ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ। প্রকল্পের আওতায় মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় ভূমি অধিগ্রহণ করছে সরকার। এর মধ্যে শেরপুর মৌজায় পাঁচ একরের কিছু বেশি এবং ব্রাহ্মণগ্রাম মৌজায় সাড়ে আট একরের কিছু বেশি জমি রয়েছে। তবে বাজারদরের চেয়ে অধিগ্রহণ করা জমির মূল্য তিন গুণ কম বলে দাবি করেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। এতে ভূমি মালিকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে হতাশা। সরকার নির্ধারিত মূল্যে জমি বিক্রি করলে নতুন করে জমি কিনে ঘরবাড়ি নির্মাণ বা পুনর্বাসিত হওয়া কঠিন হবে বলেও মনে করেন তারা। এজন্য অধিগ্রহণ করা ভূমির নির্ধারিত মূল্যে নারাজি জানিয়ে ক্ষতিগ্রস্তরা জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদনও করেছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছে জেলা প্রশাসন।
স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল আইন, ২০১৭ অনুযায়ী, সরকারি কোনো প্রয়োজনে ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বাজারদরের ওপর অতিরিক্ত ২০০ শতাংশ ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিধান রয়েছে।
জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ এবং উভয় পাশে পৃথক সার্ভিস লেন নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় সরকার মৌলভীবাজার সদর উপজেলার খলিলপুর ইউনিয়নের শেরপুর ও ব্রাহ্মণগ্রাম মৌজায় প্রায় ১৪ একর ভূমি অধিগ্রহণ করেছে। শেরপুর মৌজার জমিগুলো অধিকাংশ চারা শ্রেণীর। আর ব্রাহ্মণগ্রাম মৌজার জমি বসতভিটা ও দোকানভিটা শ্রেণীর। শেরপুর বাজারের একাংশ ব্রাহ্মণগ্রাম মৌজায়। উঁচু ভবন, বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ওই মৌজার জমিতে অবস্থিত হওয়ায় বাজারদর বেশি।
ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকরা জানান, জেলা প্রশাসন ২০১৯-২০ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে অধিগ্রহণ কাজ শুরু করে। এরই মধ্যে শেরপুর মৌজার ক্ষতিপূরণের টাকা বিতরণ করছে অধিগ্রহণ শাখা। আর ব্রাহ্মণগ্রাম মৌজায় ২০২৩ সালে প্রথম দফায় নোটিস পাওয়ার পরই ভূমি মালিকরা বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সংগতি রেখে উপযুক্ত মূল্য নির্ধারণ করতে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা বরাবর আবেদন করেন। তখন জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থানটি পরিদর্শন করে উপযুক্ত মূল্য নির্ধারণের বিষয়ে আশ্বস্ত করা হয়েছিল। তবে সম্প্রতি চূড়ান্ত নোটিস পাওয়ার পর দেখা যায়, ব্রাহ্মণগ্রাম মৌজায় প্রতি শতক ভূমির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৭১ টাকা। তিন গুণ বাড়িয়ে এক শতক ভূমির মূল্য দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ২১ হাজার ১৩২ টাকা। অথচ মৌজার শেরপুর বাজারে প্রতি শতক ভূমির বাজারদর ১৫-২০ লাখ টাকা। এই মৌজায় ৯৮ জন ভূমি মালিকের কাছ থেকে সাড়ে আট একরের বেশি জমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে। এ অবস্থায় ৫ অক্টোবর ক্ষতিগ্রস্তরা অধিগ্রহণ করা ভূমির নির্ধারিত মূল্যে নারাজি জানিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছেন।
ভূমি মালিকরা বলছেন, তাদের অনেকের এ ভূমিটুকুই একমাত্র সম্বল। এর বাইরে আর কোনো জমি নেই। অধিগ্রহণের কারণে ক্ষতিপূরণ হিসেবে যে অর্থ পাবেন, তা দিয়ে অন্যত্র পুনর্বাসন সম্ভব নয়। এজন্য অনেকের আশ্রয়হীন হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ভূমি মালিক রুমেল আহমদ বলেন, ‘অধিগ্রহণ করা জমিতে রেস্টুরেন্ট ও চা পাতার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এখন যদি আমি আমার সম্পত্তি বিক্রি করতে চাই, তাহলে শুধু ব্যবসায়িক সুবিধার জন্য প্রতি শতক ভূমির বর্তমান বাজারমূল্য ২০ লাখের বেশি। কিন্তু সরকার চার ভাগের কম অর্থ দিচ্ছে। এটা আমাদের সঙ্গে অবিচার করা হচ্ছে।’
শেরপুর বাজারের পাঁচতলা একটি ভবনের মালিক বজলু মিয়া। তিনি জানান, ২০১৯ সালে প্রতি শতক সাড়ে ১৩ লাখ টাকায় ১৯ শতক জমি ক্রয় করে ভবনটি করেন তিনি। দোতলা পর্যন্ত মার্কেট আর ওপরের তিনতলায় বাসা। সরকার নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রতি শতক ৫ লাখ ২১ হাজার টাকা পাচ্ছেন। যা তার কেনা দামের চেয়ে অনেক কম।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আবু মিয়া চৌধুরী জানান, যে টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া হচ্ছে তা দিয়ে আশপাশের এলাকায় জমি ক্রয় করা সম্ভব হবে না। বিশেষ করে যাদের জমির পরিমাণ কম, তারা মাথা গোজার ঠাঁই হারাবেন।
জমির দাম পুনর্নির্ধারণের দাবিতে ক্ষতিগ্রস্ত মালিকরা সম্প্রতি মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন। জেলা প্রশাসক বরাবর জানিয়েছেন লিখিত আবেদনও।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মো. ইসরাইল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সাব-রেজিস্টার অফিস অধিগ্রহণকৃত এলাকায় জমির রেজিস্ট্রি দলিলগুলো পর্যালোচনা করে মূল্য নির্ধারণ করে। সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিতে হয়তো এই মৌজার লোকজন কম দামে দলিল রেজিস্ট্রি করায় এটি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি পুনরায় তদন্ত করা হচ্ছে। যাচাই-বাছাই করে দেখছি কোনো মানুষ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।’