশাল সদর জেনারেল হাসপাতালে। অন্যত্র চিকিৎসার ক্ষেত্রে ভ্যাকসিন বাইরে থেকে কিনে নিয়ে যেতে হয়। তবে সদর জেনারেল হাসপাতালেও মিলছে না পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর চিত্রও একই।

বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, চাহিদা অনুযায়ী জলাতঙ্ক রোগের ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে না। আবার পাওয়া গেলেও তা সংরক্ষণ করার তেমন ব্যবস্থা নেই তাদের।

বরিশাল সদর জেনারেল হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ২০ হাজার ১৭৮ জন বিভিন্ন প্রাণীর কামড়-আঁচড়ে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। ওই বছর প্রতিদিন গড়ে ৫৯ জন জলাতঙ্ক রোগের ভ্যাকসিন নিয়েছে।

হাসপাতালটির পরিসংখ্যানে জানা যায়, ওই বছর জলাতঙ্কে আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশ বিড়ালের কামড় কিংবা আঁচড় নিয়ে হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিয়েছে। এর সংখ্যা ১৬ হাজার ৬৬৫। সে হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ৪৯ জন বিড়াল, কুকুর, ইঁদুর, ছুঁচো, বাদুর, শিয়ালের কামড় বা আঁচড়ে আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। যদিও চিকিৎসকরা বলছেন, অন্যান্য প্রাণীর চেয়ে বিড়ালের কামড় কিংবা আঁচড়ে আহতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

অন্যদিকে শুধু কুকুরের কামড় কিংবা আঁচড়ে আক্রান্ত হয়ে ওই বছর ৩ হাজার ৯০৩ জন জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নিয়েছে। সেই হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ১১ জন কুকুরের কামড় কিংবা আঁচড়ে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে।

এদিকে বরিশাল শহরে সরকারিভাবে ভ্যাকসিন সরবরাহ করা একমাত্র হাসপাতাল হলেও সদর জেনারেল হাসপাতালে এক মাস ধরে সরকারি ভ্যাকসিনের সংকট চলছে। এ কারণে বাইরের ওষুধের দোকান থেকে ভ্যাকসিন কিনে আনতে হচ্ছে রোগীদের।

এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা কাওসারুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি বলেন, ‘বিড়াল কামড় দেয়ার পর বরিশাল জেনারেল হাসপাতালে ভ্যাকসিন নিতে এলে জানানো হয়, সরবরাহ নেই। বাইরে থেকে কিনে আনলে তারা পুশ করে দেবেন। পরে আমরা চারজন মিলে ৫০০ টাকা দিয়ে ভ্যাকসিন কিনে দিয়েছি।’

চিকিৎসকরা জানান, কুকুর ও বিড়াল পোষা প্রাণী হওয়ায় ভ্যাকসিন নিতে আসা অধিকাংশই এ দুই প্রাণীর কামড় কিংবা আঁচড়ের শিকার। পাশাপাশি জনসাধারণ জলাতঙ্ক রোগ নিয়ে এখন বেশ সচেতন হওয়ায় সামান্য আঁচড়েও তারা ভ্যাকসিন নিতে আসছে। তারা জানান, জলাতঙ্ক নির্ণয় করার সঠিক কোনো পদ্ধতি বাংলাদেশে নেই। রোগের লক্ষণ ও নমুনা দেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

সদর হাসপাতালের পরিসংখ্যান আরো বলছে, তিন ডোজ ভ্যাকসিনের মধ্যে প্রথম ডোজ সবাই নিলেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় ডোজ নেয়ার সংখ্যা তুলনামূলক অনেক কম।

গত জানুয়ারির তথ্য অনুযায়ী, এ হাসপাতালে প্রাণীর কামড়-আঁচড় নিয়ে মোট রোগী আসে ২ হাজার ১৭৪ জন আসেন। এর মধ্যে ২ হাজার ১৭৪ জনই প্রথম ডোজ ভ্যাকসিন নিয়েছে। দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছে ১ হাজার ৭৫৪ জন। তৃতীয় ডোজ নিয়েছে ১ হাজার ৫২৮ জন। ফেব্রুয়ারিতে মোট ১ হাজার ৭৯৫ জন প্রথম ডোজ ভ্যাকসিন নিলেও দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছে ১ হাজার ৭৪০ জন। তৃতীয় ডোজ নিয়েছে ১ হাজার ৫৬৯ জন। এভাবে প্রতি মাসে এক-তৃতীয়াংশই দ্বিতীয় ও তৃতীয় ডোজ ভ্যাকসিন নিচ্ছে না।

বরিশাল সদর জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডাক্তার মলয় কৃষ্ণ বড়াল বলেন, ‘দিন দিন মানুষ সচেতন হচ্ছে। তাই পোষা প্রাণীর সামান্য আঁচড়েও তারা জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নিচ্ছে। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে রোগীর সংখ্যা বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে ভ্যাকসিনের সংকট লেগেই থাকছে। তাছাড়া আমাদের ভ্যাকসিন সংরক্ষণের যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় সরবরাহ ও বিতরণে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।’

বরিশালের সিভিল সার্জন ডা. মারিয়া হাসান বলেন, ‘বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় কুকুর নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না। ফলে বেওয়ারিশ কুকুরের উৎপাত বেড়ে গেছে। আর কুকুরের কামড়ে আহত হয়ে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নিতে আসা রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছেই।’

ভ্যাকসিন সংকটের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন ঢাকার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে আমাদের দেয়া হয়। চাহিদা পাঁচ হাজার পাঠালে তারা দুই হাজার সরবরাহ করে। তা দিয়ে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে আক্রান্তদের অনেককে বাইরে থেকে কিনে ভ্যাকসিন নিতে হচ্ছে।’

জলাতঙ্কে আক্রান্ত প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে সুস্থ ব্যক্তি র‌্যাবিস ভাইরাসে সংক্রমিত হয়। ধীরে ধীরে এ ভাইরাস প্রান্তীয় স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। ফলে গলবিল ও খাদ্যনালির মাংসপেশির কাজ নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুও আক্রান্ত হয়। সাধারণত কামড়ানোর দুই-তিন মাসের মধ্যে জলাতঙ্ক রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। তবে এ সময়সীমা এক সপ্তাহ থেকে এক বছর পর্যন্তও হতে পারে।

জলাতঙ্কে আক্রান্ত ব্যক্তি পানি দেখলে ভয় পায়। পানি বা খাবার গিলতে তাদের কষ্ট হয়। পিপাসা পেলেও পানি দেখলেই আতঙ্কিত ও ভীত হয়ে পড়ে। আলো-বাতাসের সংস্পর্শে এলে এ ভীতি আরো বেড়ে যায়। তাদের আচরণেও কিছু অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। খিঁচুনিসহ মুখ থেকে অতিরিক্ত লালা নিঃসৃত হয়। বিনা প্ররোচনায় অন্যকে আক্রমণ বা কামড় দেয়ার প্রবণতা দেখা যায়। চিকিৎসা না পেলে এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুও হতে পারে।

আরও