বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু সহনশীলতার অর্থ বিগত কয়েক দশকের অর্জন রক্ষা এবং আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা। নিম্নভূমি বেষ্টিত এ বদ্বীপ এলাকা ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা ও তীব্র তাপপ্রবাহের মতো দুর্যোগে বিশেষভাবে সংবেদনশীল। একটি ছোট্ট ভূখণ্ডে প্রায় ১৭ কোটির বেশি মানুষের বসবাসের ফলে এ ঝুঁকিগুলো খাদ্য ও পানি নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, অবকাঠামো এবং কর্মসংস্থানকে হুমকির মুখে ফেলছে। একই সঙ্গে জমি ও নাগরিক সেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে; মানুষকে বাস্তুচ্যুত, দারিদ্র্যকে তীব্রতর এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ব্যাহত করছে।
ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বাংলাদেশে বার্ষিক গড় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক প্রায় ১০০ কোটি ডলার। অন্যদিকে পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে জলবায়ুজনিত অভ্যন্তরীণ অভিবাসীর সংখ্যা দাঁড়াতে পারে ১ কোটি ৩৩ লাখে। সেজন্য আজকের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো অবশ্যই সহনশীলতার কথা মাথায় রেখে নিতে হবে।
ধারাবাহিক উদ্যোগ কেমন সাফল্য এনে দিতে পারে, বাংলাদেশ তা এরই মধ্যে প্রমাণ করেছে। ১৯৭০ সালের পর থেকে ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যুর হার শত গুণ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। একটি সহনশীল অর্থনীতি গড়ার ক্ষেত্রেও একই ধরনের দৃঢ়সংকল্প নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে আমি তিনটি অগ্রাধিকারমূলক বিষয় প্রস্তাব করতে চাই।
প্রথমত, পরস্পর সংযুক্ত ও সহনশীল সমন্বিত ব্যবস্থার উন্নয়ন। সড়কের সঙ্গে ড্রেনেজ ব্যবস্থা থাকতে হবে; শহরের খালগুলোকে কার্যকর রাখতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে পয়োবর্জ্য শোধন ও সুনির্দিষ্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। কৃষির জন্য চাই উর্বর মাটি ও নিরবচ্ছিন্ন সেচ। নদী পুনরুদ্ধার করতে উৎসমুখেই দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নদী অববাহিকা, শহর ও উৎপাদন কেন্দ্রগুলো যুক্ত করে পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি তা রক্ষণাবেক্ষণেও অর্থায়ন নির্দিষ্ট থাকবে।
এডিবির ২৫ কোটি ডলারের ‘উপকূলীয় শহর জলবায়ু সহনশীলতা প্রকল্প’ ২২টি শহরে বাস্তবায়িত হচ্ছে, যা বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলাশয় পুনরুজ্জীবন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। অভিযোজন এবং পরিবেশগত সেবা কীভাবে একে অপরকে শক্তিশালী করতে পারে, এ প্রকল্প তার বাস্তব উদাহরণ।
দ্বিতীয়ত, পরিচ্ছন্ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে প্রতিযোগিতা সক্ষমতার প্রধান চালিকাশক্তি করতে হবে। আমদানীকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ব্যবসা ও সরকারি অর্থায়নকে মূল্যের অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট যা আরো স্পষ্ট করে তুলেছে। ছাদের সৌরবিদ্যুৎ (রুফটপ সোলার), শক্তিশালী গ্রিড, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং গ্যাসের অপচয় কমানোর মাধ্যমে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সুদৃঢ় করা যাবে। বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে স্বচ্ছ নীতিমালা, বিশ্বাসযোগ্য অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা এবং অর্থায়নযোগ্য প্রকল্প প্রয়োজন। এডিবি ২০ কোটি ডলারের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে এ রূপান্তরে সহায়তা প্রদান করছে।
তৃতীয়ত, নীতিগত প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব বিনিয়োগ ও ফলাফলে রূপান্তর করা। এডিবি ‘জলবায়ু-সহনশীল অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কর্মসূচি’র প্রথম দুই ধাপে নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে সহায়তার জন্য ৮০ কোটি ডলার অনুমোদন করেছে। তবে এর সঠিক বাস্তবায়ন নির্ভর করছে সক্ষম প্রতিষ্ঠান, নিখুঁত প্রকল্প প্রস্তুতি, স্বচ্ছ ক্রয় প্রক্রিয়া এবং কার্যকর পরিবেশগত সুরক্ষার ওপর। আইনের সুনির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক প্রয়োগ পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, রিসাইক্লিং এবং সহনশীল কৃষি-ব্যবসায় বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে পারে।
সরকারের নেতৃত্বাধীন ‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ’-এর মাধ্যমে আমরা সমন্বয় জোরদার এবং বিনিয়োগ উপযোগী প্রকল্প তৈরি করতে পারি। সরকারি ও সহজ শর্তের অর্থায়ন যেন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়, পাশাপাশি তা যেন বেসরকারি মূলধন আহরণেও সাহায্য করে।
বাংলাদেশ যখন কপ৩১ সম্মেলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী জলবায়ু অর্থায়নের দাবির পেছনে স্পষ্ট বিনিয়োগ অগ্রাধিকার এবং পরিমাপযোগ্য ফলাফলের রূপরেখা থাকা উচিত। আমাদের চূড়ান্ত সাফল্য হবে বিষমুক্ত বাতাস ও পরিষ্কার পানি, উর্বর মাটি, নিরাপদ সমাজ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি এবং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি। সেই ভবিষ্যৎ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ এবং তার অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে এডিবি সব সময় প্রস্তুত।