৬৮৩ কোটি টাকায় অর্ধলক্ষ যুবক পাবেন ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ

প্রশিক্ষণার্থীপ্রতি ব্যয় প্রায় দেড় লাখ, বেসরকারিতে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফ্রিল্যান্সিংয়ের মূল শক্তি প্রযুক্তি। একটি কম্পিউটার, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ, প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ও দক্ষ প্রশিক্ষকের মাধ্যমে একজন তরুণকে কাজ শেখানোর সুযোগ রয়েছে।

অনলাইনভিত্তিক আত্মকর্মসংস্থান ও বৈদেশিক আয়—দুদিক থেকেই দেশের অর্থনীতিতে ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন ফ্রিল্যান্সাররা। ঘরে বসে বিদেশী প্রতিষ্ঠানে কাজ করে আয়ের সুযোগ, তুলনামূলক কম প্রাথমিক বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তির সহজলভ্যতা গত এক দশকে তরুণদের মধ্যে ফ্রিল্যান্সিংকে জনপ্রিয় করে তুলেছে। দেশে এ ধরনের কর্মীর সংখ্যা প্রায় ১০ লাখে পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন সময়ে দাবি করা হলেও এর প্রকৃত সংখ্যা, আয় কিংবা কর্মসংস্থানের সুনির্দিষ্ট কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই।

এবার এ খাতে কর্মসংস্থান বাড়াতে দেশের ৫০ হাজার ১০০ কর্মহীন তরুণ-তরুণীকে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ৬৮৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। প্রকল্পের হিসাবে, প্রতি প্রশিক্ষণার্থীর পেছনে সরকারের ব্যয় হবে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৩৪৭ টাকা।

তবে প্রশিক্ষণ ব্যয়ের এ হিসাব নিয়েই উঠেছে বড় প্রশ্ন। কারণ বর্তমানে দেশের বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তিন-চার মাসের ফ্রিল্যান্সিং কোর্সে সাধারণত ১৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ফি নেয়। সে হিসাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা ব্যয়ের বিপরীতে সরকারি প্রকল্পে একজন প্রশিক্ষণার্থীর জন্য বরাদ্দ প্রায় সাড়ে চার গুণ বেশি। কোনো কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কোর্স ফির সঙ্গে তুলনা করলে এ ব্যবধান আরো কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফ্রিল্যান্সিংয়ের মূল শক্তি প্রযুক্তি। একটি কম্পিউটার, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ, প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ও দক্ষ প্রশিক্ষকের মাধ্যমে একজন তরুণকে কাজ শেখানোর সুযোগ রয়েছে। ফলে প্রশিক্ষণ বাবদ বিপুল অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে ব্যয়ের প্রতিটি খাতের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা জরুরি।

জানা গেছে, সরকারের পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রথম ধাপে ৫০ হাজার ১০০ জনকে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী, দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনের কর্মহীন যুবক ও যুব নারীদের লক্ষ্য করে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর। প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ঢাকার দুই সিটিসহ চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বগুড়া, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ৫০১টি ওয়ার্ড।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগে পাঠানো হয়েছে। এ নিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা বসছে আজ। প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা, ব্যয়ের খাত, বাস্তবায়ন কাঠামো এবং সম্ভাব্য সুফল নিয়ে সেখানে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। পিইসি পর্যায়ে অনুমোদন মিললে পরবর্তী সময়ে এটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বিবেচনার জন্য পাঠানো হবে।

জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বিএনপির নির্বাচনী ইশতাহারের অংশ হিসেবে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এমন একটি প্রকল্প কমিশনে এসেছে। আগামীকাল (আজ) পিইসি সভা আছে। সেখানে চলমান ফ্রিল্যান্সিং প্রকল্পের সঙ্গে একীভূত করা, মেয়াদ কমানো, পরামর্শক ব্যয় এবং প্রশিক্ষণ-পরবর্তী প্রশিক্ষার্থীদের চাকরির সঙ্গে সংযোজন করা যায় কিনা সে বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।’

বেসরকারি পর্যায়ে তিন-চার মাস মেয়াদি বিভিন্ন ফ্রিল্যান্সিং কোর্স পরিচালনা করছে আইটি-বিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যে ‘ক্রিয়েটিভ আইটি ইনস্টিটিউট’ গ্রাফিকস ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট ও সাইবার সিকিউরিটিসহ বিভিন্ন বিষয়ে একক কোর্সে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। এসব কোর্সের মেয়াদ চার মাস। কোর্সপ্রতি একজন প্রশিক্ষণার্থীকে গুনতে হয় প্রায় ৩০ হাজার টাকা। এছাড়া বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান বেসিস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টেও (বিআইটিএম) একই ধরনের প্রশিক্ষণে ব্যয় হয় প্রায় ৩০ হাজার টাকা।

তরুণদের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান নিয়ে অনেকদিন ধরে কাজ করছেন বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী একেএম ফাহিম মাশরুর। অতীতে ফ্রিল্যান্সিং প্রকল্প নিয়ে সরকারি কর্মকর্তারা লুটপাট করেছেন জানিয়ে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘১০-১৫ বছর ধরে ফ্রিল্যান্সিংয়ের ট্রেনিংয়ের নামে টাকা লুটপাট হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও এটা নিয়ে আমরা কথা বলেছি। তাছাড়া ফ্রিল্যান্সিংয়ের নামে কোনো ট্রেনিং সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া উচিত নয়।’

ফ্রিল্যান্সারদের বেশির ভাগেরই কোনো সরকারি ট্রেনিং নেই উল্লেখ করে ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘তারা নিজেরাই নিজেদের মতো করে শিখছেন। আর আজকাল আসলে কেউ যদি শিখতে চান, ইন্টারনেট-ইউটিউবেও শিখতে পারেন। আর বাংলাদেশের যারা একটু ভালো ফ্রিল্যান্সার আছেন, তারা নিজে নিজে শিখেছেন। অন্যদিকে এআইয়ের কারণে ফ্রিল্যান্সিং চাকরিই কমে যাচ্ছে।’

সরকারের নতুন প্রকল্পে ব্যয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখন তো বাজারে ৫-১০ হাজার টাকা দিয়েই অনেক অনেক ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে ফ্রিল্যান্সিং শেখা যায়। সেখানে এত টাকা কেন লাগবে?’

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নতুন প্রকল্পের নথিতে বলা হয়েছে, প্রশিক্ষণার্থীদের ডিজিটাল স্কিল, ক্লায়েন্ট ম্যানেজমেন্ট, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। পাঁচ বছরে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে ২ হাজার ৪টি ব্যাচকে। এর মধ্যে প্রতি ব্যাচে থাকবেন ২৫ জন এবং প্রশিক্ষণের মেয়াদ তিন মাস।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের অধীনে ৩৬ হাজার কর্মহীন যুবককে প্রশিক্ষণ দেয়ার একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। সেখানে ১৯ হাজার জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে এরই মধ্যে। প্রকল্পটি কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি বৈদেশিক আয়েও সহায়তা করছে বলে দাবি করেন প্রকল্প পরিচালক মানিকহার রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এরই মধ্যে আমরা ১৯ হাজার প্রশিক্ষণ দিয়েছি। সেখানে খাবার, যাতায়াত ভাড়া ও ভাতা বাবদ জনপ্রতি ১ লাখ ৪ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। এখান থেকে প্রশিক্ষণপ্রার্থীরা ৬১ কোটি ডলারের বেশি আয় করেছেন।’

নতুন প্রকল্পে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের ৬০ শতাংশকে আয়মূলক কাজে যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ শেষে ছয় মাসের মধ্যে আয় শুরু করানোর পরিকল্পনা। তবে সরকারিভাবে প্রশিক্ষণের পরও অধিকাংশ ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান মিলছে না। বাংলাদেশের বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং খাত বড় হলেও উচ্চশিক্ষিত ও টেকনিক্যাল পেশার দক্ষ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী পাচ্ছে না বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সেখানে ফলাফলভিত্তিক (আউটকাম বেজড) প্রশিক্ষণের চাহিদার কথা বলছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কন্ট্যাক্ট সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিংয়ের (বাক্কো) সভাপতি তানভীর ইব্রাহিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফ্রিল্যান্সিং শিল্পকে বড় করতে হলে এখানে প্রয়োজন আউটকাম বেজড, জব লিংকেজ ট্রেনিং ও বাজারে সংযুক্তি। একজন প্রশিক্ষণার্থী প্রশিক্ষণ শেষে চাকরিতে ঢুকে কত টাকা আয় করতে পারবেন সেটা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু সার্টিফিকেটভিত্তিক করলে এমন উদ্যোগ কাজে আসবে না। এটার জন্য সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে প্লাটফর্ম তৈরি করা জরুরি।’

সরকারের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ ব্যয়কে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা করলে হবে না বলে মনে করেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এটা শুধু প্রশিক্ষণের খরচ নয়। প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণার্থীদের প্রশিক্ষণকালীন পাঁচ বেলা খাবারের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি তাদের যাতায়াত বাবদ প্রতিদিন ২০০ টাকা করে দেয়া হবে। প্রশিক্ষণ ব্যয়ের বাইরে প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য আরো কিছু অর্থ রাখা হয়েছে। অন্য অনেক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে হয়তো এসব বিষয় ধরা থাকে না। এছাড়া প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য কিছু ভর্তুকিও দেয়া হবে, যা সরাসরি তাদের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের মাধ্যমে পাঠানো হবে।’

সরকার ফ্রিল্যান্সিং খাতে একটা বিপ্লব নিয়ে আসতে চায় উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘এখানে আমরা দক্ষ জনবল পাচ্ছি না। যদি দক্ষ ফ্রিল্যান্সার তৈরি করতে পারি তাহলে দেশে বসে বিদেশ থেকে আয় করা যাবে।’

আরও