এর মধ্যে জলভাগের পরিমাণ ১ হাজার ৮৭৪ দশমিক ১ বর্গকিলোমিটার, যা পুরো সুন্দরবনের আয়তনের ৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ। ১৩ বড় নদীসহ ৪৫০টির মতো খাল রয়েছে সুন্দরবনে। বনের মোট আয়তনের অর্ধেকের বেশি এলাকা অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে বন বিভাগ। এসব এলাকায় জেলেদের প্রবেশ নিষিদ্ধ হলেও বনসংলগ্ন বঙ্গোপসাগর ও নদী-খালে অবাধে চলছে মাছের পোনা নিধন। বিশেষ করে পারশে মাছের পোনা আহরণে বিস্তীর্ণ উপকূল, নদীর মোহনা ও খালে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ ঘন মশারি জাল। এতে একদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মাছের বংশবিস্তার, অন্যদিকে ধ্বংস হচ্ছে মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য সামুদ্রিক প্রাণীর লার্ভা। পাশাপাশি মারা যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির জলজ প্রাণী।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (খুলনার পাইকগাছা নোনা পানি গবেষণা কেন্দ্র) দেয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি পারশে পোনা আহরণের বিপরীতে কমপক্ষে ১১৯টি চিংড়ি, ৩১২ প্রাণিকণা ও ৩১টি অন্য প্রজাতির মাছের পোনা ধ্বংস হয়। মৎস্য আইনে মাছের পোনা সংরক্ষণে সোয়া চার ইঞ্চির কম ফাঁস জাল ব্যবহার করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
এ প্রসঙ্গে সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘উপকূলের প্রান্তিক মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস সুন্দরবন। এ বনকে ঘিরে কোনো না কোনোভাবে প্রায় দেড় লাখ মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। নিয়ম মেনে সুন্দরবন থেকে সম্পদ আহরণ করা না হলে সংকটে পড়বে সমুদ্র উপকূলবর্তী লোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় শ্বাসমূলীয় (ম্যানগ্রোভ) বন।’
স্থানীয় জেলেরা বলছেন, পারশে মূলত লোনা পানির মাছ। সুস্বাদু এ মাছটি অগভীর উপকূলীয় জলাশয়, সুন্দরবনের মতো ম্যানগ্রোভ এলাকার নোনা বা আধা-লোনা জলে বেশি পাওয়া যায়। তবে মাছটি কিছু ক্ষেত্রে স্বাদু পানিতেও অভিযোজন করতে সক্ষম, যা এটিকে উপকূলের কাছাকাছি ঘেরে চাষের উপযোগী করে তোলে। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা অঞ্চলের চিংড়ি ঘেরগুলোতে এ সময় প্রাকৃতিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা পারশে পোনার ব্যাপক চাহিদা থাকে। এজন্য ২০-২৫টি দল সুন্দরবনে পারশে পোনা শিকার অব্যাহত রেখেছে।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, ‘জনবল সংকটসহ বেশকিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও সুন্দরবনকেন্দ্রিক সব ধরনের অপরাধ দমনে সচেষ্ট রয়েছেন বন কর্মকর্তা ও প্রহরীরা। প্রায়ই কীটনাশক, কীটনাশক প্রয়োগে ধরা মাছ, নিষিদ্ধ ঘন জালসহ সুন্দরবনে অবৈধভাবে প্রবেশ করা জেলেদের শনাক্ত করে গ্রেফতার করা হচ্ছে।’
পূর্ব ও পশ্চিম—এ দুই প্রশাসনিক বিভাগে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশ বিভক্ত। খুলনা ও সাতক্ষীরা অংশ নিয়ে পশ্চিম সুন্দরবন। বাগেরহাট ও খুলনার সামান্য অংশ নিয়ে পূর্ব সুন্দরবন। জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হওয়া সুন্দরবনের জলাধার ভেটকি, রূপচাঁদা, দাঁতনে, চিত্রা, পাঙাশ, লইট্যা, ছুরি, মেদ, পারশে, পোয়া, তপসে, লাক্ষা, কই, মাগুর, কাইন, ইলিশসহ ২১০ প্রজাতির সাদা মাছের আবাস। এছাড়া রয়েছে গলদা, বাগদা, চাকা, চালী, চামীসহ ২৪ প্রজাতির চিংড়ি। শিলাসহ ১৪ প্রজাতির কাঁকড়ার প্রজনন হয় এখানে।
সুন্দরবনের কয়েকজন বনজীবী জানান, মূলত ডিসেম্বর-মার্চ—এ তিন মাস পারশে মাছের পোনা আহরণ করা হয়। কয়রা অঞ্চলের একটি চক্রের সহযোগিতায় পোনা নিধন কার্যক্রম চলছে। সুন্দরবনে ট্রলার চলাচল নিষিদ্ধ থাকলেও সাদা মাছ পরিবহনের নাম করে বন বিভাগ থেকে ট্রলারের অনুমতি নেয় মহাজনরা। এরপর বনের বিভিন্ন নদী-খালে সাদা মাছ পরিবহনের বদলে পারশে মাছের পোনা শিকার করে। অভয়ারণ্যের নদীতে পোনা ধরতে প্রতিটি দ্রুতগামী ট্রলারে আট-১০ জন জেলে আর ঘন মশারি জাল থাকে। কোনো অভিযান পরিচালনার আগেই দালালরা জেলেদের জানিয়ে দেয়। সতর্ক সংকেত পেয়ে তারা বনের মধ্যে পালিয়ে থাকেন। অভিযান শেষ হলে আবার পোনা ধরতে শুরু করেন।
বনজীবীরা জানান, একবার জাল টানলে দুই-তিন মণ পারশে পোনা পাওয়া যায়। দুদিন পরপর এসব ট্রলার সাত-আট মণ পারশে পোনা নিয়ে শিবসা নদীতে আসে। সেখান থেকে বন বিভাগের নলিয়ান কার্যালয়ের সামনে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় পাইকগাছা, দাকোপ ও মোংলার বিভিন্ন মোকামে। পাইকগাছা সেতুর নিচে দক্ষিণ পাশে প্রকাশ্যে পোনা বেচাকেনা হয়। ঘের মালিকদের কাছে আকারভেদে প্রতি কেজি পোনা ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা বিক্রি করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, খুলনার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেডএম হাছানুর রহমান এর আগে পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক ছিলেন। সে সময় কয়েকটি চক্রের সঙ্গে তার সখ্যতা তৈরি হয়।
এ অভিযোগকে ভিত্তিহীন দাবি করে হাছানুর রহমান বলেন, ‘বনকেন্দ্রিক অপরাধের সঙ্গে বন কর্মকর্তা-প্রহরীদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। অনৈতিক সুবিধা না পেয়ে অনেকেই এসব অভিযোগ করেন। সুন্দরবনের অভ্যন্তরে কোথাও পারশে পোনা ধরার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে।’
সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু, দুর্যোগ, সুন্দরবন সুরক্ষা ও শিক্ষা সহায়তা নিয়ে কাজ করেন কয়রা সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি তারিক লিটু। তিনি বলেন, ‘সুন্দরবনসংলগ্ন জনপদের কিছু প্রভাবশালী মহাজন বন বিভাগকে ম্যানেজ করে পারশে পোনা নিধন করছে। অভয়ারণ্য এলাকাতে সারা বছরই বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার চলে। হরিণসহ বন্যপ্রাণী নিধনও থামানো যায়নি।’
অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনের এ পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলছেন বাংলাদেশ সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের মিডিয়া সমন্বয়ক ওবায়দুল কবির সম্রাট। তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে বন কর্মকর্তা ও রক্ষীদের উৎকোচ বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে সুন্দরবন। বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-প্রহরীদের যোগসাজশে কয়রা, দাকোপ ও সাতক্ষীরার শ্যামনগরকেন্দ্রিক কয়েকটি চক্র গড়ে উঠেছে। যেটা কয়রা থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। আরো কয়েকটি চক্র রয়েছে পূর্ব সুন্দরবনের মোংলা, শরণখোলা ও মোরেলগঞ্জকেন্দ্রিক। অসাধু কিছু বন কর্মকর্তা-প্রহরী বছরের পর বছর সুন্দরবনের একই এলাকায় দায়িত্ব পালন করায় এসব চক্রের সঙ্গে মিশে রয়েছেন।’
সার্বিক বিষয়ে বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সুন্দরবন সুরক্ষা ও উপকূলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি কমিউনিটি ভিত্তিক সুরক্ষা বলয় তৈরি করা হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হবে। কোনো অনৈতিক কাজে বন বিভাগের কারো জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’