নতুন করে বৃষ্টি না হওয়ায় ফেনীর কয়েকটি এলাকার বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে। পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলায় বন্যার পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৫০ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তবে বৃষ্টি কমলেও উজানের ঢলে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে ছাগলনাইয়া, সদর ও দাগনভূঞা উপজেলার কিছু কিছু এলাকা। বন্যার পানিতে ডুবে একজনের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য বলছে, ৭ জুলাই থেকে টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ২১ স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। এতে প্লাবিত হয়েছে একের পর এক জনপদ। বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট তলিয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েক লাখ মানুষ। পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলায় বন্যার পানি কিছুটা কমতে শুরু করায় আশ্রয় কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরছে মানুষ। গতকাল থেকে বৃষ্টি কমলেও উজানের ঢলে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে ছাগলনাইয়া, সদর ও দাগনভূঞা উপজেলার ১১৪টি গ্রাম। বন্যাদুর্গত এলাকায় কাজ করছে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।
এদিকে বন্যার পানিতে মাছ ধরতে গিয়ে ফুলগাজীতে নুরুল আলম (৬২) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকালে উপজেলার বন্দুয়া দৌলতপুর এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ফুলগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহরিয়া ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। নুরুল আলম দৌলতপুর এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক কমান্ডারের ছেলে।
ফেনী পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আক্তার হোসেন মজুমদার বলেন, ‘পরশুরাম ও ফুলগাজী অংশে নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও ছাগলনাইয়া ও ফেনী সদর অংশে পানি বাড়ছে। বাঁধের ভাঙনের স্থান দিয়ে এখনো পানি ঢুকছে। পানি কমার পরই বাঁধ মেরামতের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’
স্থানীয়রা বলছেন, ২০২৪ সালের বন্যার ক্ষত কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই এবার আবার বন্যার কবলে পড়ে তারা নিঃস্ব হয়েছেন। আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তায় দিন পার করছেন। চারদিকে পানি, অন্যের বাড়ির ছাদে আশ্রয় নিলেও পোকামাকড় আর সাপের উপদ্রবে আতঙ্কে দিন পার করছেন তারা।
ফুলগাজী উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রায় এক সপ্তাহ পর গতকাল সূর্যের দেখা মিলেছে। বাড়িতে এখনো হাঁটুসমান পানি। বৃষ্টি না হলে দ্রুত পানি নেমে যাবে। এখনো বাঁধের ভাঙন দিয়ে পানি প্রবেশ করছে। ফেনী-পরশুরাম আঞ্চলিক সড়কের কিছু স্থানে পানি থাকায় এখনো যান চলাচল স্বাভাবিক হয়নি।’
পরশুরামের পশ্চিম অলকার গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ মাসুম বলেন, ‘বৃহস্পতিবার বিকালে বাড়ি থেকে পানি নেমে গেছে। পানির স্রোতে বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়সারা কাজের কারণে প্রতি বছর আমাদের বন্যার কবলে পড়তে হচ্ছে।’
ফেনী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমান বলেন, ‘জেলায় টানা চারদিন ধরে মাঝারি ও ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত ছিল। তবে গতকাল সূর্যের দেখা মিলেছে।’
বন্যাদুর্গত এলাকায় আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার তৎপরতা, ত্রাণ সহায়তায় সম্মিলিতভাবে কাজ করে যাচ্ছেন সেনা, বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরা। সামরিক-বেসামরিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোও উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
জেলা প্রশাসন বলছে, বন্যাকবলিত পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া (আংশিক), ফেনী সদর (আংশিক) ও দাগনভূঞা (আংশিক) উপজেলার ১১৪টি গ্রামের জনগণের দুর্ভোগ কমাতে অংশীজনের সহযোগিতায় কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ৮২টি আশ্রয় কেন্দ্রে প্রায় ৯ হাজার ২০০ মানুষ অবস্থান করছে। তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলায় দুর্যোগে সবচেয়ে নাজুক গর্ভবতী নারী ও অসুস্থ ১৮ জনকে সেনাবাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতায় উদ্ধার করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও মজুদ রয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ, মোবাইল নেটওয়ার্ক সচল রাখতে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ও মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করা হচ্ছে। জনগণের নিরাপত্তায় বন্যাকবলিত কিছু এলাকায় সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে।’