জ্বালানি অনিশ্চয়তার ফাঁদে বাংলাদেশ

শুধু আওয়ামী লীগ নয়, দায় আছে অন্তর্বর্তী সরকারেরও

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিশেষ আইন বাতিল করে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। ফলে বিদ্যুৎ খাতে এ আইনের আওতাধীন নবায়নযোগ্য জ্বালানির ৩১টি প্রকল্প বাতিল হয়।

একই কারণে বাতিল হয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) নির্মাণ এবং দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি আমদানির মতো গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস সরবরাহ চুক্তিও। দেশের জ্বালানি অনিশ্চয়তার পেছনে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতি-অনিয়ম-লুটপাটের বড় দায় রয়েছে। পাশাপাশি ক্ষমতায় এসে অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের কথা বলে যেসব হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেগুলোও জ্বালানি খাতকে অনিশ্চয়তায় ফেলে দেয়ার জন্য কম দায়ী নয় বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাতিল হওয়া নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ৩১টি প্রকল্প থেকে অন্তত এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চলতি বছর উৎপাদনে আসার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এছাড়া বেসরকারি কোম্পানিকে দেয়া এলএনজির তৃতীয় ভাসমান টার্মিনালটিও চলতি বছরের অক্টোবরে চালু হওয়ার কথা ছিল। এগুলো বাস্তবায়ন হলে দেশে চলমান গ্যাস সংকট অনেকটাই সামাল দেয়া যেত। একই সঙ্গে লোডশেডিং মোকাবেলায় নবায়নযোগ্য খাত বড় সহায়তা দিতে পারত বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

বিভিন্ন খাত সংস্কারে অন্তর্বর্তী সরকার কমিশন গঠন করেছিল। কিন্তু বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিগত দেড় দশকের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে কোনো কমিশন গঠন করা হয়নি। আইন-সংবিধান সংস্কার, রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির মতো ইস্যুতে অন্তর্বর্তী সরকার বিপুল গুরুত্বারোপ করলেও জ্বালানির মতো অত্যাবশ্যকীয় খাত অগ্রাধিকার পায়নি। অন্যদিকে সেই সময়ে জ্বালানি খাত সংস্কারে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির পক্ষ থেকেও অন্তর্বর্তী সরকারকে কোনো সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দেয়া হয়নি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট অনেকে। তাদের মতে, পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত হলে যে দেশের জ্বালানি খাতের বড় সংকট সামাল দিতে হবে এমন ভাবনা বা এ বিষয়ে পূর্বপরিকল্পনার অভাব ছিল বিএনপির।

দেশে বর্তমানে গ্যাস সংকট চলছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) একটি টার্মিনাল ত্রুটিতে পড়ায় সংকট আরো প্রকট হয়েছে। শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎ, আবাসিক ও সিএনজি খাতে গ্যাসের সংকট গ্রাহকদের ভোগান্তিতে ফেলেছে। জ্বালানি খাতের এ সংকটের প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বা গ্যাস সরবরাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং পুরো অর্থনীতি ও জনজীবনের ওপর চাপ তৈরি করেছে।

ব্যবসায়ী ও খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতিতে শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে। একই সঙ্গে এলএনজি, তেল ও কয়লা আমদানির উচ্চ ব্যয় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সরকারের বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। এর প্রভাব পড়ে ভর্তুকি, বিদ্যুতের দাম ও মূল্যস্ফীতিতে। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তায় নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানও বাধাগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে বিদ্যুৎ, পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সংকট অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

গ্যাসের চাহিদা ও জোগানে বর্তমানে ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ সংকট রয়েছে (স্বাভাবিক সময়ে)। এ ঘাটতি মোকাবেলায় পতিত আওয়ামী লীগের সময়ে দেশে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ চুক্তি হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে শুরুতেই দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিশেষ আইন বাতিল করে। যার মাধ্যমে এ খাতের চলমান চুক্তি বাতিল করে দেয় সরকার। এসব চুক্তির একটি ছিল ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতার ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল।

২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে সরকারের এই এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ চুক্তি বাতিল করা হয়। ভাসমান এই এলএনজি টার্মিনালটি চলতি বছরের অক্টোবরে বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসার কথা ছিল। এ চুক্তির পাশাপাশি পেট্রোবাংলার সঙ্গে ১৫ বছর মেয়াদে গ্যাস সরবরাহ চুক্তি ছিল, যা চলতি বছরের জুন থেকে আমদানি হওয়ার কথা ছিল। এলএনজি আমদানি বিষয়ে এ চুক্তিও বাতিল হয়ে যায়। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুক্তি বাতিল করা না হলে শিগগিরই এলএনজি টার্মিনালটি উৎপাদনে চলে আসত। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকার স্থায়ী এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে বাস্তবসম্মত কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এলএনজি বহনকারী একটি জাহাজকে ভাসমান টার্মিনাল বা এফএসআরইউ-তে রূপান্তর করতে সাধারণত ১২-১৮ মাস সময় লাগে। ফলে কোনো একটি বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের চুক্তি বাতিল করলেও ভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদেই নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল তৈরি করা সম্ভব ছিল। কিন্তু সে ধরনের কোনো উদ্যোগ অন্তর্বর্তী সরকার গ্রহণ করেনি।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বৈদেশিক দায় কমিয়েছে এটা সত্য। কিন্তু বিশেষ আইনের অধীনে এ খাতের বেশকিছু প্রকল্প বাতিল করে বড় সংকট ডেকে আনা হয়েছে। তারা বিদেশী বিনিয়োগ বাতিল, গ্যাস সংকট ও বিদ্যুতের নবায়নযোগ্য সক্ষমতার বিষয়গুলো উপেক্ষা করেছেন। এসব বিষয়ে পুনঃদরকষাকষির সুযোগ ছিল। কিন্তু তা না করে অন্তর্বর্তী সরকার ঢালাওভাবে চুক্তি বাতিল করেছে। তাদের সেসব সিদ্ধান্তের ফলে গ্যাস খাতে তৈরি হওয়া সংকটের বোঝা বর্তমান সরকারের ওপর এসে পড়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে বর্তমানে জ্বালানি খাতের যে সংকট সেটা অতীত সরকারগুলোর ধারাবাহিকতা। এটা একদিনের সংকট নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের বেশকিছু সিদ্ধান্ত এ খাতে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করেছে। নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের প্রকল্প ঢালাওভাবে বাতিল, ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ চুক্তি বাতিল—দুই খাতের বড় ক্ষতি করেছে। এগুলো বাতিল না করে বরং রিনেগোশিয়েট করার সুযোগ ছিল। তাতে উভয়পক্ষ রাজি হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সাময়িক অনেক সমস্যার সমাধান হতো। এভাবে তারা জ্বালানি খাতকে পিছিয়ে দিয়েছে। আমি মনে করি, জ্বালানি খাতের চলমান সমস্যা নিয়ে বর্তমান সরকারকে দায়ী করার কোনো সুযোগ নেই।’

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় ছিল ১৮ মাস। সে সময় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংস্কারে তিনি নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরলেও কার্যত তার সেসব উদ্যোগ বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক লোকসান কমাতে পারেনি। বিশেষ করে বিদ্যুতের ট্যারিফ সংশোধন, এলএনজি আমদানি ও ক্যাপাসিটি চার্জ হ্রাস করা যায়নি। বরং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিদ্যুতের একক ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) আর্থিক লোকসান বেড়ে যায়। সেই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতের নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিদেশী বিনিয়োগ বিমুখতা তৈরি হয়। বাড়ানো যায়নি স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন। বরং এ খাতের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বাড়িয়ে বিভিন্ন প্রকল্প বিলম্বিত করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত। এ খাতের তিন হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার অন্তত ৩১টি প্রকল্প বাতিল করে দেয়া হয়। কোনো কারণ ছাড়াই প্রকল্প বাতিল হওয়ায় বেশির ভাগ চীনা বিনিয়োগকারী প্রকল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। অনেকগুলো প্রকল্পে বিনিয়োগ স্থগিত হয়ে পড়ায় বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে নেতিবাচক বার্তা যায় বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সংগঠন বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ) সভাপতি এবং জি-টেক সলিউশন লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও সিইও মোস্তফা আল মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে নবায়নযোগ্য সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগে সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। কারণ তারা ক্ষমতায় এসে একতরফাভাবে ৩১টি প্রকল্প বাতিল করেছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে ২৮টিতে বিদেশী বিনিয়োগ ছিল। যার বেশির ভাগ চীনা বিনিয়োগ। এসব প্রকল্প বাতিল হওয়ার কারণে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা ব্যাপকভাবে আশাহত হয়। কারণ সভরেন গ্যারান্টি দেশে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় বিশ্বাসযোগ্যতা। এটা নষ্ট করা হয়েছে। এসব প্রকল্প বাতিল না হলে চলতি বছরে অন্তত এক হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা গ্রিডে আসত। তাতে বর্তমানে লোডশেডিংয়ের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ সংকটের অনেকটাই মোকাবেলা করা যেত।’

পতিত আওয়ামী সরকারের আমলে জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ না করা, স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন ক্রমান্বয়ে কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতির বিপরীতে কোনো জোরালো পদক্ষেপ নিতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। এমন পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পর শুরু হয় মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ। ফলে বৈশ্বিক অস্থির জ্বালানি বাজারের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি আমদানিতে সংকট তৈরি হওয়া, স্পট মার্কেটে মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি কেনার মতো পর্যাপ্ত অর্থের সংস্থান না থাকা, এলএনজি অবকাঠামো পর্যান্ত না থাকায় দেশের গ্যাস খাত তীব্র সংকটের মুখে পড়েছে।

এদিকে, দেশের বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতের ওপর নির্ভর করে আছে বিদেশী বিনিয়োগ, স্থানীয় শিল্পের উৎপাদন ও নতুন শিল্পের গ্যাস সংযোগ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ দেয়া না গেলে কোনোভাবেই টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের এমন পরিস্থিতি একদিনে সৃষ্টি হয়নি বলে মনে করেন সরকারের নীতিনির্ধারকরাও। বছরের পর বছর এ খাত থেকে অর্থ লুটপাট করা হয়েছে। পরিকল্পনাহীনভাবে চলেছে গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাত। এতে বিপুল পরিমাণ দায়-দেনা তৈরি করে এ খাতের ভঙ্গুর দশা তৈরি করা হয়েছে বলে মনে করেন তারা।

পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাস খাতে যে সংকট চলছে সেটা আমরা রাতারাতি পরিবর্তন করতে পারব না। আমরা বিভিন্ন দেশের কাছে সহযোগিতা চেয়েছি, তারা আশ্বাস দিয়েছে। কীভাবে এ খাতকে সংকটের মুখ থেকে বের করে আনা যায় সেই চেষ্টা করছি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অনেকগুলো প্রকল্প বাতিল করে দেয়া হয়। সেগুলো থাকলে তো কিছু একটা করতে পারতাম। আমরা চেষ্টা করছি বিশেষ করে বিদ্যুতের প্রকল্প, জ্বালানি খাতের প্রকল্প—এগুলো দ্রুত সমাধান করে কীভাবে কাজ শুরু করা যায়।’

আরও