পিপিআরসি নীতি সংলাপে বক্তারা

অর্থনীতিতে তামাক খাতের অবদান ১ শতাংশের কম

বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যের জন্য বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে তামাক। তরুণরা স্মার্টনেস বাড়াতে বিড়ি, সিগারেটের মতো তামাক গ্রহণ করছে। এর মাধ্যমে দেশের রাজস্ব আহরণ হচ্ছে ঠিকই কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যের জন্য বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে তামাক। তরুণরা স্মার্টনেস বাড়াতে বিড়ি, সিগারেটের মতো তামাক গ্রহণ করছে। এর মাধ্যমে দেশের রাজস্ব আহরণ হচ্ছে ঠিকই কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। বর্তমানে বাংলাদেশ জনস্বাস্থ্য ও রাজস্ব সংস্কারের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে অবস্থান করছে। তামাক কর ব্যবস্থা কতটা কার্যকরভাবে তামাক ভোগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে এবং ভবিষ্যতে কোন ধরনের সংস্কার প্রয়োজন—এ নিয়ে আলোচনা জোরদার হচ্ছে। তামাকে কী ধরনের কর ব্যবস্থা আরোপ হবে সেটি নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। কারণ ভবিষ্যতে একটি স্বাস্থ্য প্রজন্ম গঠন করতে হলে তামাক কর সংস্কারের প্রয়োজন আছে।

গতকাল রাজধানীতে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ‘রিইম্যাজিনিং অ্যান ইফেকটিভ টোব্যাকো ট্যাক্স সিস্টেম ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি জাতীয় নীতি সংলাপে এসব কথা বলেন গবেষক, অর্থনীতিবিদ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, সিভিল সোসাইটি প্রতিনিধি ও নীতিনির্ধারকরা।

সংলাপে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকসের অধ্যাপক শাফিউন নাহিন শিমুল। তিনি বলেন, ‘‌সিগারেট খাওয়া এখন সামাজিক ও মর্যাদার বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটা সামাজিকভাবে অবক্ষয় তৈরি করছে। তামাক বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলো মনে করেন তারা রাজস্বে বড় অবদান রাখছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে অর্থনীতিতে এ খাতের অবদান খুবই কম। যেমন শ্রীলংকায় যে সিগারেটের দাম ৬০ টাকা বাংলাদেশে সেটি ১৫ টাকা। মানে শ্রীলংকায় প্রায় ৪ গুণ বেশি দামে বিক্রি হয়। কোম্পানিগুলো বলছে তামাক ফ্যাক্টরিতে কাজ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠী। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। নিম্ন-আয়ের ধূমপায়ীরা দামের প্রতি বেশি সংবেদনশীল। অবৈধ বাণিজ্য বৃদ্ধি কর বাড়ানোর ফল নয় বরং দুর্বল আইন প্রয়োগের ফল। তামাকের চাহিদা অনমনীয় হওয়ায় কর বাড়ালে রাজস্বও বাড়ে।’

তিনি আরো বলেন, ‘তামাক খাতের অর্থনৈতিক অবদান ১ শতাংশের কম, কিন্তু এর স্বাস্থ্য, সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষতি বহুগুণ বেশি। দেশের ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক তামাক ব্যবহার করেন। পুরুষদের মধ্যে তামাক ব্যবহার ৪৬ শতাংশ, নারীদের মধ্যে ২৫ দশমিক ২ শতাংশ। টোব্যাকো অ্যাটলাসের তথ্যমতে, ২০২১ সালে দেশে ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ তামাকজনিত রোগে মারা গেছেন, যা মোট মৃত্যুর ২১ দশমিক ৯ শতাংশ। এত উচ্চ ক্ষতির পরও সিগারেট এখনো অত্যন্ত সুলভ এবং মাত্র ৬ টাকায় একটি সিগারেট পাওয়া যায়। এ সহজলভ্যতা দেশের জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্য অর্জনকে কঠিন করে তুলছে।’

সংলাপে উপস্থিত ছিলেন তামাকমুক্ত শিশুদের জন্য প্রচারণা বাংলাদেশের প্রধান নীতি উপদেষ্টা মোস্তাফিজুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালমা আক্তার ও এনবিআরের সাবেক সদস্য এমএম ফজলুল হক। বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান বহুস্তর কর কাঠামো ধূমপায়ীদের এক ব্র্যান্ড থেকে আরেক ব্র্যান্ডে সহজে সরে যাওয়ার সুযোগ দেয়। ফলে তামাক ব্যবহার কমিয়ে আনতে পারছে না।

এছাড়া তরুণদের প্রতি তামাক শিল্পের লক্ষ্যভিত্তিক বিপণন নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। দোকানে মিষ্টি ও খেলনার কাছে সিগারেট প্রদর্শন, শিশুদের চোখের সমতলে সিগারেট সাজিয়ে রাখা এবং ই-সিগারেট ও ভ্যাপিং পণ্যের সহজলভ্যতা কিশোর-কিশোরীদের তামাকের প্রতি আকর্ষণ বাড়াচ্ছে। সে জায়গায় কিশোর-কিশোরদের সুরক্ষায় স্কুল পাঠ্যক্রমে তামাকবিরোধী শিক্ষা সংযুক্ত করা এবং অ্যাকসেস নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করা জরুরি।

এনবিআরের সাবেক সদস্য এমএম ফজলুল হক বলেন, ‘‌তামাক কর বাস্তবায়নে প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ তেমনই পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাও বড় বাধা।’ তিনি উল্লেখ করেন যে কর ফাঁকি রোধ, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য এবং রাজস্ব পূর্বানুমানযোগ্যতা বৃদ্ধির জন্য সুনির্দিষ্ট আবগারি কর কাঠামো অপরিহার্য।

সমাপনী বক্তব্যে ড. হোসেন জিল্লুর বলেন, ‘‌কার্যকর তামাক কর সংস্কার কেবল প্রযুক্তিগত সংস্কার নয়, বরং রাজনৈতিক অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য এবং সামাজিক আখ্যানের সমন্বিত বোঝাপড়া প্রয়োজন। তামাক চাষনির্ভর জেলাগুলো দেশের সবচেয়ে দরিদ্র অঞ্চলের মধ্যে পড়ে, যা কাঠামোগত দারিদ্র্যের ইঙ্গিত দেয়।’ তিনি ধাপে ধাপে বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ, হালনাগাদ জাতীয় ডাটা অন্তর্ভুক্ত করা এবং তামাক নিয়ন্ত্রণকে একটি নৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরার আহ্বান জানান।

আরও