রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি ভবনে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে অন্তত ২২ জন নিহত হয়েছে। গতকাল দুপুরে চীনের তৈরি এফটি-৭ বিজিআই মডেলের বিমানটি দুর্ঘটনায় পড়ে। দেশে গত এক দশকে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে বেশ কয়েকবার। এর কোনোটিতে পাইলট আহত বা নিহত হয়েছেন। কোনোটি বিধ্বস্ত হয়েছে জনবসতি থেকে দূরে। তবে এবারের মতো প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার নজির সাম্প্রতিক ইতিহাসে নেই। সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গত এক দশকে একের পর এক প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনার পরও মৌলিক পরিবর্তন আসেনি বিমান বাহিনীর বহরে কিংবা নীতিনির্ধারণে। যুক্ত হয়নি আধুনিক যুদ্ধবিমান। পুরনো প্রযুক্তির এয়ারক্রাফট দিয়েই চলছে বাহিনীর কার্যক্রম।
বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমানের দুর্ঘটনা নতুন নয়। চলতি বছরের ১৩ মার্চ যশোরে গ্রোব-১২০টিপি বিমানটি জরুরি অবতরণকালে দুর্ঘটনায় পড়ে। ২০২৪ সালের ৯ মে চট্টগ্রামে ইয়াক-১৩০ প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ভেঙে পড়ে; কো-পাইলট স্কোয়াড্রন লিডার আসিম জাওয়াদ পরবর্তী সময়ে মারা যান। ২০২৩ সালের ১৫ অক্টোবর বগুড়ায় একটি পিটি-৬ প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনার শিকার হলেও পাইলটরা অক্ষত ছিলেন। ২০১৮ সালের নভেম্বরে প্রশিক্ষণের সময় টাঙ্গাইলের মধুপুরে বিধ্বস্ত হয় এফ-৭ বিজি। এতে নিহত হন পাইলট আরিফ আহমেদ। ২০১৫ সালের জুনে এফ-৭ যুদ্ধবিমান সাগরে বিধ্বস্ত হলে পাইলট তাহমিদ নিখোঁজ হন। ২০১৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি যশোরের মাহিদিয়া গ্রামে পিটি-৬ বিমান ধানখেতে জরুরি অবতরণ করে। ২০১২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীতে আরেকটি যুদ্ধবিমান ভেঙে পড়ে, তবে পাইলট রক্ষা পান। ২০১১ সালের ১০ অক্টোবর শাহ আমানত বিমানবন্দরে একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হলেও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মুনতাসিন প্রাণে বেঁচে যান। ২০১০ সালের ২০ ডিসেম্বর বরিশালে পিটি-৬ বিমান ভেঙে পড়ে, এতে দুই পাইলট নিহত হন। ২০০৮ সালের এপ্রিলে টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের পাহাড়িপাড়া গ্রামে পাইলটসহ বিধ্বস্ত হয় একটি এফ-৭ প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান। এতে নিহত হন স্কোয়াড্রন লিডার মোর্শেদ হাসান। দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে তখন সম্ভাব্য কারিগরি ত্রুটির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এ দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে তিনবারই ছিল এফ-৭ প্রশিক্ষণ বিমান। উত্তরায় বিধ্বস্ত হওয়া এফ-৭ সিরিজের বিমানটিও ছিল চীনের তৈরি জে-৭ তথা এফটি-৭ বিজিআই। এটি মূলত ১৯৬০-৯০ দশকের প্রযুক্তি। বর্তমানে এ ধরনের বিমানের দুর্ঘটনার হার অনেক বেশি বলে উল্লেখ করেছে অ্যারোস্পেস গ্লোবাল নিউজ (এজিএন)। ১৯৬০ থেকে ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির বহরে সবচেয়ে বেশি উচ্চতায় উড়তে সক্ষম ও দ্রুতগামী জেট ছিল জে-৭। অ্যারোস্পেস গ্লোবাল নিউজের তথ্য অনুযায়ী, রফতানির সময় চীনা কোম্পানিটি এফ-৭ যুদ্ধবিমান আমদানিকারকের চাহিদা অনুযায়ী তৈরি করে। সে সময় এর নামের সঙ্গে কিছু সংকেত ব্যবহার করা হয়। যেমন বাংলাদেশ যদি এ সিরিজের যুদ্ধবিমান আমদানি করে তাহলে এফ-৭-এর পর ইংরেজি অক্ষর ‘বি’ যুক্ত হয়। আর গ্লাস ককপিটের নকশার ক্ষেত্রে ‘জি’ এবং উন্নত সংস্করণ বোঝাতে ইমপ্রুভডের ‘আই’ যুক্ত হয়।
এজিএন বলছে, এ ধরনের জেট সারা বিশ্বেই আকাশ প্রতিরক্ষা, বহুমুখী অভিযান ও পাইলটদের প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহার হয়। তবে নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের চেয়ে এর দুর্ঘটনার হার বেশি। এর কারণ পুরনো নকশার এয়ারফ্রেম, সীমিত নিরাপত্তা, আধুনিক ফ্লাইট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অভাব। এভিয়েশনভিত্তিক ওয়েবসাইটগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এফ-৭ কম স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধবিমান।
এ বিষয়ে ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর বলেন, ‘আমাদের যে ফাইটার জেটগুলো আছে তার বেশির ভাগই আউটডেটেড। যে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে সেটার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে ২০১৩ সালেই। আমরা এগুলো আর কতদিন চালাব? তার ওপর যথাযথ মেইনটেইন করা হয় কিনা সন্দেহ। শুনেছি এখানে অনেক অনিয়ম রয়েছে। যদি সত্যিই তাই হয় তাহলে এই এয়ারক্রাফটগুলো একেকটা ফ্লাইং কফিন। এটাই প্রমাণ করে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা কোন দশায় আছে, আমরা কতটা আনপ্রিপেয়ার্ড।’
এ ধরনের ঘটনা এড়াতে নতুন এয়ারক্রাফট কিনতেই হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘৭০ সালের গাড়ি আর এখনকার গাড়ির মধ্যে প্রযুক্তির আধুনিকতায় আকাশ-পাতাল ব্যবধান। আমরা অনেকদিন ধরেই বলে আসছি বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল। এসব বিমান দুর্ঘটনা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে আসলে আমরা কতটা দুর্বল। এক দশক ধরে বিমান বাহিনী চেষ্টা করছে কেনাকাটা করার, কিন্তু হয়নি। এখন সময় এসেছে, যত দ্রুত সম্ভব বিমান বাহিনীর আধুনিকায়ন প্রয়োজন।’
বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর বহরে আছে মোট ৪৪টি যুদ্ধবিমান। এর মধ্যে ৩৬টিই চীনের তৈরি এফ-৭ সিরিজের। যেগুলোর উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে ২০১৩ সালে। বাকিগুলো সোভিয়েত আমলের মিগ-২৯। আধুনিক যুদ্ধে বা প্রশিক্ষণে এসব বিমান কতটা কার্যকর—সেটাও প্রশ্নবিদ্ধ। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের এ জেটগুলো নতুন প্রজন্মের স্টিলথ ও আধুনিক রাডার প্রযুক্তির সামনে কার্যকারিতা হারাচ্ছে।
যেকোনো জিনিস পুরনো হলে ঝুঁকি বাড়বেই মন্তব্য করে এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মাহমুদ হোসেন বলেন, ‘যেকোনো এয়ারক্রাফট ফিট হওয়ার পরই উড্ডয়নের অনুমতি দেয়া হয়—এটাই নিয়ম, যা আমাদের এখানেও মানা হয়। তবে যুদ্ধবিমানের একটা লাইফ সাইকেল আছে। এর পরও এটা এক্সটেন্ড করতে চাইলে মেইনটেন্যান্স যথাযথভাবে করতে হয়। ভারতে একসময় মিগ-২১ বিমানে বেশ কয়েকজন পাইলট দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন। পরে তারা তাদের সব বিমান পর্যবেক্ষণের আওতায় এনেছিল। আরো জরুরি হচ্ছে নতুন এয়ারক্রাফট কেনা। সবচেয়ে ভালো হতো যদি আমরা টেকসই প্রকিউরমেন্ট ও মেইনটেন্যান্স পলিসি করতে পারতাম। এয়ারক্রাফট কিনতে গেলে অনেক স্টাডি করে কিনতে হয়। আমাদেরও সেটা করতে হবে। যেকোনো জিনিসই পুরনো হলে ঝুঁকি বাড়ে। ফলে নতুন এয়ারক্রাফট কেনায় মনোযোগ দেয়া উচিত। কারণ দিন শেষে সবার জীবনের মূল্য আছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘সাধারণত দুই কারণে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনা ঘটে। টেকনিক্যাল ফল্ট ও হিউম্যান এরর। প্রশিক্ষণ বিমানেও ব্ল্যাক বক্স থাকে, সেটা অনুসন্ধান করে এগুলোর যথাযথ তদন্ত করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।’
অন্যান্য অনেক দেশে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম হয় অনেকটা জনমানবহীন খোলা জায়গায়। বাংলাদেশেও এ বিষয় বিবেচনা করা উচিত মন্তব্য করে মাহমুদ হোসেন বলেন, ‘অন্যান্য দেশেও প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনা ঘটে। তবে সেগুলো তেমন আলোচনায় আসে না, কারণ তার অধিকাংশই হয় জনমানবহীন এলাকায়। সেক্ষেত্রে ঢাকার আশপাশে অপেক্ষাকৃত কম জনবহুল এলাকায় একটা পৃথক ফাইটার বেজ প্রস্তুত করা যায় কিনা সেটা সরকারের ভেবে দেখা উচিত।’
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় প্রতিটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রই আধুনিক সমরাস্ত্র তৈরি কিংবা কেনার ক্ষেত্রে ব্যয় বাড়িয়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। যদিও বাংলাদেশ চলছে উল্টো পথে। টাকার অংকে নিট প্রতিরক্ষা বাজেটে বরাদ্দ বাড়লেও কমেছে ডলারের হিসাবে। আবার বাজেটের বেশির ভাগই চলে যাচ্ছে পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নয়নে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-২২ সময়কালে অস্ত্র আমদানি আগের পাঁচ বছরের তুলনায় কমেছে প্রায় ৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ সামরিক অবকাঠামো খাতে ব্যয় বাড়লেও সমরাস্ত্রে উল্টো কমেছে। ফলে বাংলাদেশের সামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুরনো কাঠামোয়ই পড়ে রয়েছে। যুদ্ধপ্রযুক্তি বা প্রশিক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর জায়গাটি থেকে গেছে অবহেলিত।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আর্মি এভিয়েশনে কর্মরত ছিলেন কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ সোহেল রানা। সার্বিক বিষয়ে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘একটি বিমান যখন পাইলটকে দেয়া হয় তার মানে সে ক্যাপাবল। উড়ানোর অনুমতি দেয়া মানে এয়ারক্রাফটও ফিট। আমি মনে করি আমাদের এয়ারক্রাফট বা মেশিনারিজ পুরনো, আধুনিকায়নও হয়তো হয় না। এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিমান বাহিনীর আধুনিকায়ন, নতুন এয়ারক্রাফট সংযোজন করা। সেটা যে হঠাৎ করে কেনা যায় না এটা সত্যি, কিন্তু কেনার প্রক্রিয়া চলমান থাকা উচিত। কেনার সময় অনেক কিছু বিবেচনায় আনতে হয়। ক্রমাগত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি, নিজস্ব চাহিদা, পারিপার্শ্বিক আবহাওয়া, আর্থিক সক্ষমতা, স্পেয়ার পার্টসের সহজলভ্যতা ইত্যাদি অনেক কিছু বিবেচনায় আনতে হয়। চীন, রাশিয়া, ইউরোপ না আমেরিকা—কোন ব্লকের দিকে যাব এসব বিষয় তো থাকেই। তবে সবকিছু মিলিয়েই বিমান বাহিনীর আধুনিকায়ন দরকার।’