সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়েবসাইটে তথ্য হালনাগাদ হয় না বছরের পর বছর

ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে এটুআইয়ের অনুরোধ

অবাধ তথ্যপ্রবাহের এই সময়ে কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ওয়েবসাইট।

তবে দেশের সরকারি ওয়েবসাইটগুলোর বেশির ভাগের তথ্যই নিয়মিত হালনাগাদ হচ্ছে না। হলেও কোনো কোনো ওয়েবসাইটে গুরুত্বপূর্ণ মেন্যু তথ্য শূন্য দেখা যাচ্ছে।

তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী সব সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং সরকারি ও বিদেশী অর্থায়নে পরিচালিত বেসরকারি সংস্থার স্বতঃপ্রণোদিতভাবে প্রতি বছর বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে বিভিন্ন দপ্তরের ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ওয়েবসাইটেই বার্ষিক প্রতিবেদন নেই। নাগরিকদের তথ্য অধিকার নিশ্চিত করার জন্য প্রদত্ত সুবিধাদির বিবরণ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম, পদবি, ঠিকানা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ফোন নম্বর ও ই-মেইল ঠিকানা দেয়ার কথা থাকলেও কোনো কোনো ওয়েবসাইটে এসব তথ্য পূর্ণাঙ্গভাবে পাওয়া যাচ্ছে না।

কোনো কোনো ওয়েবসাইটে শুধু প্রকল্পের শিরোনাম দেয়া, এতে শিরোনাম ব্যতীত প্রকল্পসংশ্লিষ্ট অন্য কোনো তথ্যই উল্লেখ নেই। বিভিন্ন ওয়েবসাইটে প্রকল্প অগ্রগতির মেন্যু থাকলেও এর মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করা হয় না দীর্ঘদিন। আবার অনেক মেন্যুতে প্রবেশের কোনো পাতাই থাকে না।

এদিকে ওয়েবসাইটগুলোকে নিয়মিত হালনাগাদ করার ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিয়ম লঙ্ঘন করে সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব উদ্যোগে নতুন কোনো ওয়েবসাইট না বানানোর নির্দেশনা দিতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের ‘এসপায়ার টু ইনোভেট’ (এটুআই) প্রকল্প থেকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানানো হয়েছে। আগামীতে ওয়েবসাইটগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও তথ্যের পরিমাণ মূল্যায়নে সাইটগুলোতে নতুন প্রযুক্তি স্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন এটুআইয়ের প্রকল্প পরিচালক।

অধিকাংশ সময় নতুন পদায়ন, বদলিসহ কর্মকর্তাদের নিয়োগ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন সরকারি ওয়েবসাইটের আগেই দেখা যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এতে অনেক সময় বিভ্রান্তি তৈরি হয়, আবার একই পদে দু-তিনজনের নাম আলোচনায় থাকার ফলে ভুল তথ্য ছড়ায়। সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের নিয়োগকে কেন্দ্র করেও এই একই চিত্র দেখা যায়। সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটের আগেই এ তথ্য বিভিন্ন মাধ্যমে ভিন্নভাবে ছড়াতে দেখা যায়। এছাড়া রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেই এমন ধোঁয়াশা তৈরির অভিযোগ রয়েছে। এসব পদে যোগদানের পরও অনেক ক্ষেত্রে প্রজ্ঞাপন পাওয়া যায় না সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটগুলোতে।

বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়নেই বিভিন্ন বিভাগের তথ্য হালনাগাদ হচ্ছে না দীর্ঘদিন। দেখা গেছে, বাংলাদেশে বর্তমানে ৫৯টি সরকারি ও শতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও এ ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, ৩৬টি সরকারি এবং ৭৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যা ২০১৫ সালের ১০ মে সর্বশেষ হালনাগাদ করা হয়। এছাড়া বর্তমানে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকলেও এতে এটিই রয়ে গেছে। এছাড়া বিভিন্ন সেক্টরের পুরনো তথ্যই রয়ে গেছে এ ওয়েবসাইটে। দেশের কৃষি সম্পর্কিত তথ্য দেয়া রয়েছে ২০১৫ সালের তথ্য অনুযায়ী। এছাড়া বিভিন্ন সেক্টর সম্পর্কে উল্লেখিত তথ্য অনেক আগের, যা বর্তমানে অনেক পরিবর্তিত হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে বার্ষিক প্রতিবেদনের মেন্যুটি সম্পূর্ণ ফাঁকা। তবে অন্য মেন্যুতে সর্বশেষ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ২০২২-২৩ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন রয়েছে। বাজেট প্রতিবেদনে কোনো তথ্য নেই, শেষ এক বছরের কোনো তথ্য যায়নি সভার কার্যবিবরণীতে। অন্যান্য মেন্যুতেও হালনাগাদ না করার চিত্র দেখা যায়। শিক্ষা খাতের যাবতীয় তথ্য, উপাত্ত ও পরিসংখ্যান সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং বিশ্লেষণ করা বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) প্রধান কাজ হলেও ওয়েবসাইটে অনেক পাতায় দেখা যায় পুরনো তথ্য। শিক্ষা পরিসংখ্যান সারসংক্ষেপ ২০২৩-এর মাঝামাঝি এবং বিভিন্ন প্রতিবেদন ২০২৫-এর আগের।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও শেষ তিন বছরের বার্ষিক প্রতিবেদন নেই। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে ওয়েবসাইটটিতেও বাজেট মেন্যুটি ফাঁকা এবং ঠিকভাবে হালনাগাদ হচ্ছে না।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে শেষ দুই বছর আগের বাজেটের তথ্য আছে। এছাড়া ত্রৈমাসিক সভার কার্যবিবরণী, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন প্রতিবেদনসহ অনেক পাতায় হালনাগাদের শেষ তারিখ এক থেকে দুই বছর আগের। পরিবেশ অধিদপ্তরে বাজেট ও ক্রয় পরিকল্পনায় পাঁচ বছরের কোনো তথ্য দেয়া হয়নি। কোনো মেন্যুতে আট বছর আগের তথ্যই শেষ দেয়া হয়েছে।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন বার্ষিক প্রতিবেদনের পাতা সম্পূর্ণ ফাঁকা। বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের বাজেট ও প্রকল্প এবং টেন্ডারের স্থানীয় মেন্যুতে কোনো পাতাই নেই। এসব ওয়েবসাইটের কোনো কোনো মেন্যুতে থাকা প্রতিবেদনগুলো দুই থেকে আট বছর আগে শেষ হালনাগাদ করা হয়।

ওয়েবসাইটের তথ্য হালনাগাদ না হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব বিল্লাল হোসেন খান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের প্রায় ৯৯ শতাংশ তথ্যই সম্পূর্ণ হালনাগাদ রয়েছে। ওয়েবসাইটে থাকা শেষ প্রতিবেদনের পর কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।’

কৃষি মন্ত্রণালয়সহ এর অধীন বিভিন্ন সংস্থা, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন (এলজিআরডি) ও সমবায় পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের ওয়েবসাইটগুলো ঘুরে দেখা যায়, কোনো কোনো পাতায় দু-তিন বছর আগের তথ্য। একই পরিস্থিতি ভূমি মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও। এছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়সহ আরো ১০টি ওয়েবসাইট ঘুরে দেখা যায় অধিকাংশেরই প্রতিবেদন নিয়মিত দেয়া হচ্ছে না। এছাড়া তথ্যশূন্য এবং বহু পুরনো তথ্যও দেখা যায় বিভিন্ন মেন্যুতে।

দীর্ঘদিন ধরে সরকারি অনেক ওয়েবসাইট নিয়মিত হালনাগাদ না হওয়ায় বিষয়টি নজরে এসেছে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এটুআইয়ের। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে একটি চিঠি পাঠিয়ে এটুআই ওয়েবসাইট নিয়মিত হালনাগাদ না হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে। এ ব্যাপারে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ কামনা করেছে এটুআই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত সচিব ও এটুআইয়ের প্রকল্প পরিচালক মোহা. আব্দুর রফিক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ওয়েবসাইট তৈরি করে দেয়ার পর অনেকেই তথ্য-উপাত্ত দিয়ে তা সাজায়নি। অনেকেই নিয়মিত তথ্য ইনপুট দেয় না আবার অনেকে নিজস্ব উদ্যোগে ওয়েবসাইট বানানোর চেষ্টা করছে।’ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে চিঠি দেয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘চিঠির মূল উদ্দেশ্য সরকারি দপ্তরগুলো যেন তাদের ওয়েবসাইট নিয়মিত হালনাগাদ করে এবং কেউ যেন বাইরে গিয়ে নতুন ওয়েবসাইট খোলার উদ্যোগ না নেয়।’ তথ্যের হালনাগাদ পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য নতুন প্রযুক্তিগত পদ্ধতি তৈরি করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ই-গভর্ন্যান্স অধিশাখার যুগ্ম সচিব মো. কামরুল হাসান বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারি দপ্তর ও অধিদপ্তরগুলোর ওয়েবসাইট নিয়মিত হালনাগাদ করার জন্য সরকারিভাবে প্রতিনিয়ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এটি একটি নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ। তথ্য হালনাগাদ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’

আরও