বঙ্গবন্ধু টানেল

যোগাযোগ করিডোরের অর্থনৈতিক করিডোরে রূপান্তর চান উদ্যোক্তারা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল দক্ষিণ এশিয়ার কোনো নদীর তলদেশে নির্মিত প্রথম টানেল বা সুড়ঙ্গ সড়ক। সড়ক যোগাযোগ উন্নয়ন আর শিল্প-বাণিজ্যে গতি আনতে সাত বছরের নির্মাণযজ্ঞ শেষে বাস্তব অবয়ব পেল প্রকল্পটি। এর মাধ্যমে শিল্প, নগরায়ণ ও পর্যটনের বড় সম্ভাবনা দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। টানেলটির বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিত করতে দ্রুত একটি শক্তিশালী যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা গড়ে

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল দক্ষিণ এশিয়ার কোনো নদীর তলদেশে নির্মিত প্রথম টানেল বা সুড়ঙ্গ সড়ক। সড়ক যোগাযোগ উন্নয়ন আর শিল্প-বাণিজ্যে গতি আনতে সাত বছরের নির্মাণযজ্ঞ শেষে বাস্তব অবয়ব পেল প্রকল্পটি। এর মাধ্যমে শিল্প, নগরায়ণ ও পর্যটনের বড় সম্ভাবনা দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। টানেলটির বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিত করতে দ্রুত একটি শক্তিশালী যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। এর মধ্য দিয়ে টানেলটি যোগাযোগ করিডোর থেকে লাভজনক এক অর্থনৈতিক করিডোরে রূপ নেবে বলে মনে করছেন তারা।  

কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত টানেলটি আজ আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেয়া হচ্ছে। তবে যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে আগামী সোমবার। সাধারণের ব্যবহারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিবেচনায় টানেলটিকে দূরদর্শী প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করছেন অর্থনীতিবিদরা। 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলকে আমি দেখছি দেশের একটা দূরদর্শী প্রকল্প হিসেবে। তবে এ টানেলের অর্থনৈতিক সুবিধা এখনই পাওয়া যাবে না। কারণ প্রথমদিকে এটি খুব আন্ডার ইউটিলাইজড থাকবে। কিন্তু মিরসরাই বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরী থেকে সাগরের উপকূল দিয়ে যে মেরিন ড্রাইভ, সেটা যখন এ টানেল হয়ে আনোয়ারা, বাঁশখালী, চকরিয়া, মাতারবাড়ী, মহেশখালী, কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারিত হবে, তখন এ মেরিন ড্রাইভের পাশে অনেক শিল্পায়ন জোন গড়ে উঠবে।’

তিনি বলেন, ‘টানেলকে কেন্দ্র করে এখানে রফতানিমুখী শিল্প জোন গড়ে উঠবে, নগরায়ণ হবে, পর্যটন কমপ্লেক্সও গড়ে উঠবে। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের কারণে শাহ আমানত ব্রিজের পর ২০ কিলোমিটার আর কোনো সেতু নির্মাণের সুযোগ নেই, এ সীমাবদ্ধতাও স্থায়ীভাবে দূর হয়ে যাবে। তবে বাস্তবতা হলো এ প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুফল পেতে সময় লাগবে।’

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বড় অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ সমুদ্রবন্দরের সুবিধা থাকায় পণ্য বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার চট্টগ্রামে নির্মিত বঙ্গবন্ধু টানেল অর্থনৈতিক করিডোরের সঙ্গে এখন গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ। খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ কারখানা স্থাপন, মৎস্য ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প, তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, শিপ বিল্ডিংসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরির শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এতে এ অঞ্চলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

দেশের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বহুল প্রত্যাশিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের উদ্বোধন অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। এ টানেলের সুফল শুধু চট্টগ্রামবাসী নয়, বরং অর্থনৈতিক করিডোরের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ হিসেবে সারা দেশের মানুষ পাবে। এ অঞ্চলে গড়ে উঠবে নতুন নতুন শিল্পাঞ্চল, যেখানে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। বৈশ্বিক সংযোগের ক্ষেত্রে এ অবকাঠামোর ভূমিকা অর্থনীতিকে আরো গতিশীল করে তুলবে এবং অবদান রাখবে দেশের বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিতেও।’ 

শিল্পপ্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক হিসেবে যত দ্রুত গড়ে তোলা যাবে, এ মাল্টিলেন আন্ডারওয়াটার এক্সপ্রেসওয়ে থেকে তত দ্রুত অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে। বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের উপযুক্ততা প্রকল্পটিকে বড় সম্ভাবনার নতুন সুযোগ বলে মনে করছেন তারা।

জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে নদীর তলদেশে নির্মিত প্রথম ও দীর্ঘতম সড়ক সুড়ঙ্গপথ এ টানেল। এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশকে বিশ্বে একটি নতুন উচ্চতায় তুলে ধরবে। শিল্পায়ন, পর্যটন এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ও সড়ক যোগাযোগ বিকাশে বড় সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন করার পাশাপাশি প্রসারিত করবে শহরের পরিধিকে। ইপিজেড, রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন এ টানেলের জন্য দারুণভাবে উপকৃত হবে। বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হয়ে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। এমন অবকাঠামো উন্নয়নে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ হাবে পরিণত হবে চট্টগ্রাম।’

এক প্রান্তে কক্সবাজার এবং অন্যদিকে মহাসড়ক হয়ে রাজধানীকে যুক্ত করেছে বঙ্গবন্ধু টানেল। দক্ষিণ-পূর্বের আনোয়ারা প্রান্তে টানেলের মুখ একদিকে পটিয়া হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ন্যাশনাল হাইওয়ে-১-এর সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে। একই প্রান্তে বাঁশখালী-পেকুয়া-চকরিয়া-ঈদমনি-খুরুশকুল হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হলে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব প্রায় ৩৫ কিলোমিটার কমে যাবে। আর এ রুটের সঙ্গে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের উন্নত যোগাযোগ গড়ে তোলা হলে ব্যবসায় বড় সুফল আসবে।

মোস্তফা হাকিম গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ সরওয়ার আলম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের যে ভৌগোলিক অবস্থানগত সুবিধা রয়েছে, এর যথাযথ ও কৌশলগত দিক অনুধাবন করেই বঙ্গবন্ধু টানেল নির্মিত হয়েছে। এ প্রকল্প দিয়ে যে কানেক্টিভিটি হচ্ছে, সেটি ব্যবসার সক্ষমতা গড়ে তুলবে। আগামীতে দক্ষিণ চট্টগ্রামে ইকোনমিক জোনসহ বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ শুরু হবে। তবে ওয়ান সিটি টু টাউন ও কর্ণফুলী নদীতীরের শিল্পায়ন পরিকল্পিতভাবে করতে একটি উপযুক্ত মাস্টারপ্ল্যান করা জরুরি। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি পর্যটনেরও উল্লেখযোগ্য প্রসার হবে।’

আরও