আনারসের রাজধানীখ্যাত টাঙ্গাইলের মধুপুরে আনারসচাষীর সংখ্যা যেমন দিন দিন বাড়ছে, তেমনি দেশব্যাপী বাড়ছে চাহিদাও। তবে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে আনারসের গুণগত মান দিন দিন নষ্ট হচ্ছে। সেই সঙ্গে এসব রাসায়নিকের কারণে মানবদেহে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাবের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সাধারণত বাগানে ফল পরিপক্ব হতে প্রায় পাঁচ-ছয় মাস সময় লাগে। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ফল পেতে তিনবার আনারসে রাসায়নিক প্রয়োগ করা হয়। যখন ফুল আসতে শুরু করে তখন মাত্রাতিরিক্ত প্ল্যানোফিক্স স্প্রে করা হয়। কিছুদিন পর আনারসটির আকৃতি বড় করার জন্য অতিমাত্রায় সুপার ফিক্স হরমোন এবং সর্বশেষ কৃত্রিমভাবে পাকাতে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথরেল বা রাইপেন ব্যবহার করা হয়, যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। প্রতিনিয়ত এ রাসায়নিক ব্যবহার করলেও এটি বন্ধে প্রশাসনিকভাবে কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে আনারসচাষীরা অধিক লাভের আশার প্রতিনিয়ত এ রাসায়নিক কেমিকেল বাগানে ব্যবহার করছেন। এতে মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের (এআইএস) তথ্য অনুযায়ী, ক্যালসিয়াম কার্বাইড ফলমূলে প্রয়োগ করলে এসিটিলিন ইথানল নামক বিষাক্ত পদার্থে রূপান্তরিত হয়। কেমিকেলমিশ্রিত ফল খেলে মানবদেহে দীর্ঘমেয়াদি নানা রোগ বিশেষ করে বদহজম, পেটের পীড়া, পাতলা পায়খানা, জন্ডিস, গ্যাস্ট্রিক, শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা, লিভার ও কিডনি নষ্ট হওয়াসহ ক্যান্সারের মতো জটিল রোগ সৃষ্টি হয়। এছাড়া নারীরা এর প্রভাবে বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম দিতে পারেন।
মধুপুর গড়ের মধুপুর, মুক্তাগাছা, ফুলবাড়িয়া ও ঘাটাইল উপজেলায় প্রায় ২১ হাজার একরে ছড়িয়ে পড়েছে আনারস চাষ। তবে এর সিংহভাগই চাষ হয় মধুপুর উপজেলায়। অরুণখোলা, শোলাকুঁড়ি, আউশনাড়া ইউনিয়নে আনারসের সবচেয়ে বেশি চাষ হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০১৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এগিয়ে এসেছিল এ আনারস বাজারজাতে। সংস্থাটির পক্ষে থেকে ইদিলপুর আনারসচাষী বহমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের মাধ্যমে ৩২ কোটি টাকার প্রজেক্ট তৈরি করে ৩০টি ইন্ডাস্ট্রিজ করার প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলের মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত কেমিকেল ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি পাওয়ায় বাজারজাত প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয় সংস্থাটি। এরপর ২০১৭ সালে ইদিলপুরে নেদারল্যান্ডস ও বাংলাদেশ জয়েন্ট ভেঞ্চারে আনারস বাজারজাত প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে।
বুকারবাইত গ্রামের আনারসচাষী তুলা মিয়া বলেন, এক লিটার প্ল্যানোফিক্স ১ হাজার ৮০০ টাকা দিয়ে কিনে বাগানে তিন ধাপে স্প্রে করি। এতে তাড়াতাড়ি ফুল আসে। ফল বড়ও হয় এবং দু-তিন দিনের মধ্যেই পাকে।
একই গ্রামের আরেক আনারসচাষী আব্দুল গফুর বলেন, ক্রেতারা ভালো জিনিস খেতে চান না। তাদের পছন্দ রঙ আর সাইজ। আগাম খেতে পছন্দ করেন। হরমোন না দিলে আনারস পাকে একবারে শেষ দিকে। আর কেমিকেল না দিলে ফলের চেহারা হবে কালো। সাইজ হবে ছোট ও মাঝারি। কৃষক এ আনারস বিক্রি করতে পারবেন না। ব্যাপারিও এ ধরনের আনারস নিতে চান না। কারণ শহরের মানুষ তো এ আনারস কেনেন না।
ইদিলপুর আনারসচাষী বহমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড সভাপতি একেএম ফজলুল হক বলেন, ওষুধ না দিলেও আনারস পাকে কিন্তু রঙ আসে না। ফলে ক্রেতা, ব্যাপারি কেউ ফল নেন না। হরমোন নিয়ে মধুপুরে কোনো গবেষণা কেন্দ্র নেই। কৃষকেরও কোনো প্রশিক্ষণ নেই। যেখানে ১৬ লিটার পানিতে পাঁচ মিলিলিটার হরমোন স্প্রের অনুমোদন আছে কৃষি অধিদপ্তরের, সেখানে কৃষক কোম্পানি ও ব্যবসায়ীর পরামর্শে ভুল সময়ে ব্যবহার করে ১০০ থেকে ২০০ এমএল।
মধুপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আল মামুন রাসেল বণিক বার্তাকে বলেন,
আনারসে মাত্রাতিরিক্তি ক্যালসিয়াম কার্বাইড, প্ল্যানোফিক্স, রাইপেনের মতো কেমিকেল স্প্রে প্রয়োগের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, বিষাক্ত কেমিকেল ব্যবহার থেকে কৃষক সরে আসছেন। অনেক চাষীই এখন বিষমুক্ত আনারস চাষ করছেন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহের এগ্রো ফরেস্ট্রি প্রধান অধ্যাপক ড. কাজী কামরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, মধুপুরের আনারসে প্রচুর রাসায়নিক কেমিকেল ব্যবহার করা হচ্ছে। এ আনারস খাওয়ার ফলে মানবদেহে প্রাথমিকভাবে বদহজম, পেটব্যথা, পাতলা পায়খানা, বমি, গ্যাস্ট্রিক, শ্বাসকষ্ট ও স্কিনের সমস্যা হচ্ছে। ধীরে ধীরে মানবদেহে বড় ধরনের হার্টের সমস্যা, কিডনি বিকলসহ ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের সৃষ্টি হতে পারে। অবিলম্বে আনারসচাষীদের এ কাজ থেকে বিরত রাখতে সবাইকে সচেতন করতে হবে।